প্রতিবেদন

কার্বন নিঃসরণে মহাবিপর্যয়ের হুঁশিয়ারি পরিবেশবিজ্ঞানীদের

নিজস্ব প্রতিবেদক : উষ্ণতা বৃদ্ধিই যে আগামী পৃথিবীর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি Ñ আবারও তা স্মরণ করিয়ে দিলেন বিজ্ঞানীরা। তারা বলছেন, কার্বন নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১২ বছরের মধ্যেই পৃথিবীতে নেমে আসবে মহাবিপর্যয়! পরিবেশ বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, আগামীতে খরা, বন্যা ও ভয়াবহ তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগ ধেয়ে আসছে। যদি উষ্ণতা বৃদ্ধির হার দেড় শতাংশের মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করা না যায়।
জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক আন্তঃরাষ্ট্রীয় প্যানেল (আইপিসিসি) তাদের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, ২০৩০ থেকে ২০৫২ সালের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে। তাদের প্রতিবেদন থেকে এটা পরিষ্কার, নিঃসরণের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৫০ সালের মধ্যে ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশসহ আরো অনেক দেশ।
জলবায়ু ইস্যুতে কয়েক বছর পরপরই প্রতিবেদন দেয় আইপিসিসি। গত ৮ অক্টোবরও আইপিসিসি’র প থেকে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং অব ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি’ শিরোনামের একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার সর্বোচ্চ দেড় ডিগ্রি সেলসিয়াসে ধরে রাখার জন্য খুব বেশি সময় হাতে নেই। ভয়াবহ পরিস্থিতি এড়াতে ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণের হার ২০১০ সালের তুলনায় ৪৫ শতাংশ কমিয়ে আনতে হবে। আর ২০৫০ সাল নাগাদ তা শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। এেেত্র জ্বালানি, শিল্প, ভবন, পরিবহন ও শহরগুলোতে ব্যাপক পরিবর্তন আনতে হবে।
প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্ব এখনও ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস হারে উষ্ণ হচ্ছে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জলবায়ুবিজ্ঞান বিষয়ক শিক অ্যান্ড্রু কিং এক বিবৃতিতে বলেন, এটা উদ্বেগের। কারণ আমরা জানি, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির হার ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করলে অনেক সমস্যা হবে। বিশ্বের অনেক জায়গায় তাপদাহ দেখা দেবে, উত্তপ্ত গ্রীষ্ম দেখা যাবে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাবে এবং ভয়াবহ খরা ও ভারী বর্ষণ হবে।
অন্যদিকে, আইপিসিসির প্রতিবেদনটির নেতৃত্বস্থানীয় একজন লেখক বলেন, কিছুসংখ্যক মানুষের জন্য নিঃসন্দেহে এটি জীবন-মৃত্যুর পরিস্থিতি।
তবুও আইপিসিসি’র গবেষকরা হতাশ হতে নারাজ। উষ্ণতা বৃদ্ধির হার সীমিত রাখতে হলে জরুরি ভিত্তিতে ও নজিরবিহীন পরিবর্তন প্রয়োজন হবে। তবে বিশ্বনেতারা যদি এখন থেকে কোনোভাবে ভবিষ্যৎ মানবসৃষ্ট উষ্ণতাকে আধা ডিগ্রি সেলসিয়াসে সীমিত করতে পারেন, তবে বিশ্বের আবহাওয়া ইতিবাচক অবস্থার দিকে যাবে। পানিসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে। কমে যাবে উষ্ণতা ও কুয়াশা এবং সংক্রামক রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির পরিমাণ প্রায় চার ইঞ্চি হ্রাস পাবে।
আইপিসিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মিঠাপানির মাছ চাষের ওপর নির্ভরশীলরা বিপাকে পড়বে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে পারে। উন্নয়নশীল দ্বীপরাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে।
আইপিসিপির বিজ্ঞানীরা বিশ্বনেতাদেরও কঠোর সমালোচনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু সম্মেলনে ১৫০টি দেশ গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমন কমানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন নেই। শুধু তাই নয়, রাষ্ট্রনেতারা জলবায়ু তথা পরিবেশের এই ভয়ানক বিপদের কথা বুঝতেই পারেন না বলেও দাবি বিজ্ঞানীদের।
উষ্ণতা বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে ভাষাতাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। সেখানে তিনি জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিকে মানবজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ বলে বর্ণনা করেছেন। চমস্কি বলেন, বিশেষজ্ঞদের অনুমানের সাথে আমি একমত যারা আণবিক বিজ্ঞানীদের বুলেটিনে ধ্বংসপ্রাপ্তির দিনটাকে ধার্য করেছে। তারা ধ্বংসের মুহূর্তটাকে মধ্যরাতের দুই-তিন মিনিটি এগিয়ে এনেছে। বৈজ্ঞানিক সম্প্রদায়ের কাছে এখন এটা গ্রহণযোগ্য যে, পরিবেশগত পরিবর্তনের কারণে আমরা একটি নতুন ভূতাত্ত্বিক যুগে প্রবেশ করেছি, যেটিকে বলা হয় এন্থ্রোপসিন, যেখানে পৃথিবীর জলবায়ু মানুষ কর্তৃক আমূল পরিবর্তিত হচ্ছে, যা পৃথিবীকে রূপান্তরিত করছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি গ্রহে, যেখানে একজন মানুষ আমাদের সহ্যমতার মধ্যে থাকা পূর্ণাঙ্গ মনুষ্যজীবন ধারণ করতে পারবে না। এ কারণে এটি বিশ্বাসযোগ্য যে আমরা ষষ্ঠতম বিলোপের যুগে প্রবেশ করেছি, যেটি ৬৫ মিলিয়ন বছর পূর্বের চেয়েও বৃহৎ অঙ্কে প্রজাতি বিনাশের পর্ব। ধারণা করা হয়, তখন গ্রহাণুর আঘাতে দুই-তৃতীয়াংশ প্রজাতি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
বায়ুম-লীয় কার্বন-ডাই-অক্সাইড গত ৫৫ মিলিয়ন বছরের মধ্যে নজিরবিহীন হারে বাড়ছে। উদ্বেগের সাথে ১৫০ জন বিশিষ্ট বিজ্ঞানীর একটি বিবৃতিকে উদ্ধৃত করতে হয়, মেরুর বরফ গলন, ভূগর্ভস্থ চিরহিমায়িত অঞ্চল থেকে মিথেন নিঃসরণ ও ব্যাপক হারে অগ্নিকা-ের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বর্ধিত হচ্ছে এবং এটি হয়ত কমানো সম্ভব নয়। নিকট ভবিষ্যতে মানবজাতিসহ পৃথিবীর প্রাণীকূলের জন্য সর্বনাশা পরিণত অপো করছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা এবং মেরুর বরফ গলনের মাধ্যমে পানির উৎস ধ্বংস হওয়া হয়ত মানুষের ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনছে। জলবায়ু পরিবর্তন ঘটে শিল্পোন্নতিতে শক্তির ব্যবহারে যার সিংহভাগ নির্ভর করে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর। অর্থনৈতিক উন্নতি পুরোপুরি নির্ভর করে জীবাশ্ম শক্তির ওপর, এর পরিবর্তন খুবই কঠিন, যেখানে পারমাণবিক শক্তি শুধু সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয়। অনেকে মনে করেন, এটি অসম্ভব। বস্তুত সকল বৈজ্ঞানিক গবেষণা ১৯৭৫ সাল থেকে উষ্ণতা বৃদ্ধিকে নির্দেশ করেছে, সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমস নিশ্চিত করেছে বিজ্ঞানীদের দেয়া কয়েক দশকের সতর্কতা আর কেবল তত্ত্বগত জায়গায় নেই, মাটির উপরের বরফ গলন আর সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছেই।
পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন, সাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি দ্বীপরাষ্ট্রসমূহকে গ্রাস করে ফেলবে, যাদের জাতিসংঘের ২৫ শতাংশ ভোট আছে এবং শেষ পর্যন্ত হয়ত পুরো আমাদের সভ্যতাকেও। এ উপলব্ধিটা আঘাতমূলক এবং এ আঘাতের প্রথম প্রতিক্রিয়া হচ্ছে এটিকে অস্বীকার করা। যেহেতু এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিকভাবে কিছুটা অনিশ্চয়তা থেকে যাচ্ছে, তাতে পরিবর্তন যে ঘটছে এটিকে স্বাভাবিকভাবে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এটা স্বাভাবিক হলেও খুবই বিপদজনক।