প্রতিবেদন

ভারত থেকে তেল আনতে পাইপলাইন নির্মাণ উদ্বোধন করলেন শেখ হাসিনা-নরেন্দ্র মোদি

জ্বালানি তেল আমদানির জন্য শিলিগুড়ি থেকে পার্বতীপুর পর্যন্ত ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ ‘বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের’ নির্মাণ কাজ উদ্বোধন করা হয়েছে। গত ১৯ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর মধ্য দিয়ে জ্বালানি খাতে দুই দেশের সহযোগিতায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো।
এ সময় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে নেয়া যৌথ প্রকল্পগুলো বাংলাদেশকে উন্নয়নের েেত্র আরও একধাপ এগিয়ে নেবে। উভয় দেশ মিলে যে কর্মসূচি গ্রহণ করছে, তা দুই দেশের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করবে। ভারত-বাংলাদেশের দ্বিপাকি বিভিন্ন প্রকল্প দণি এশিয়ার উন্নয়ন সম্ভাবনার দিগন্তকে আরো প্রসারিত করবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অপরদিকে অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, ভৌগোলিকভাবে দুই দেশ প্রতিবেশী হলেও তা আজ পারিবারিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার গণভবন থেকে এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দিল্লি থেকে ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নেন। এছাড়া এ অনুষ্ঠানে ভারতীয় ঋণের টাকায় বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী সেকশনের তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পেরও উদ্বোধন করা হয়। ‘বাংলাদেশ-ভারত ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন’ দিয়ে ভারতের আসাম রাজ্যের শিলিগুড়ির নুমালীগড় তেল শোধনাগার থেকে বাংলাদেশের দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর ডিপোতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হবে। এই পাইপলাইনের ১২৫ কিলোমিটার পড়েছে বাংলাদেশে, আর ভারতের অংশে পড়েছে বাকি ৫ কিলোমিটার। ২২ ইঞ্চি ব্যাসের এই পাইপলাইন দিয়ে বছরে ১০ লাখ মেট্রিক টন তেল সরবরাহ করা যাবে। তবে পাইপলাইন তৈরি হয়ে গেলে প্রাথমিকভাবে বছরে আড়াই লাখ মেট্রিক টন ডিজেল ভারত থেকে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হবে। পর্যায়ক্রমে তা ৪ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করা হবে।
৫২০ কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের গ্রান্ড এইড প্রোগ্রামের আওতায় পাওয়া যাবে ৩০৩ কোটি রুপি। আর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ১৫০ কোটি টাকার জোগান দেবে।
ভিডিও কনফারেন্সে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে এবং পাইপলাইন দিয়ে সরবরাহ চালু হয়ে গেলে জ্বালানির দাম অনেক কমে যাবে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরো বলেন, ঢাকা-টঙ্গী ও টঙ্গী-জয়দেবপুর তৃতীয়-চতুর্থ এবং পঞ্চম ডুয়েল-গেজ রেললাইন নির্মাণের কাজ সম্পন্ন হলে একদিকে যেমন ঢাকার ওপর চাপ কমবে তেমনি রেলপথে যাতায়াতের গতি বাড়বে।
কনফারেন্সের শুরুতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা বলেন, আপনার জন্মদিনে আপনাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি। আপনি দীর্ঘজীবী হোন। অপরদিকে ২৮ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনার জন্মদিন উপলে আগাম শুভেচ্ছা জানিয়ে নরেন্দ্র মোদি বাংলায় বলেন, ‘শুভ জন্মদিন’। তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগামী দিনের সাফল্য ও দেশ সেবায় সফলতা কামনা করেন। এসময় শেখ হাসিনাসহ উপস্থিত সবাই হাসি ও করতালি দিয়ে মুহূর্তটি উপভোগ করেন।
দণি এশিয়ার দেশগুলোর জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ভারত থেকে আমদানি করা জ্বালানি তেলে দেশের অর্থ সাশ্রয় হবে। আগামীতে দেশের উত্তরাঞ্চলে একটি ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে বলে জানান শেখ হাসিনা।
এসময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী এসব প্রকল্প উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে পারস্পরিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করে বলেন, পাইপলাইনের মাধ্যমে জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি দুই দেশের সম্পর্ক ভবিষ্যতে আরও জোরদার হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বিগত কয়েক বছরে আমাদের মধ্যে দ্বিপাকি সহযোগিতা এক নতুন উচ্চতায় উন্নীত হয়েছে। উভয় দেশের জনগণের উন্নতি-সমৃদ্ধির জন্য আমরা কাজ করে যাচ্ছি এবং কাজ করে যাব। এজন্য ভারত সরকারের কাছে নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা আশা
করছি।
নরেন্দ্র মোদি বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে প্রতিবেশীর সম্পর্ক পারিবারিক পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। প্রতিবেশীর সম্পর্ক কতটা গভীর হতে পারে বিশ্ববাসীর জন্য সে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে ভারত-বাংলাদেশ।
এসময় মোদি ভারতীয় এলওসির অর্থায়নে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণের মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ ও যাতায়াতে দুই দেশই উপকৃত হবে বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মাত্র ১০ দিনের মধ্যে দুইবার ভিডিও কনফারেন্সে আমরা কথা বলছি, আপনার মজবুত এবং কৌশলী নেতৃত্ব ছাড়া এটা সম্ভব হতো না। আমি বিশ্বাস করি, আগামীতেও ভারত এবং বাংলাদেশের জনগণের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আপনি এভাবে কাজ করে যাবেন। বাংলাদেশের উন্নয়নে ভারতের অব্যাহত সাহায্য ও সহযোগিতা কামনা করে শেখ হাসিনা বলেন, প্রতিবেশী এই দুই দেশকে তাদের উন্নয়ন এবং জনগণের সমৃদ্ধির জন্য একযোগে কাজ করে যেতে হবে। ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে ৩য়-৪র্থ ডুয়েলগেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েলগেজ ডাবললাইন চালু হলে ঢাকা থেকে পদ্মাসেতু হয়ে দণি-পশ্চিমাঞ্চল, বঙ্গবন্ধু যমুনা সেতু হয়ে উত্তরাঞ্চল এবং চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ ও দ্রুততর হবে। শেখ হাসিনা এ সকল প্রকল্প বাস্তবায়নে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ও ভারতের যে সকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তাদের সবাইকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারত সরকার ও জনগণের সহযোগিতার কথাও কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন।
দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ, বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, রেলপথ মন্ত্রী মুজিবুল হক, ভারতের পেট্রোলিয়াম এবং প্রাকৃতিক গ্যাস বিষয়ক মন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান, ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা ভিডিও কনফারেন্সে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত ১০ সেপ্টেম্বর ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং রেলওয়ের দুইটি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদি।