প্রতিবেদন

সড়ক পরিবহন আইন : গণপরিবহনে নারী যাত্রীদের জন্য স্বস্তি বয়ে এনেছে

এক কোটির বেশি মানুষের বাস এই রাজধানী ঢাকা শহরে। জীবনের তাগিদে ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়েই চলতে হয় নগরবাসীকে। কিন্তু চাইলেও সব সময় সেটা সম্ভব হয় না পরিবহনস্বল্পতার কারণে। জীবন ও জীবিকার তাগিদে পুরুষের পাশাপশি নারীরাও আজ চাকরি করছে। যে কারণে পুরুষের পাশাপাশি একজন নারীকেও সেই সকাল বেলায়ই বের হতে হয় কর্মস্থলের উদ্দেশ্যে। কিন্তু রাস্তায় গণপরিবহনে অনেক সময়ই নারীকে নানা হয়রানির শিকার হতে হয়।
অনেক নারী যাত্রীর অভিযোগ, বাসে ওঠার সময় যেমন, তেমনি বাসের ভেতরে যাত্রীদের দ্বারাও অনেক সময় তারা হয়রানির শিকার হন। আবার নারী আসনে পুরুষ বসে থাকলে তাদের উঠাতে গিয়েও নানা ধরনের বাজে মন্তব্যের শিকার হতে হয় তাদের।
তবে এবার এই চিত্র পাল্টানোর আশা করছেন নারীরা। কারণ এখন থেকে তাদের নির্ধারিত আসনের আইনি সুরা পাবেন তারা। নারী আসনে পুরুষ বসলে বা বসতে দিলে জেল জরিমানার আইনে ইতোমধ্যেই সায় দিয়েছে মন্ত্রিসভা। ২০১৭ সালের ২৭ মার্চ মন্ত্রিসভায় নীতিগত অনুমোদন দেয়া সড়ক পরিবহন আইন ২০১৭ এর খসড়ায় বলা হয়েছে, কোনো পুরুষ যদি বাসে নারী, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য নির্ধারিত আসনে বসেন বা বসতে দেয়া হয় তবে তাকে এক মাসের জেল অথবা ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা গুনতে হবে।
নতুন এই আইনকে স্বাগত জানিয়েছেন নারীর অধিকার নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংস্থা, মানবাধিকার কর্মী এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।
নতুন এই আইনের বিষয়ে প্রচারণামূলক কর্মকা- চালিয়ে মানুষকে সচেতন করা এবং মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে কিছু অভিযান চালিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া গেলে গণপরিবহন আরও নারীবান্ধব হবে বলে মনে করেন বাংলাদেশ মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক সালমা আলী।
তিনি বলেন, অনেক আইন রয়েছে, যা নারীর সুরার জন্য যথেষ্ট। গণপরিবহনে হেল্প লাইনগুলোর নাম্বার টানিয়ে দেয়া উচিত। আর নারীদেরও প্রতিবাদ করতে হবে। কারণ জরিপে দেখা গেছে, হয়রানির ঘটনায় অর্ধেক নারীই কোনো প্রতিবাদ করেন না।
অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ কবির বলেন, কিছুদিন আগে আমাদের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরে গণপরিবহনে যাতায়াত করেন মাত্র ২১ শতাংশ নারী। সিংহভাগই (৪৭%) চলাচল করেন রিকশায়, আর ১৯ শতাংশ নারীকেই ভরসা করতে হয় দুই পায়ের উপর অর্থাৎ হেঁটে যাতায়ত করেন। এর কারণটা কী? গবেষণায় আমরা যেটি পেয়েছে তা হলো, গণপরিবহণে হয়রানির ভয়ে নারীরা এই বিকল্প পরিবহণ ব্যবহার করছেন। সিএনজি অটোরিক্সায় যাতায়াত করছেন ৭ শতাংশ নারী। কাজেই গণপরিবহণকে আমরা নারীবান্ধব করতে পারলে কর্মেেত্র নারীদের অংশগ্রহণ আরো বাড়বে।
কিন্তু শুধু আসন নিশ্চিত করলেই নারীবান্ধব গণপরিবহণ পুরোপুরি নিশ্চিত হবে তা বলা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং অ্যাকশন এইড বাংলাদেশের জরিপে দেখা গেছে নারীরা বিভিন্ন স্থানে যে হয়রানির শিকার হন বিশেষ করে যৌন হয়রানি তার ২৩ শতাংশই হয় গণপরিবহনে এবং এর ৫৬ শতাংশই ঘটে থাকে বাসে বা লেগুনায় ওঠা-নামার সময়।
টিকিট কাউন্টারে ২২ শতাংশ এবং চালক ও কন্ডাক্টর দ্বারা ১৮ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন। আর গণপরিবহনের ভেতরে এই হয়রানির মাত্রা ৪ শতাংশ। আবার গণপরিবহনে যাতায়াতকারী অর্ধেক নারীই ভোগেন যৌন হয়রানির আতঙ্কে। যাত্রী পরিবহন কল্যাণ সমিতির হিসেবে ২০১৫ সালে বাসে যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন ৪৩ জন নারী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহণ সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ স্বদেশ খবরকে বলেন, আমরা নারীদের আসন নিশ্চিত করার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছি। সরকার এ বিষয়ে আইনও করেছে। মিনিবাসে ৬ টি এবং বড় বাসে ৯টি সিট নারীর জন্য সংরতি থাকবে। দ্বিতল বাসে এ সংখ্যা হবে ১৩টি। চালক, কন্ডাক্টরদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পেলে আমরা সাথে সাথে ব্যবস্থা নিচ্ছি। যাত্রীদের সাথে অশোভন আচরণ এবং তার দ- সম্পর্কেও আমরা লিখিত নির্দেশনা দেবো। আমরা সচেতনতামূলক আরও কর্মশালার আয়োজন করবো।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপরে হিসাব অনুযায়ী এখন পর্যন্ত তারা দেড় লাখ চালককে প্রশিণ দিয়েছেন যেখানে যাত্রীদের প্রতি বিশেষ করে নারীদের প্রতি আচরণের বিষয়টিও তাদের প্রশিণে আলোচনা করা হয় বলে জানিয়েছে কর্তৃপরে চেয়ারম্যান।
আইন কিংবা অবকাঠামোর উন্নয়নের পাশাপাশি মানসিক পরিবর্তনের জায়গাটিতেও নজর দেয়া জরুরি বলে মনে করেন মনোবিজ্ঞানী ড. মোহিত কামাল। পুরুষদের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে, নারীর প্রতি সম্মানের বিষয়টিতে তাদের খেয়াল রাখতে হবে এবং সেটি যদি পরিবার থেকে গড়ে ওঠে তাহলে গণপরিবহনে পুরুষদের আচরণে পরিবর্তন আসবে বলেও মনে করেন এই মনোবিজ্ঞানী।
আর নারীদের জন্য আলাদা বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে বলেও জানিয়েছে সরকারি পরিবহন সংস্থা বিআরটিসি। ঢাকা শহরে তাদের বহরে বর্তমান ১৭টি বাসের সঙ্গে আরও নতুন বাস যোগ হবে আগামী এক বছরে।
সুতরাং আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো গেলে গণপরিবহনে নারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে সম হবেনÑ এমনটাই আশা সকলের।