কলাম

ইভিএমে কারচুপি অসম্ভব : রাজনৈতিক দলগুলোর আস্থার জন্যই ইভিএম বেশি প্রয়োজন

-হায়দার আলী, ইসি কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও
অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

তারেক জোয়ারদার
নির্বাচন কমিশন যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম কিনতে যাচ্ছে, সেগুলো বাংলাদেশে নির্বাচনের সব ধরনের কারচুপি মোকাবিলার বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কমিশনের কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক হায়দার আলী, যিনি ২০০৬ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত কমিশনের আইডিয়া প্রকল্পের সদস্য ছিলেন। এই কমিটিই সে সময় আঙুলের ছাপসহ জাতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করে। পরে স্মার্ট কার্ড প্রকল্পে কাজ করতে করতে এই ইভিএম প্রকল্পে যুক্ত হন তিনি।
নির্বাচনের সনাতন পদ্ধতির বদলে ইভিএমে ভোট নিতে আগ্রহী নির্বাচন কমিশন ও সরকার। তবে আগামী জাতীয় নির্বাচনে এই যন্ত্র ব্যাপকভাবে ব্যবহার হবে না। যদিও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে দেড় লাখ ইভিএম কেনা হচ্ছে। ইভিএম কেনা হবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অধীনে থাকা বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে। প্রতিটি যন্ত্রের দাম পড়ছে ২ লাখ ৫৫ হাজার টাকা।
বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের বিরোধী। তাদের দাবি, এই যন্ত্র দিয়ে দূর থেকে ভোট নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কিন্তু ইসি কারিগরি কমিটির সদস্য অধ্যাপক হায়দার বলছেন, বাস্তবে এর কোনো সুযোগই নেই।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ইভিএম ব্যবহারের চেষ্টা হয় বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে নিয়োগ পাওয়া নির্বাচন কমিশনের আমলে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচনের পর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে একটি কেন্দ্রে এই ইভিএম ব্যবহার করা হয়। পরে কাজী রকিবউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে কমিশন ২০১২ সালে কুমিল্লায় এবং ২০১৩ সালে পাঁচ সিটি নির্বাচনে কিছু কেন্দ্রে ইভিএম ব্যবহার করে। এই যন্ত্রটি তৈরি করেছিল বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট। কিন্তু সেই যন্ত্রে কিছু সমস্যা ছিল।
তবে বর্তমান নির্বাচন কমিশন যে ইভিএম ব্যবহার করছে, তাতে কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি। ইসির কারিগরি কমিটির বিশেষজ্ঞ হায়দার আলী বলেন, আগের ইভিএমের চেয়ে এর পার্থক্য হলো ‘বায়োমেট্রিক অথিনটিফিকেশন’। এটা নির্ভুল আর তা প্রমাণ হয়েছে বিভিন্নভাবে। এই ইভিএমে ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে আইডিন্টিফিকেশন করা হয়েছে। ভোটার নিজে না এলে ভোট দিতে পারবে না। আবার অনেক দেশে অনলাইন ব্যবস্থা আছে। আমরা এটা কমপ্লিটলি অফলাইন করেছি। আর ইন্টারনেট সংযোগ থাকবে না বলে এটি দূর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এই ইভিএমের উদ্ভাবক হলেন সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল সুলতানুজ্জামান মো. সালেহ উদ্দিন।
হায়দার আলী বলেন, একটা ভোট কেন্দ্রে সম্ভাব্য যতগুলো অনিয়ম হতে পারে তার সবই যেন মোকাবিলা করতে পারে সেই বিবেচনা করেই এই মেশিনটা বানানো হয়েছে।
এই ইভিএমে আগে থেকেই কোনো দলের ভোট সংখ্যা কমান্ড দিয়ে রাখা যায় বলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর যে সন্দেহ, তারও জবাব দিয়েছেন ইসির এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, এটা যদি সম্ভব হয় তা হলে প্রচলিত পদ্ধতিতেই সম্ভব। ধরুন, পেশিশক্তি ব্যবহার করে একটা কেন্দ্র দখল করে নিল। অথবা একটা বুথ দখল করে নিয়ে এক শ’ পেজের একটা ব্যালট পেপারে কয়েক মিনিট লাগবে সিল মারতে। এটা আমরা ঠেকানোর ব্যবস্থা করেছি। ভোটকেন্দ্র দখল করে, সব এজেন্ট বের করে দিলেও একটা ভোটও দিতে পারবে না। কারণ ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে অথিন্টিফিকেশন করালেই কেবল এ মেশিনে ভোট দেয়া সম্ভব। অবশ্য এটা জোর করে কাউকে দিয়ে করা যাবে। কিন্তু ভেবে দেখুন, এভাবে ১০০ লোককে ধরে আনা কি সম্ভব?
হায়দার আলী জানান, ইভিএম বাংলাদেশে তৈরি হলেও এটি নির্মাণে হার্ডওয়্যার আনা হচ্ছে চীন থেকে। আর এটি সরবরাহ করবে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত কোম্পানি ‘অ্যাপল’। বিদ্যুৎ ছাড়াও এ মেশিনের ব্যাটারি টানা ৪৮ ঘণ্টা চলতে পারবে।
ইভিএম নিয়ে বিভিন্ন দল ও ব্যক্তির সন্দেহ সংশয় দূর করার একটি পন্থাও বাতলে দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন দেশ ও দেশের বাইরের হ্যাকারদের আমন্ত্রণ জানাতে পারে। কেউ এই ইভিএম হ্যাক করতে পারলে হ্যাকিংয়ের জন্য হ্যাকারকে পুরস্কৃতও করা যেতে পারে। আর পুরস্কার ঘোষণা করতে পারে খোদ নির্বাচন কমিশনই। কেউ যদি এই মেশিনে ফেক আইডিন্টিফিকেশনে ভোট দিতে পারে, তাহলে তাকে পুরস্কার দেয়া হবে। তাহলে এই মেশিন কতটা শক্তিশালী সেটা প্রমাণিত হবে। এতে মানুষের ভেতরে আস্থা বাড়বে। এছাড়া কমিশন প্রতিটি রাজনৈতিক দলকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে। তারা কারিগরি লোক নিয়ে এসে মেশিনটিতে কোনো ভুল আছে কি না বা কোনো দুর্বলতা আছে কি না, তা পরীক্ষা করতে পারে।
অধ্যাপক হায়দার বলেন, আমরা যে ডিজাইন খুঁজে বের করেছি, আমি নিশ্চিত এর মধ্যে কোনো বিশেষজ্ঞ কোনো ভুল খুঁজে বের করতে পারবে না। কোনোভাবেই ভোট কেন্দ্রে না গিয়ে অথেন্টিক মানুষ ছাড়া কেউ কোনোভাবে ভোট দিতে পারবে না।
ভোটারদের ইভিএমের সঙ্গে পরিচিত করানোর পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, কমিশন যত দ্রুত এটার প্রচারণা করতে পারে সেটাই ভালো হবে। শুধু পত্রিকা, রেডিও এবং টেলিভিশনেই নয়, বরং ভোটারদের সরাসরি দেখার ব্যবস্থা করা উচিত। কেউ ফেক ভোট দিতে পারে কি নাÑ সেই সুযোগ তাদেরকেও দেয়া উচিত। তাহলেই নতুন ইভিএম মেশিন নিয়ে মানুষের মনে আস্থা তৈরি হবে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ইভিএম বিশেষজ্ঞ ঢাবি অধ্যাপক হায়দার বলেন, নিররদেরও এই যন্ত্র ব্যবহারে কোনো সমস্যা হবে না। তিনি বলেন, মানুষ পড়ালেখা না করেও ইংরেজি বাটনের মোবাইল ফোন ব্যবহার করছে। মানুষ তো এটুকু শিখেই ফেলেছে। ইভিএম মেশিনেও কিছু বাটনে চাপ দেয়ার বিষয় আছে। এটুকু কেন তারা শিখতে পারবে না?