আন্তর্জাতিক

ক্ষেপনাস্ত্র জোরদারের অঙ্গীকার ইরানি প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির : যুক্তরাষ্ট্রের কড়া হুঁশিয়ারি

স্বদেশ খবর ডেস্ক : ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি পশ্চিমা দেশগুলোর উদ্বেগ সত্ত্বেও তার দেশের পেণাস্ত্র সমতা জোরদারের অঙ্গীকার করেছেন। রুহানি সম্প্রতি সামরিক কুচকাওয়াজ অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে বলেন, ইরান কখনোই তার প্রতিরা সমতা কমাবে না, বরং দিনে দিনে বাড়াবে।
রুহানির ভাষণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র এ বিষয়ে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে।
উল্লেখ্য, ইরানের যে পেণাস্ত্র আছে তা ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরের ল্যবস্তুতে আঘাত হানতে সম। ইসরাইল ও মধ্যপ্রাচ্যের মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের আওতায় বিদ্যমান।
রুহানির ভাষণের পরপরই ইরানের দণি-পশ্চিমাঞ্চলীয় আহভাজ প্রদেশে এক সামরিক কুচকাওয়াজে গুলিবর্ষণের ঘটনায় অন্তত ২৫ জন নিহত হয়। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ২২ সেপ্টেম্বরের হামলায় নিহতদের মধ্যে প্রভাবশালী রেভ্যুলিউশনারি গার্ডের ১২ সদস্যসহ বেসামরিক লোকজনও রয়েছে। আহত হয়েছে ৬০ জনের বেশি। সরকারবিরোধী একটি গ্রুপ এবং আইএস হামলার দায়িত্ব স্বীকার করলেও প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ইরান হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং উপসাগরীয় দু’টি দেশের ওপর দায় চাপালেও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এই হামলা ইরান সরকার এবং তার বাহিনী রেভ্যুলিউশনারি গার্ডের অবস্থানকে শক্তিশালী করবে।

যেভাবে হামলা
১৯৮০’র দশকে ইরাকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ৩০তম বার্ষিকী উপলে দেশজুড়ে কুচকাওয়াজের আয়োজন করা হয়। ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফাজি শেকার্জ জানান, আক্রমণকারীরা সামরিক বাহিনীর পোশাক পরা ছিল। পাশের একটি পার্ক থেকে কুচকাওয়াজের ওপর বন্দুকধারীরা গুলি বর্ষণ করে। তারা প্রথমে বেসামরিক লোকজনের ওপর গুলি চালায় এবং পরে মঞ্চের ওপর দাঁড়ানো সামরিক অফিসারদের ওপর আক্রমণের চেষ্টা চালায়। পুরো ঘটনাটি ঘটতে সময় নেয় প্রায় ১০ মিনিট।
ফার্স বার্তা সংস্থা জানায়, সকাল ৯টায় হামলা শুরু হয়। হামলাকারীরা ছিল ৪ জন।
আহভাজের ডেপুটি গভর্নর আলী হোসেন হোসেনজাদা বলেন, নিরাপত্তা বাহিনী দু’জন অস্ত্রধারীকে হত্যা এবং দু’জনকে জীবিত আটক করেছে।
তবে আরেকটি সূত্র জানায়, তিনজনকে হত্যা করা হয়েছে এবং একজন আটক হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলিউশনারি গার্ডসের (আইজিআরসি) ১২ সদস্য, এক নারী, এক শিশু, একজন যুদ্ধাহত যোদ্ধা এবং একজন সাংবাদিক রয়েছেন।

দায় চাপানো এবং দায়িত্ব স্বীকার
ইরান এই আক্রমণের জন্য সুন্নি কিংবা আরব জাতীয়তাবাদীদের দায়ী করেছে। ইরানে গত বছর যে ক’টি শহরে বড় মাপের সরকারবিরোধী বিােভ হয়েছিল তার মধ্যে আহভাজ একটি। ইরানের আরব সংখ্যালঘুদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদে মদদ দেয়ার জন্য তেহরান প্রতিবেশী সৌদি আরবকে দায়ী করে আসছে।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবোলফাজি শেকার্জ জানান, বন্দুকধারীদেরকে প্রশিণ দিয়েছে দু’টি উপসাগরীয় দেশ। ওই দেশ দু’টির সঙ্গে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক রয়েছে। তারা আইএস কিংবা অন্য কোনো গোষ্ঠী নয়।
এদিকে আইএস হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। কিন্তু এর কোনো প্রমাণ হাজির করেনি। আবার আহভাজ প্রদেশে বিচ্ছিন্নতাবাদী গ্রুপ প্যাট্রিয়টিক আরব ডেমোক্র্যাটিক মুভমেন্টও হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে। সৌদি আরব এই গ্রুপটিকে সমর্থন দিয়ে থাকে। সৌদি আরব কিংবা উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানে হামলার বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি, তবে সিরিয়া হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি দ্রুত হামলাকারীদের পরিচয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন।
তেহরানভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক হামিদ ফারাহভাসিয়ান বলেন, এই হামলা থেকে প্রেসিডেন্ট রুহানি সুবিধা নিতে পারেন। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের উপস্থিতি যে গুরুত্বপূর্ণ তা এই সন্ত্রাসী হামলা দিয়ে বিচার করার জন্য বিশ্ববাসীর প্রতি আহবান জানাতে পারেন প্রেসিডেন্ট রুহানি। আর আইজিআরসি’র অবস্থানও ইরানে এবং এই অঞ্চলে আরো বেশি শক্তিশালী হবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক গালফ আরব স্টেটস ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো আলি আলফোনেহ বলেন, প্রভাবশালী বাহিনীর ওপর হামলার ঘটনায় সরকার চাপে থাকবে। সন্দেহ নেই যে, এ হামলা বাহিনীটির মর্যাদা ুণœ করবে। তবে একই সাথে এই হামলা আইজিআরসি’র প্রতি জনসমর্থন বাড়াবে এবং প্রকারান্তরে বাহিনীকে শক্তিশালী করবে।
এর আগে চলতি বছরের শুরুতে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও দুর্নীতির অভিযোগে রুহানি সরকারের বিরুদ্ধে বিােভ ছড়িয়ে পড়ে ইরানে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলে প্রথম বিােভ শুরু হয়। এরপর দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর মাশহাদে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিরুদ্ধে প্রথম বিক্ষোভ মিছিল হয়। এরপর খোরামাবাদ, ঝানজান, আহভাজ, তেহরান প্রভৃতি শহরে বিােভ থেকে দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আল খামেনি ও প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানির বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়া হয়। আবহার শহরে আয়াতুল্লাহ আল খামেনির ছবিসংবলিত বড় বড় ব্যানারে অগ্নিসংযোগ করে বিােভকারীরা। আন্দোলন ক্রমেই সহিংস হয়ে ওঠে। বিভিন্ন শহরে অগ্নিসংযোগ করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিােভকারীদের ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে নিহত ব্যক্তির সংখ্যা ২২ জনে দাঁড়ায়। এ ছাড়া বিােভে জড়িত সন্দেহে শত শত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
হাসান রুহানি এসব ঘটনায় কড়া ভাষায় সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন, জনগণের সরকারের সমালোচনা করার অধিকার থাকলেও দেশের সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার নেই। কোনো ধরনের সহিংসতা সহ্য করা হবে না বলেও জানিয়ে দেন রুহানি।
সে সময় থেকেই রুহানির পথেই হাঁটছে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড বাহিনী। বার্তা সংস্থা এএফপি বলেছে, এই বাহিনী বিােভকারীদের আন্দোলন শক্ত হাতে দমন করার কথা জানিয়েছে। সরকারবিরোধী বিােভের পেছনে বিদেশি শক্তির ইন্ধন আছে বলে মনে করছে রেভল্যুশনারি গার্ড।
ইরানে চলতি বছরের শুরু থেকে শুরু হওয়া বিােভ নিয়ে বিভ্রান্তির মধ্যেই বছরের শেষ নাগাদ এসে রেভল্যুশনারি গার্ডের ওপর হামলার ঘটনা ঘটলো। এখন এ হামলা নিয়ে ইরান সরাসরি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দুষছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরান এই দুই রাষ্ট্রকে দুষলেও ইরানের সরকারি বাহিনী এ কাজ করেছে কি না সেটি একটি বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।