প্রতিবেদন

পায়রা বন্দর : দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকের পদচারণায় বদলে যাচ্ছে দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক চালচিত্র

বিশেষ প্রতিবেদক
এক সময় এ’ জনপদটি রাতে ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিমজ্জিত থাকতো। সন্ধ্যা নামলেই শিয়াল ও ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। রাত তো দূরের কথা দিনেও মানুষের পদচারণা ছিল না। মাত্র পাঁচ বছর আগেও এরকমটি ছিল। নাম না জানা সেই নদী পাড়ের বনজঙ্গলে ঘেরা জনপদটি এখন ফ্যাড লাইটের আলোয় আলোকিত। যেখানে চায়ের দোকান পর্যন্ত ছিল না, সেখানে এখন কফির তেষ্টা মেটায় মানুষ। নিত্য পদচারণা দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও পর্যটকদের।
পায়রা বন্দর চালু হওয়ায় এখানকার মৌসুমী কৃষি শ্রমিক এবং জেলে পরিবারের অদ শ্রমিকরা কর্মসংস্থানের সুযোগ পেয়েছেন। কেউ হয়েছেন গাড়িচালক, কেউ পেয়েছেন নিরাপত্তারীর চাকরি। বন্দরের ভেতরে ও বাইরে উন্নয়ন কার্যক্রমে অংশ নিচ্ছেন উপকূলের বিভিন্ন অঞ্চলের নানা পেশার শ্রমিক ও কারিগররা। নিত্যনতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ছে।
২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার টিয়াখালী এলাকায় দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর (পায়রা সমুদ্রবন্দর)-এর শুভ উদ্বোধন করেন। আনুষ্ঠানিকভাবে পায়রা বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৬ সালের ১৩ আগস্ট। পায়রা’য় অপারেশনালসহ চলমান কার্যক্রমকে এগিয়ে নিতে ১১ কোটি ১ লাখ ৮২ হাজার ২০৯ টাকা ব্যয়ে এ বছরের ১০ আগস্ট পাঁচ তলা প্রশাসনিক ভবনের উদ্বোধন করা হয়েছে। ৩ হাজার ৯৮২ কোটি টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরের মূল চ্যানেল রাবনাবাদ পাড়ের চারিপাড়ায় নির্মাণ করা হচ্ছে ৬০০ মিটার দীর্ঘ টার্মিনাল। টার্মিনালে সরাসরি দুইটি মাদার ভেসেল একই সময় ভিড়তে পারবে। টার্মিনাল নির্মিত হলে ২০১৯ সালের মধ্যে নির্মাণ সামগ্রী ও অন্যান্য বাল্ক পণ্যবাহী জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
প্রাথমিকভাবে ১৬ একর জমিতে পায়রা বন্দর প্রকল্প এলাকা নির্মাণ করা হয়। সেখানে ইতোমধ্যে নির্মিত হয়েছে পানি শোধনাগার। স্থাপিত হয়েছে লাইটার জাহাজ থেকে পণ্য খালাসের টার্মিনাল। বেইলি ব্রিজসহ সংযোগ সড়ক নির্মিত হয়েছে। সৌরবাতিসহ বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হয়েছে। সাবমেরিন ক্যাবল লাইন টানা হয়েছে। সাগর মোহনা থেকে মূল চ্যানেলের নেভিগেশনাল বয়া স্থাপন করা হয়েছে। সিগনাল বাতি স্থাপিত হয়েছে। সাগর থেকে চ্যানেলের ইনার সাইটে ২৮টি বয়াবাতি সেট করা হয়েছে। রামনাবাদ থেকে তেতুলিয়া নদীতে বরিশাল হয়ে ঢাকার মেঘনা নদীর হিজলা পর্যন্ত ৭০ মাইল নদী খনন করা হয়েছে। যেখানে পাঁচ মিটার নাব্যতা বজায় রাখা হয়েছে। এ চ্যানেলেও ৪৬টি বয়াবাতি স্থাপন করা হয়েছে। গোটা চ্যানেলটিতে ১০ মিটার নাব্যতা নিশ্চিতের ল্েয খননের কাজ চলমান রয়েছে। চলমান রয়েছে ৪২ হাজার বর্গফুট কয়েল হাউস নির্মাণকাজ। দ্রুত চলছে ২৫৪ কোটি ৫১ লাখ টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরের সঙ্গে মহাসড়কের সরাসরি যোগাযোগে ৫ দশমিক ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ ফোর লেন সড়কের নির্মাণকাজ। বন্দর সংলগ্ন ট্রাক স্ট্যান্ডের কাজ চলছে। সংপ্তি পরিসরে চলছে সিএন্ডএফ এজেন্ট কিয়ারেন্স এবং ইমিগ্রশনের কাজ। পায়রাকে পূর্ণাঙ্গ গভীর বন্দরে উন্নীতের ল্েয এ কর্মযজ্ঞের ধারা চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত।
২০ কোটি ৯৭ লাখ ৮৯ হাজার ৭১৩ টাকা ব্যয়ে পায়রা বন্দরে ওয়ার হাউস নির্মাণ করা হয়েছে।
ওয়ার হাউসের দৈর্ঘ্য ৪০০ ফুট, প্রস্থ ২৫০ ফুট, উচ্চতা ২০ ফুট। ২১ কোটি ৩৮ লাখ ৮৫ হাজার ব্যয়ে সার্ভিস জেটির নির্মাণ কাজ চলছে।
ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ম্যাক ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেড সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে একটি পন্টুন জেটি থাকলেও পণ্য খালাসের সুবিধার্থে এই সার্ভিস জেটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
পায়রা বন্দর নির্মাণে তিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসনের অংশ হিসেবে কর্মদতা বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কোর্সের প্রশিণ কার্যক্রমও উদ্বোধন করেছেন নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান। পায়রা বন্দর কর্তৃপরে মেম্বার (প্রশাসন ও অর্থ) কমান্ডার এম রাফিউল হাসান জানান, অপারেশনাল কার্যক্রমে গতি আনতে প্রশাসনিক কর্মকা-ের পাশাপাশি মূলত জমি অধিগ্রহণে তিগ্রস্ত পরিবারে আর্থিক তি পূরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির ল্েয প্রথম পর্যায়ে দেড়শ পরিবারকে তিনটি কোর্সে প্রশিণ দেয়া হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ছিল নির্মাণ শ্রমিক, ড্রাইভিং ও কম্পিউটারের বেসিক কোর্সের প্রশিণ। দুই বছরে ৪ হাজার ২০০ মানুষকে তিন মাসব্যাপী ২৯টি কোর্সে এ প্রশিণ দেয়া হবে। প্রয়োজনে কোর্সের সংখ্যা আরও বাড়ানো হবে। যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরসহ সরকারের বিভিন্ন দপ্তর এসব কাজে সহায়তা করবে।
সাবেক প্রতিমন্ত্রী ও স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন, প্রশিণ কার্যক্রম চালু করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রা বন্দর নির্মাণ এবং এখানকার মানুষের পূনর্বাসন ও কর্মসংস্থানের বিষয়টিতে গুরুত্বারোপ করেছেন।
বরগুনার সাবেক সাংসদ ও বর্তমান জেলা চেয়ারম্যান মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, সরকার এ উপকূলীয় এলাকায় সমুদ্র বন্দর স্থাপন করে অবহেলিত জনপদকে রাতারাতি অর্থনৈতিক জোনে পরিণত করেছে। পায়রা বন্দর, বরগুনা-পটুয়াখালীর তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মানুষের কর্মসংস্থানসহ সমগ্র অঞ্চলটিকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।