কলাম

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনি দৌড়ে পিছিয়ে আছে বিএনপি

বিভুরঞ্জন সরকার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর তিন মাসও বাকি নেই। নিয়ম অনুযায়ী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচন হতে হবে। আগে ২৭ ডিসেম্বর নির্বাচনের একটি সম্ভাব্য তারিখ শোনা গেলেও এখন শোনা যাচ্ছে, এটা দিন কয়েক পিছিয়ে যেতে পারে। তবে জানুয়ারির শুরুতে নির্বাচন হতেই হবে। নির্বাচন কমিশন তাদের সুবিধামতো সময়ে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবেন।
নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হবে কি না, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে হবে কি না, নির্বাচনে ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহৃত হবে কি না ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক, আলোচনা-সমালোচনা আছে। তবে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে। প্রস্তুতিকাজে এগিয়ে আছে মতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
আওয়ামী লীগ প্রায় একবছর ধরেই নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছে। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেই বিভিন্ন সভা-সমাবেশে দলের প,ে নৌকার পে ভোট চাইছেন। নির্বাচনকেন্দ্রিক আরো কিছু সাংগঠনিক প্রস্তুতিও আওয়ামী লীগ নিয়েছে। জাতীয় পার্টিও নির্বাচনি প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী দলের নামে এবং দলীয় প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে না, তবে তারাও মাঠে আছে। প্রস্তুতি নিচ্ছে অন্য ছোট দলগুলো। যেসব দলে একজন প্রার্থীও জেতার মতো নেই, সে রকম দলও নির্বাচন থেকে দূরে থাকতে চাইছে না। বাম দলগুলোর মধ্যে সিপিবিও তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছে।
নির্বাচনি দৌড়ে সবচেয়ে পিছিয়ে আছে বিএনপি। অথচ এগিয়ে থাকার কথা তাদেরই। কারণ মতার রাজনীতির মূল প্রতিপ বিএনপি। বিএনপি আদৌ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা সেই সন্দেহেরই এখনও অবসান হয়নি। নির্বাচনে যাওয়ার ব্যাপারে বিএনপির মধ্যে নানামুখী প্রবণতা আছে। কেউ চান খালেদা জিয়া ছাড়া নির্বাচন নয়। তাকে মুক্ত করেই নির্বাচনে যাওয়া যেতে পারে। কারো চাওয়া নিরপে সরকার। কেউ চান সবার অংশগ্রহণ। কেউ আবার যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে অংশগ্রহণের প।ে আওয়ামী লীগ যাতে ফাঁকা মাঠে গোল দিতে না পারে, সে মনোভাবও বিএনপির আছে। সরকারকে চাপে রাখার জন্য বিএনপি নানা উপায় যে ভাবছে তা স্বীকার করতেই হবে। বিএনপি সরকারবিরোধী একটি বৃহত্তর ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টায় আছে। ২০ দলীয় জোট বজায় রেখেও বিএনপি ছোটখাট অন্য দলগুলো নিয়ে আরো বড় নির্বাচনি ঐক্য করতে চায়। দেখাতে চায়, সবাই তাদের সঙ্গে আছে এবং সরকার আছে একা, বিচ্ছিন্ন।
কিন্তু শেষপর্যন্ত সরকারবিরোধী বৃহত্তর ঐক্য গড়ে ওঠার সম্ভাবনা কম। মত-পথ এবং রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিত্বের সংঘাত ইত্যাদি বিষয়গুলো ঐক্যের স্বার্থে দূরে রাখার কথা থাকলেও সেগুলোই সামনে আসছে। ‘ঠেলাঠেলির ঘর, খোদায় রা কর’ বলে গ্রামে যে প্রবাদ চালু আছে বিএনপিকেন্দ্রিক ঐক্য অনেকটা সে রকমই হবে।
যাহোক, বিএনপি যেমন সরকারকে বেকায়দায় ফেলার কৌশল করছে, সরকারও হাত-পা ছেড়ে বসে নেই। সরকার কোনোভাবেই বিএনপির জন্য সড়ক পরিষ্কার করে দেবে না, বরং বিএনপির পথ কণ্টকিত করার সব উপায় কাজে লাগাবে। সরকারের হাতে বড় অস্ত্র আছে মামলা। বিএনপির কেন্দ্র ও তৃণমূলে এমন কোনো বড় নেতা নেই যাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা নেই। ফলে আদালতের বারান্দাতেই অনেক সময় কাটছে বিএনপি নেতাদের। তাছাড়া নির্বাচনের ব্যাপারে বিএনপি এখনও সিদ্ধান্তহীন। বিএনপি যত বেশি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগবে, তাদের তি তত বাড়বে বলে অনেকেই মনে করেন।
দলগুলোর পাশাপাশি নির্বাচনে যারা প্রার্থী হতে চান তারাও বসে নেই। যারা ঢাকায় বসে স্থানীয় রাজনীতিতে ছড়ি ঘোরান তারাও কিন্তু ঢাকা ছেড়েছেন। সাধারণ ভোটারদের ‘দোয়া’ নেয়ার প্রতিযোগিতা চলছে। রঙিন পোস্টার, বিলবোর্ড, ব্যানারে মানুষের চোখ ঢেকে যাচ্ছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেয়ার প্রশ্নে দ্বিধাদ্বন্দ্বে থাকলেও নির্বাচনে অংশগ্রহণে ইচ্ছুক প্রার্থীরা মাঠে নেমে পড়েছেন। জনসংযোগ করছেন। কোনো কোনো আসনে বিএনপির একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীরও নাম শোনা যাচ্ছে। তবে প্রার্থীজট সবচেয়ে বেশি আওয়ামী লীগে।
বড় দলগুলোতে সব আসনেই মনোনয়নদৌড়ে অনেকেই অংশ নিয়ে থাকেন। দিন দিন প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়ছে। রাজনীতি এখন একদিকে বাণিজ্য, অন্যদিকে সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তির ভিত্তি। তাই জনসেবার মহান ব্রত নিয়ে নয়, নিজেকে জাহির করা, নিজের মতার দৌরাত্ম্য দেখানো কিংবা বাড়ানোর জন্যও এখন অনেকে নির্বাচন করতে চান, রাজনৈতিক দলে নাম লেখান। প্রার্থী মনোনয়নে এবার তাই আওয়ামী লীগকে বেশ হিমশিম খেতে হবে।
‘আওয়ামী লীগই আবার মতায় আসছে’ এই ধারণা থেকে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হওয়ার প্রবণতাও বাড়ছে। নৌকা পেলেই এমপি আর এমপি হলেই সুখ ও সমৃদ্ধি। এমন সুযোগ কে হেলায় হারাতে চায়!
কোনো কোনো আসনে আওয়ামী লীগ থেকে ১৫ জন মনোনয়ন প্রার্থীও আছেন বলে শোনা যাচ্ছে এবং এদের কেউ নাকি কারো চেয়ে কম নন। এত বিপুলসংখ্যক প্রত্যাশীর মধ্য থেকে একজনকে বেছে নেয়া সহজ কাজ নয়। যাকে নৌকা প্রতীক দেয়া হবে তিনি প্রসন্ন হবেন। কিন্তু নৌকাবঞ্চিত অপ্রসন্নরা কী করবেন? যিনি নৌকা পাবেন তার পে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কাজ করবেন? নাকি তাকে হারিয়ে প্রমাণ করবেন যে মনোনয়ন দেয়ার সিদ্ধান্তটা ভুল ছিল?
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের মনোনয়ন না পেয়ে নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে ‘খবর’ আছে বলে দলের নেতাদের সাবধান করেছেন। বলেছেন, বিদ্রোহ করলে সঙ্গে সঙ্গে বহিষ্কার। তিনি বলেছেন, আওয়ামী লীগ যদি আওয়ামী লীগের শত্র“ হয়, বাইরের শত্র“র প্রয়োজন হবে না।
ওবায়দুল কাদের দলের সমস্যাটা সঠিকভাবে চিহ্নিত করেছেন। নির্বাচন এলে আওয়ামী লীগই যে আওয়ামী লীগের শত্র“ হয় সেটা পরীতি বা প্রমাণিত সত্য। বিরোধ-কোন্দল অন্য দলেও আছে। মনোনয়ন নিয়ে অসন্তোষ বিএনপিতেও হয়, এবারও হবে। কিন্তু দলীয় প্রার্থীকে হারিয়ে কেউ নিজের জনপ্রিয়তা প্রমাণ করতে চান বলে মনে হয় না। আওয়ামী লীগে এই প্রবণতা আছে। দলীয় শৃঙ্খলার েেত্র ক্রমাগত শৈথিল্য দেখিয়ে আসায় আওয়ামী লীগে এখন চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। বহিষ্কারের হুমকিতে কেউ ভয় পায় না। বহিষ্কৃতদের দলে ফিরিয়ে নেয়ার নজিরও কম নেই। তাই এটাকে অনেকেই কথার কথা বলে মনে করেন। সেজন্যই দলের মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার কাজটি আওয়ামী লীগের অগ্রাধিকার ভিত্তিতেই করা উচিত। দল বিশৃঙ্খল হলে নির্বাচনি লড়াইয়ে খারাপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকবে।
আওয়ামী লীগকে এখন শুধু দল সামলাতে হয় না, জোট এবং মহাজোটও সামলাতে হয় এবং হবে। নিজ দলেই যখন ভয়াবহ প্রার্থীজট তখন জোটসঙ্গী অন্যদলের প্রার্থীর জন্য আসন ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি খুব সহজে নিষ্পত্তিযোগ্য নয়। তাই আসন বণ্টন, আসন সমঝোতা, নিজ দলের প্রার্থী চূড়ান্তকরণ ইত্যাদি বিষয়গুলো ঝুলিয়ে না রেখে দ্রুত ফয়সালা করা দরকার। জনপ্রিয় এবং সৎ ইমেজসম্পন্ন প্রার্থীদের মনোনয়ন দিতে চেষ্টা করতে হবে। সমালোচিত, নিন্দিত ব্যক্তি যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে হবে।
শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে ভুলভ্রান্তি হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকবে। এবার আওয়ামী লীগ একদিকে যেমন সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, অন্যদিকে তেমনি সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জও বেশি। নির্বাচন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক করার একটি চাপ সরকারের ওপর আছে এবং থাকবে। সেটা যেমন দেশের ভেতরে, তেমনি দেশের বাইরেও। নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্রও চলবে। জঙ্গি হামলার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। বিএনপি ঘোলা পানিতে মাছ শিকারের অপচেষ্টা সবসময়ই করে। কাচ বা ভঙ্গুর দ্রব্যাদি বহনের জন্য যেমন সাবধানবাণী লেখা থাকে, ‘হ্যান্ডল উইথ কেয়ার’, তেমনি সরকারকেও সবকিছু যতœ ও সতর্কতার সঙ্গে সামাল দিতে হবে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক