ফিচার

সিনেমা রিভিউ : পাল্প ফিকশন

সাকিব সারোয়ার আহমেদ : ২৪ বছর আগে রিলিজ পাওয়া পাল্প ফিকশন সিনেমা দেখলে মনেই হবে না এটি এতো পুরনো মুভি। গল্পে, সংলাপে, নির্মাণে অভিনব সব কৌশলে তারান্তিনোর এই সিনেমা এখনো আধুনিক মনে হয়।
এই সিনেমা প্রথমবার দেখেই গল্পটা বুঝেছে এরকম লোক পাওয়া কঠিন। কেন? এই প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে সিনেমার নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং স্টাইল।
ঘটনাক্রমকে ধারাবাহিকভাবে না সাজিয়ে ইচ্ছেমত পুনর্বিন্যাস করে গল্প বলার স্টাইলকে বলে নন-লিনিয়ার স্টোরিটেলিং। পাল্প ফিকশন সিনেমায় তারান্তিনো এই কাজটাই খুব চমৎকারভাবে করেছেন। পুরো সিনেমাটি একটা নন-লিনিয়ার সার্কেল, গল্পগুলোর ধারাবাহিকতা ভেঙ্গে এরপর আবার সেটাকে একটা চক্রে ফেলা হয়েছে।
পাল্প ফিকশনের একটা গল্প পাম্পকিন আর হানিবানির। একটা রেস্টুরেন্টে ব্রেকফাস্ট করতে বসে ডিসিশন নিয়ে ফেলে যে এই রেস্টুরেন্টেই তারা ডাকাতি করবে। রিভলবার বের করে ডাকাতি শুরু করে তারা। কিন্তু ওদের হিসাবে ভুল ছিল।
আরেকটা গল্প ‘দি বনি সিচুয়েশান’। ভিনসেন্ট ভেগা আর জুলস উইনফিল্ড দুই হিটম্যানের গল্প। মাফিয়া বস মার্সেলাস ওয়ালেসের কাজ করে তারা এবং পুরোপুরি প্রফেশনাল। মার্সেলাস তাদের পাঠায় এনচিনোর দলের কাছ থেকে একটা ব্রিফকেস উদ্ধার করে আনতে। ফেরার পথে গাড়ির ভেতর একজনকে খুন করে ফেলে ভিনসেন্ট। রক্তে নোংরা গাড়ি আর ডেডবডি নিয়ে রাস্তায় না থেকে ওরা ঢুকে পড়ে পাশেই জুলসের বন্ধু জিমির বাড়িতে। সাতসকালে এই ঝামেলা দেখে মহাবিরক্ত জিমি। তার বউ বনি এসে এসব দেখার আগেই আপদ বিদায় করতে বলে দেয় ওদেরকে। মার্সেলাস তখন উলফকে পাঠায় বনি সিচুয়েশান হ্যান্ডল করার জন্য। উলফের কাজই হচ্ছে প্রবলেম সলভ করা, ত্রিশ মিনিটের রাস্তা নয় মিনিট সাইত্রিশ সেকেন্ডে পার হয়ে সে চলে যায় জিমির ওখানে।
ভিনসেন্ট আর মার্সেলাসের ওয়াইফ মিসেস মিয়া ওয়ালেসেরও একটা গল্প আছে। মার্সেলাস শহরের বাইরে থাকায় ভিনসেন্টকে বলে মিয়াকে সন্ধ্যায় সময় দেয়ার জন্যে। মিয়া ভিনসেন্টকে নিয়ে জ্যাকর‌্যাবিট স্লিমজে খেতে আসে। সেখান চমৎকার একটা সন্ধ্যা কাটিয়ে বাসায় ফিরে মিয়া বলে এখন গান হবে, নাচ হবে! প্রফেশনাল হিটম্যান ভিনসেন্ট ওয়াশরুমে গিয়ে ভাবতে থাকে, কিভাবে বসের বউয়ের সাথে এই সিচুয়েশান হ্যান্ডল করা যায়। ওদিকে মিয়া ভিনসেন্টের পকেটে হেরোইন খুঁজে পায়। মিয়া কোকেন ভেবে সেটা নাক দিয়ে নিলে সে ওভারডোজে কোমায় চলে যায়।
‘দা গোল্ড ওয়াচ’ গল্পটা বুচ কুলিজ নামে এক বয়স্ক বক্সারের। মার্সেলাস তাকে বাস্তবতা শেখায়, টাকা দেয়, আর বলে পরের ম্যাচ হেরে বান্ধবী নিয়ে চিল করতে। বুচ টাকা নেয় এবং ম্যাচ জিতে যায়। পালিয়ে যাবার আগে তার খেয়াল হয় তার সোনার ঘড়িটা সে ফেলে এসেছে বাসায়। আবার বাসায় গিয়ে ঘড়িটা আনার পথে রাস্তায় দেখা হয় মার্সেলাসের সাথে, মার্সেলাসকে গাড়িচাপা দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলেও আরেকটা গাড়ির সাথে ক্রাশ করে বুচ। মার্সেলাস আর বুচ, দুজনকেই আটকে ফেলে লোকাল সিকিউরিটি গার্ড, তবে থানার বদলে একটা পানশালার বেজমেন্টে আনা হয় তাদের।
এইসব গল্পের মধ্যে মিলটা কোথায়? বুচ আর ভিনসেন্টের মধ্যে কী সম্পর্ক? আর পাম্পকিন-হানিবানির রেস্টুরেন্ট ডাকাতির সাথেই বা জুলসের ব্যাপারটা কী? বুচ ওর ঘড়িটার জন্য এমন মরিয়া কেন? পানশালার বেজমেন্টে কী ঘটে? উত্তরগুলো সিনেমা দেখলেই পাওয়া যাবে।
পাল্প ফিকশন সিনেমার আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এর সংলাপ। সংলাপগুলো অভিনেতাদের মুখ থেকে নয়, চরিত্রগুলো থেকে বেরিয়ে এসেছে। এই সিনেমার কিছু সংলাপ খুবই জনপ্রিয়। সাসপেন্স মিউজিক ব্যবহার হয়নি সিনেমায়, সংলাপই করেছে সে কাজটা। সিনেমায় ব্যবহৃত সব মিউজিকই রক অ্যান্ড রোল, সাফ, সোল আর পপ মিউজিক থেকে নেয়া। আলাদা কোনো স্কোর তৈরি হয়নি এই সিনেমার জন্য। একটিমাত্র গান ‘গার্ল, ইউ উইল বি অ্য উইম্যান সুন’ এটাও নীল ডায়মন্ডের কিলার অভ মেন অ্যালবামের। এই সিনেমার জন্য বেস্ট স্ক্রিনপ্লের অস্কার পান তারান্তিনো আর রজার এভারি।
চমৎকার গল্পের সাথে তাল মিলিয়ে অসাধারণ ফিল্মোগ্রাফি করেছে আন্দ্রেজ সেকুলা আর এডিটিংয়ে ছিল স্যালি ম্যান। স্যালি ম্যান অস্কার নমিনেশন পেয়েছিল এই প্রজেক্টের জন্য। সর্বকালের সেরা ১০০ সিনেমাদৃশ্যের তালিকায় এই সিনেমার দুটো দৃশ্য আছেÑ ভিনসেন্টের মিয়াকে অ্যাড্রেনালিন শট দেয়ার দৃশ্যটি, আর ভিনসেন্ট ও মিয়ার নাচের দৃশ্যটি। সিনেমায় ভিনসেন্ট ও জুলসের পিস্তল তাক করে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকার ফটোগ্রাফটা আইকনিক। যারা এই সিনেমাটি দেখেছে বা দেখে প্রায়ই, তাদের মনে একটা প্রশ্ন প্রায়ই জাগে, কী ছিল ব্রিফকেসটায়? আমরা শুধু এটুকুই দেখি, ব্রিফকেসটার কম্বিনেশন ৬৬৬; যা শয়তানের প্রতীক। আর দেখি ব্রিফকেসটা খুললে একটা স্বর্ণালী আভা দেখা যায়। পুরো সিনেমায় ব্রিফকেসটা নিয়ে অনেক নাটক হয়ে গেলেও আমরা দেখতে পাই না এর ভেতরে কি আছে। এই সিনেমায় ব্রিফকেসটা হল একটা প্লট ডিভাইস। পাল্প ফিকশনকে বলা হয় নব্বই দশকের সবচেয়ে প্রভাবশালী সিনেমা। এই সিনেমায় অভিনয় করেছেন জন ট্রাভোল্টা, স্যামুয়েল এল জ্যাকসন, উমা থারম্যান, ব্র“স উইলিসসহ নামজাদা অনেকে।
এই সিনেমার ব্যাপারে একটা কথাই বলা যায়, সিনেমাটি দেখুন। প্রথমবার দেখুন অভিজ্ঞতার জন্য, পরের বার দেখুন বোঝার জন্য, এরপর দেখুন উপভোগ করার জন্য।