ফিচার

ঘুরে আসুন নেপাল

স্বদেশ খবর ডেস্ক : দেশের বাইরে কোথাও ঘুরে আসতে ইচ্ছে করছে, অথচ পাসপোর্টে ভিসা লাগানোর ঝক্কি পোহাতে ইচ্ছে করছে না? তাহলে আপনার গন্তব্য হতে পারে হিমালয়ের দেশ নেপাল। বাংলাদেশিদের জন্য নেপাল সরকার অন অ্যারাইভেল ভিসা সুবিধা রাখায় আপনি আগ-পিছ না ভেবে নিশ্চিন্তেই কেটে ফেলতে পারেন নেপালগামী যেকোনো বিমানের টিকিট। রাউন্ড ট্রিপের বিমান টিকিটের খরচ পড়বে ১৭ থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। এক সপ্তাহ থেকে ১০ দিনের ভ্রমণ পরিকল্পনা করলে আপনি টিকিটের বাইরে ৩০০ থেকে ৫০০ ডলার পকেটে নিয়েই ঘুরে আসতে পারবেন নেপাল। অসাধারণ কয়েকটা দিন কাটবে আপনার।
নেপাল এমন একটি দেশ যেখানে আপনি পাবেন আপনার ছুটি উপভোগের সবকিছু। ঐতিহাসিক সব মন্দির, স্বচ্ছ হ্রদ, সারি সারি সবুজ ভ্যালি, বন্যপ্রাণী সংরণ কেন্দ্র, পাহাড় কিংবা রাজপ্রসাদসমূহÑ সব কিছু দেখেই মুগ্ধ হবেন আপনি।
নেপাল ভ্রমণের সেরা সময় হচ্ছে সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত। বিমানে ঢাকা থেকে কাঠমান্ডু পৌঁছতে সময় লাগবে ১ ঘণ্টা ১০ মিনিটের মতো। ত্রিভুবন এয়ারপোর্টে নামলেই ইমিগ্রেশন ডেস্ক আপনার পাসপোর্টে দিয়ে দেবে অন অ্যারাইভেল ভিসা। এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়েই নিয়ে নিন ট্যাক্সি। সোজা চলে যান থামেল এলাকায়। থামেল হচ্ছে কাঠমান্ডুর ভেতর ছোট একটি এলাকাÑ যেটি মূলত টুরিস্টদের জন্যই করা।
এয়ারপোর্ট থেকে বের হলে ট্যাক্সিওয়ালারাই আপনাকে নিয়ে যাবে থামেল এলাকায়। চাইলে পছন্দের হোটেল, ট্যুর অপারেটর বেছে নিতে সাহায্য করবে আপনাকে। ভাড়া নেবে ৩০০ নেপালি রুপি। দরদাম করে উঠলে ২০০ রুপিতেও থামেল পৌঁছতে পারবেন। হাজার রুপির মধ্যে বেছে নিন ওয়াইফাইসমৃদ্ধ হোটেল রুম। একটু বিশ্রাম নিয়ে রাতের কিছুটা সময় ঘুরুন থামেলের রাস্তায়। দেখবেন অসংখ্য দোকান, তাতে অসংখ্য আকর্ষণীয় জিনিস সাজানো। দেখে মুগ্ধ হবেন আপনি। দেখবেন, আপনার মতোই নানা দেশের নানা পর্যটক কাঁধে ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে থামেলের রাস্তায়। মাঝে মাঝেই নানা রকম রেস্টুরেন্ট, ক্যাফে, ড্যান্স বার। চলার পথে অনেক রেস্টুরেন্টের লাইভ মিউজিক শুনতে পাবেন অথবা কোনো বার থেকে ভেসে আসা কোনো ড্যান্স মিউজিক। অথবা কোনো নেপালি গানের সুর। মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বলা যায়। তবে জিনিসপত্র কেনার সময় দরদাম করতে ভুলবেন না।
রাতটা হোটেলে কাটিয়ে সাড়ে ৭টার মধ্যে উঠে পড়–ন পোখরাগামী ট্যুরিস্ট বাসে। চাইলে হোটেল বা ট্যুর অপারেটরই আপনাকে
বাসের টিকিট বা পোখরার হোটেল বুকিং করে দেবে।

পোখরা : নেপালের রাণী
কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা পাড়ি দিয়ে ৬-৭ ঘণ্টায় আপনি পৌঁছে যাবেন অন্নপূর্ণা পর্বত রেঞ্জের উপত্যকা পোখরায়। ভাড়া ৫০০-১০০০ টাকার মধ্যে। বাসগুলো শুধু ট্যুরিস্টদের জন্য। পোখরা যাওয়ার পুরোটা রাস্তাই পাহাড়ি আঁকাবাকা পথ আর পাহাড়ে ঘেরা। দেখে মুগ্ধ হতে বাধ্য হবেন। তবে বাসগুলো যখন পাহাড় বেয়ে ৬০০-৭০০ ফিট উপরে উঠে আবার ঘুরে ঘুরে নিচে নামবে তখন এক ধরনের ভয়ার্ত রোমাঞ্চে ভুগতে পারেন। সারি সারি উঁচু পাহাড়ের মাঝখানে আঁকাবাকা পথ। এক পাশে বয়ে গেছে চমৎকার এক লেক। কী দারুণ এক মিতালি পাহাড়, পথ আর লেকের!
পোখরা যাত্রার মাঝখানে দু’বার বিরতি দেবে ট্যুরিস্ট বাস Ñ ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চ। যেখানেই যাবেন, প্রাকৃতিক দৃশ্য অতুলনীয়।
পোখরাকে বলা হয় নেপালের রাণী। বিকেলে ট্যুরিস্ট বাসগুলো পোখরা পৌঁছার আগেই ট্যাক্সিচালকদের ভিড় জমে যায় বাস টার্মিনালে। আগে থেকে বুকিং দেয়া থাকলে ট্যাক্সি করে চলে যান নির্দিষ্ট হোটেলে। তা না হলে নিজেই ঘুরে ঘুরে পছন্দের হোটেল খুঁজে নিন। এ কাজে নিশ্চিন্তে সাহায্য নিতে পারেন ট্যাক্সিচালকের। চেষ্টা করবেন লেক সাইডে থাকার জন্য। পছন্দের হোটেলে উঠে শাওয়ার নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বের হয়ে পড়–ন। চলে যান কাছের ফিউয়া লেকে। অসম্ভব সুন্দর ছবির মতো একটা লেক। ছোট ছোট নৌকা ভাড়া নেয়া যায় ৪০০ রুপি/ঘণ্টা।

স্মরণকোট
পরদিন ভোরে সূর্যোদয়ের ঘণ্টাখানেক আগে চলে যান স্মরণকোট। সেখানে সূর্য উদয় আর হিমালয় পর্বত দেখার এক অবিস্মরণীয় মুহূর্ত পাবেন। ওখানে গিয়ে মন একদম ভরে যাবে। অবশ্য পরিপূর্ণ সূর্যোদয় ও হিমালয়ের সৌন্দর্য দেখতে হলে আকাশ পরিষ্কার থাকা লাগবে। স্মরণকোটের উঁচু পাহাড়ের একেবারে শীর্ষে থাকা কয়েকতলা ভবনের ছাদে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন অপূর্ব পৃথিবীর খানিকটা আলোকছটা। ভোরের স্নিগ্ধ আলোতে সাদা বরফে আচ্ছন্ন হিমালয় কিভাবে বর্ণিল হয়, দেখতে দেখতে মন ভালো হয়ে যাবে আপনার। অসাধারণ এই মুহূর্তটুকু ক্যামেরাবন্দি করে রাখুন। আপনি তা না করলেও দেখবেন বেশিরভাগ পর্যটকই তা করছে।

ডেভিস ফলস
১৯৬১ সালের ৩১ জুলাইয়ের বিকেল। সুইস তরুণী ডেভিস তার স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে গোসল করতে নামে লেকে। তবে হঠাৎই দ্রুত বেগে নেমে আসা পানির স্রোতে ভেসে যায় ডেভিস। অনেক খোঁজাখুঁজির পর দিন কয়েক পর ডেভিসকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। তবে জীবিত নয়, মৃত। পরবর্তীতে ডেভিসের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ঝর্ণাধারাটির নামকরণ করা হয় ডেভিস ফলস।
৫০০ মিটার দীর্ঘ এবং ১০০ মিটার গভীর এ নয়নাভিরাম ঝর্ণাপ্রবাহটি বছরের প্রায় সবসময় চলমান থাকে। তবে জুন-সেপ্টেম্বরের দিকে এর গতি তারুণ্যদীপ্ত হয়ে উঠে।
২০ টাকা টিকিট। পানির তীব্র স্রোত। কি গর্জন তার! এখানে এল পর্যটকরা সবাই ছবি তোলায় ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

ব্যাট কেভ
এরপর চলে যেতে পারেন ব্যাট কেভ (বাদুড়ের গুহা)-এ। ৫০ টাকা টিকিট আর ৫০ টাকা দিয়ে একটা চার্জার লাইট ভাড়া নিয়ে হাঁটুন অন্ধকার গুহায়। যত ভেতরে যাবেন দেখবে হাজারে হাজারে বাদুড়!

মাহেন্দ্র নাথ কেভ
এই গুহায় যেতে পথে পড়বে মাহেন্দ্র নাথের গুহা। এখানেও যেতে পারেন। বেশ লম্বা গুহা। তবে ভেতরে খানিকটা আলো আছে। মনে হবে যেন আপনি প্রাচীন কোনো রাসের গুহাতে নেমেছেন।

শ্বেতী রিভার ও গোরখা মিউজিয়াম
পরদিন যেতে পারেন শ্বেতী রিভার ও গোরখা মিউজিয়ামে। শ্বেতী রিভারের পানি দুধের মতো সাদা এবং ভীষণ ঠা-া। নদীর ওপর নির্মিত ব্রিজে দাঁড়িয়ে দেখতে পাবেন শ্বেতীর সাদা পানি শব্দ করে বয়ে যাচ্ছে।
পিস প্যাগোডা
পাহাড়ের চূড়ায় অসম্ভব সুন্দর একটি তুষার শুভ্র প্যাগোডা। চারদিক কি পরিচ্ছন্ন আর পবিত্রতা ছড়ানো। মনে শান্তি শান্তি ভাব চলে আসে নিমিষে। পাহাড়ের অনেক উঁচুতে বলে দূরের দৃশ্য দেখে মন হারাবে বারেবার। কাছেই কিছু রেস্টুরেন্ট আছে। কফি খেতে খেতে উপভোগ করুন সন্ধ্যার বর্ণিল
শহর।
এছাড়াও পোখরায় আছে স্রোতস্বিনী নদীর ফেনিল-শুভ্র জলে রাফটিংয়ের অ্যাডভেঞ্চার। যারা আরও সাহসী তাদের জন্য আছে প্যারাগ্লাইডিংয়ের সুযোগ। ১০০০ টাকা দিয়ে আকাশ থেকে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবেন। পোখরার আশপাশে নদী ছাড়াও আছে লেক, ঝরণা, মন্দির। পকেটে টাকার জোর থাকলে বিমান বা হেলিকপ্টারে চড়ে এভারেস্টসহ বিভিন্ন পর্বতশৃঙ্গের কাছাকাছি চলে যেতে পারেন। এক ঘণ্টার মাউন্টেন ফাইটে অন্তত দশটি পর্বতশৃঙ্গের পাশ দিয়ে উড়ে আসতে পারবেন।

ভগতপুর
ভগতপুর সব রাজারাজড়াদের দরবার। বড় বড় স্তম্ভ, পুরাকীর্তি ও কারুকাজে ভরা। এসবের ঐতিহাসিক মূল্য অনেক।

নাগরকোট
নাগরকোটের পথ অনেকটা আমাদের বান্দরবানের মতোই। পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সরু রাস্তা। একপাশে উঁচু পাহাড় আরেক পাশে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে অচেনা সব লম্বা লম্বা গাছের সারি। চোখ জুড়িয়ে যায়। পুরো পথটাই আপনার মনকে মাতোয়ারা করে রাখবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখতে দেখতে উঠে যান প্রায় ৭০০০ ফিট উপরে। অত উঁচুতে উঠে চারপাশে তাকাতেই আপনি মনের অজান্তে বলে উঠবেন ‘ওয়াও’!