প্রতিবেদন

জনগণের গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন -সজীব ওয়াজেদ জয়

নিজস্ব প্রতিবেদক : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিককালে গুজব ও অসত্য সংবাদের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় কারণে সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করেছে। যদিও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে সাংবাদিকদের নানা সংগঠন, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক বেশকিছু সংস্থা আপত্তি জানায়। বিশেষ করে দৈনিক পত্রিকার সম্পাদকদের সংগঠন ‘সম্পাদক পরিষদ’ এ নিয়ে সবচেয়ে বেশি সোচ্চার। এ প্রেক্ষাপটে তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্পাদক পরিষদের নেতাদের নিয়ে বসেন। সেখানে সম্পাদক পরিষদ নেতৃবৃন্দ জাতীয় সংসদে পাস হওয়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বেশকিছু মৌলিক ত্রুটির কথা উল্লেখ করেন; যেমনÑ ১. ডিজিটাল যন্ত্রের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটন প্রতিহত করা এবং ডিজিটাল অঙ্গনে নিরাপত্তা বিধানের ল্েয একটি আইন প্রণয়নের চেষ্টা করতে গিয়ে এমন একটি আইন করা হয়েছে, যা সংবাদমাধ্যমের কর্মকা-ের ওপর নজরদারি, বিষয়বস্তুর ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং আমাদের সংবিধান প্রদত্ত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং নাগরিকদের বাক ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণের সুযোগ সৃষ্টি করবে। ২. এই আইন পুলিশকে বাসাবাড়িতে প্রবেশ, অফিসে তল্লাশি, লোকজনের দেহতল্লাশি এবং কম্পিউটার, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক, সার্ভার ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংক্রান্ত সবকিছু জব্দ করার সীমাহীন মতা দিয়েছে। পুলিশ এ আইনে দেয়া মতাবলে পরোয়ানা ছাড়াই সন্দেহবশত যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করতে পারবে। এেেত্র পুলিশের কোনো কর্তৃপরে কোনো ধরনের অনুমোদন নেয়ার প্রয়োজন নেই। ৩. ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এমন এক আতঙ্ক ও ভীতির পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে সাংবাদিকতা, বিশেষত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কার্যত অসম্ভব হয়ে পড়বে।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন (আইসিটি অ্যাক্ট) প্রণীত হওয়ার সময় সরকার বলেছিল, সাংবাদিকদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই; কারণ আইনটি করা হয়েছে সাইবার অপরাধ ঠেকানো ও সাইবার অপরাধীদের শাস্তি দেয়ার ল্েয। বাস্তবতা হলো সাংবাদিকসহ অন্য যারা স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার চর্চা করতে গেছেন, তারা তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি আইনের ৫৭ ধারায় কারাভোগ করেছেন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। আশঙ্কা করা হচ্ছে, এ আইনেও সাংবাদিকরা একই ধরনের হয়রানির মুখোমুখি হতে পারেন।
সম্পাদক পরিষদের এমন বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয় উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় তার নিজস্ব ফেসবুক একাউন্টে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু ধারার সমালোচনার ব্যাপারে তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি সেখানে বলেন, যে সব সাংবাদিক ও সম্পাদকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮ নিয়ে তাদের ভয়ের কিছু নেই। কারণ আইনটি জনগণের তথ্য ও গোপনীয়তা সুরার জন্য প্রণীত হয়েছে।
সজীব ওয়াজেদ জয় আইনটির সমালোচনার জবাবে বলেন, সরকারি অফিসের কম্পিউটারে হ্যাকিং এবং গোপনে নজরদারি রোধ করার েেত্র আইনের দরকার জনগণের তথ্য ও গোপনীয়তা রার স্বার্থেই। এই আইনের আগে হ্যাকিং ও তথ্য চুরির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কোনো আইনি ভিত্তি দেশে ছিল না। তাই হ্যাকিং ঠেকানোর জন্য তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা হিসেবে আমি এই আইন প্রণয়নের সুপারিশ করি।
আইসিটি উপদেষ্টা বলেন, শুধু তাই নয়, সরকারি অফিসে ডিজিটাল নজরদারির মাধ্যমে জনগণের তথ্যসংবলিত বিভিন্ন দলিল বা নথির ছবি বা ভিডিও তোলাও সম্ভব। গোপনে অডিও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমেও নাগরিকদের অনেক সংবেদনশীল তথ্যের আলোচনা শুনে ফেলা সম্ভব, এমনকি ওয়াই-ফাই পাসওয়ার্ডও। এ আইনের মাধ্যমে হয়ত একজন সাংবাদিকের কাজ কঠিন হয়ে যেতে পারে। কিন্তু কারো দুর্নীতি ফাঁস করার জন্য একজন সাংবাদিকের কি সরকারি অফিসের কম্পিউটার হ্যাক করে নাগরিকদের সংবেদনশীল তথ্য চুরির অধিকার থাকা উচিত? পৃথিবীর কোনো দেশই কিন্তু বেআইনিভাবে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহ করার সুযোগ দেয় না। সরকারি অফিসে গোপনে নজরদারি করা সবার জন্য সবদেশেই আইনবহির্ভূত, সাংবাদিকদের জন্যও।
জয় বলেন, আমরা দেখেছি কিভাবে ১৫ আগস্ট ১৯৭৫ এর পর বিএনপি-জামায়াত আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবনের ঘটনাবলিকে বিকৃত করার অপপ্রয়াস চালিয়েছে।
জয় বলেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইনের ওপর ভিত্তি করেই এই ধারাটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৬টি ইউরোপিয়ান দেশে হলোকাস্টের ‘স্বীকৃত সংখ্যা’ থেকে কম মানুষ মারা গিয়েছে এই কথা বললেও কারাদ- দেয়া হয়। এর মধ্যে অনেক দেশ আছে যাদের দূতাবাসগুলো বাংলাদেশে আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছে। যেসব ইউরোপীয় দূতাবাস আমাদের এই আইন নিয়ে আপত্তি তুলেছেন, তাদের প্রতি আমার প্রশ্নÑ আপনাদের হলোকাস্ট ডিনায়াল আইন থাকতে পারলে আমাদেরও কেন একই রকম আইন থাকতে পারবে না?
তিনি বলেন, এই আইনের কিছু অংশ অনলাইনে মিথ্যা বা গুজবের মাধ্যমে সহিংসতা বা ধর্মীয় উন্মাদনা উস্কে দেয়ার বিরুদ্ধে। এই আইন ছাড়া আমরা এই ধরনের সহিংসতা উস্কে দেয়ার ঘটনাগুলো কিভাবে প্রতিহত করবো?
সজীব ওয়াজেদ বলেন, যেহেতু গণমাধ্যমের সম্পাদকেরা তাদের নিজেদের তৈরি নৈতিক নির্দেশনাই মানতে রাজি নন, তাহলে আমরা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণের ভার আদালতের হাতেই তুলে দিই। যেসব সাংবাদিকের মিথ্যা সংবাদ ছাপানোর উদ্দেশ্য নেই, এক্ষেত্রে তাদের ভয়েরও কিছু নেই।
সজীব ওয়াজেদ জয় বলেন, সম্পাদক পরিষদ যদি এসব ধারার সংশোধন চান, তাহলে তাদের নিজেদের নৈতিকতার নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে হবে। যে সম্পাদক বা সংবাদকর্মী মিথ্যা সংবাদ ছেপেছেন, তাকে অবশ্যই দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দিতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে আর কোনোদিন সংবাদ তৈরি বা প্রচারের কাজ করতে না পারেন সেই ব্যবস্থা করতে হবে।