প্রতিবেদন

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : দেশের জনগণের শক্তির ওপর ভর করে আবারও ক্ষমতায় আসতে চায় আওয়ামী লীগ

বিশেষ প্রতিবেদক : নতুন নতুন নজির গড়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার সবসময়ই কয়েক ধাপ এগিয়ে। যেমন পর পর দু’ মেয়াদে নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করার পর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে যে ক’বার শেখ হাসিনা বিদেশ সফরে গেছেন, দেশে ফেরার দু’দিনের মধ্যে তা নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে সরকারের অর্জন জনগণকে অবহিত করেছেন তিনি। বিদেশ সফর থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলন করার বিষয়টি অনেকটাই প্রথায় রূপান্তর করে ফেলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৩তম অধিবেশনে অংশগ্রহণ শেষে দেশে ফিরে গত ৪ অক্টোবর গণভবনে সংবাদ সম্মেলনেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছিলেন বরাবরের মতোই খোশমেজাজে। ফলে জাতিসংঘে তার সরকারের অর্জন বিষয়ে বক্তব্য রাখার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে রাজনৈতিক নানা ইস্যুতেও খোলামেলা মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার রাজনীতি দেশ ও জনগণের জন্য। জনগণই আমার শক্তি। দেশের জনগণের ভোটের শক্তির ওপর আমার বিশ্বাস আছে। কে সমর্থন করলো কী করলো নাÑ কিংবা বাইরের দিকে মুখাপেী হয়ে আমি রাজনীতি করি না।
এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বনেতারা আবারও আমাকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান। তাই হয়ত আগামী নির্বাচন নিয়ে বিশ্বনেতাদের কোনো পরামর্শ বা আন্তর্জাতিক চাপ নেই।
শেখ হাসিনা জানান, জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগদানের সময় বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের সঙ্গে সাাৎকালে তারা আবারও তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চাওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, আগামীতেও যেন আমাদের সঙ্গে দেখা হয়। আমি যেন পুনরায় মতায় আসি। তখন আমি তাদের বলে আসিনি, আপনারা একটু আসেন আমাকে মতায় বসিয়ে দিয়ে যান। আমি তাদের জবাব একটাই দিয়েছি, দেশের মানুষ যদি ভোট দেয় তবে আছি, না দিলে নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বনেতাদের জানিয়েছি আমাদের দেশে স্বচ্ছ ব্যালট বক্স, ছবিসহ ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনি পরিবেশের যতটুকু উন্নয়ন হয়েছেÑ সেটা আমরাই করেছি। আমাদের সরকারের আমলে উপনির্বাচন থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ের ৬ হাজারেরও বেশি নির্বাচন হয়েছে। আমরা তো সেখানে হস্তপে করিনি। আমাদের ওপর মানুষের আস্থা-বিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে। আমরা দেশের উন্নয়ন করি মনের টানে, নিজেদের স্বার্থে রাজনীতি করি না। জনগণের স্বার্থে, তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য আমরা রাজনীতি করি।
উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে মানুষ নৌকায় ভোট দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, একমাত্র নৌকা মতায় থাকলেই দেশের উন্নয়ন হয়। দেশ সবদিক দিয়ে এগিয়ে যায়। এটা দেশের মানুষ উপলব্ধি করতে সম হয়েছে।
তিনি বলেন, আমার জোর হচ্ছে আমার দেশের জনগণ। আর সঠিক সময়েই আগামী একাদশ জাতীয় নির্বাচন হবে। আমার প্রত্যাশা সব দলই নির্বাচনে আসবে। তবে অসংখ্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে কোনো দল যদি নির্বাচনে না আসে, সেটি তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার। এেেত্র আমাদের কিছু করণীয় থাকবে না।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ক এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের ব্যাপারে মিয়ানমার কথায় বলে ‘হ্যাঁ’, কাজের বেলায় ‘না’। তাদের এমন নীতির কারণে প্রত্যাবাসন বিলম্বিত হচ্ছে। নির্বাচনকালীন সরকার গঠন প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, রাষ্ট্রপতির সঙ্গে আলোচনা করে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, নোংরামি বন্ধ করতে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করা হয়েছে। এ নিয়ে গণমাধ্যম কর্মীদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই। এই আইন নিয়ে ভয় তাদেরই আছে যাদের অপরাধী মন। কারও যদি অপরাধী মন না থাকে বা ভবিষ্যতে কিছু অপরাধ করবে এরকম পরিকল্পনা না থাকে; তাহলে তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কোনো কারণ নেই।
শেখ হাসিনা বলেন, আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার এবং দলের নেতা-মন্ত্রীদের নামে মিথ্যা সংবাদের ফাইল প্রস্তুত করে রেখেছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরই সরকারকে হেয় করার চেষ্টা যারা করবেনÑ তারাই এই আইন নিয়ে উদ্বিগ্ন। যারা ন্যায় ও সত্যের পথে রয়েছেন তাদের উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই। অন্তত আমি যতদিন মতায় আছি সাংবাদিকদের কোনো ভয় বা উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু নেই।
ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন নিয়ে দু’জন সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের প্রতি পাল্টা প্রশ্ন রেখে বলেন, সাংবাদিকরা খুব উদ্বিগ্ন, আমি বুঝলাম। কিন্তু আমাদের উদ্বেগটা দেখবে কে বা যারা ভিকটিমাইজ হচ্ছে, তাদের উদ্বেগটা কে দেখবে?
শেখ হাসিনা বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে একটা জিনিসের ঘাটতি আছে। একটা জিনিস ওখানে ঢোকানো উচিত বলে আমি মনে করি। সেটা হলো যদি কেউ কারো বিরুদ্ধে কোনো মিথ্যা তথ্য দেয়, তাহলে সেই মিথ্যা তথ্যটা তাকে প্রমাণ করতে হবে যেÑ এটা সত্য। যদি সে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়, যে সাংবাদিক লিখবে বা যে পত্রিকা বা মিডিয়ায় তা প্রকাশ করবে তাদের সবাইকে শাস্তি পেতে হবে। যার বিরুদ্ধে লিখবে, তার যে তিপূরণ হবে সেটা দিতে হবে। ইংল্যান্ডের মতো আধুনিক সভ্য গণতান্ত্রিক দেশেও এটা আছে।
সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার সাম্প্রতিক ভূমিকা নিয়ে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, আইন তার নিজস্ব গতিতেই চলবে।
আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন না দিতে ভারতীয় সরকারের কাছে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার অনুরোধ জানানোর বিষয়টি তুলে ধরলে জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশে প্রথম আমরা একজন সংখ্যালঘু প্রধান বিচারপতি বানিয়েছিলাম। তিনি সেই পদটাকে সেভাবে সম্মানজনকভাবে ধরে রাখতে পারেননি। এখানে কিন্তু আমাদের কিছু করার ছিল না। এখন যে কথাগুলো উনি (এস কে সিনহা) বলছেন, এখানে আমার কমেন্ট করার কিছু নেই। আমি বিষয়টা অবজার্ভ করছি। আর বই যেটা লিখেছেন, আমার কোনো আপত্তি নেই। পড়ে দেখেন কী লিখেছে। তবে মূল কথা হচ্ছে আমরা কারো মুখাপেী হয়ে রাজনীতি করি না। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে উনি অনুরোধ করেছেন, আমাকে সমর্থন না দিতে! তিনি কেন সবাই অর্থাৎ বিএনপি যাচ্ছে, গিয়ে তো অনুরোধ করে আসছে! এখন কে সমর্থন করবে, আর কে সমর্থন করবে না বা বাইরের দিকে মুখাপেী হয়ে আমরা রাজনীতি করি না। জনগণ আমাকে ভোট দেবে কি না সেটাই আমার কাছে বিবেচ্য বিষয়।
আগামী নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে অপর এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সঠিক সময়ে নির্বাচন হবে এবং দেশের মানুষও ভোট দেবে। নির্বাচনে কোন দল আসবে আর কোন দল আসবে নাÑ নির্বাচনে আসা বা না আসা সেই দলটির সিদ্ধান্তের ব্যাপার। সেই সিদ্ধান্ত তো আমরা নিতে পারি না। তবে আমাদের আশা, সব দলই নির্বাচনে আসবে।
টানা দুই মেয়াদে সরকারের গৃহীত পদেেপর ফলে সরকারের সাফল্য ও অর্জনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে শেখ হাসিনা আরও বলেন, অন্যায়টা কি আমরা করেছি? আমাদেরকে এখনই রিজাইন দিতে হবে? উৎখাত করতে হবে বা এই সরকারকে ফেলে দিতে হবে বা সরকারের বদনাম করতে হবে?
দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি সাবধানবাণী উচ্চারণ করে শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের চিন্তা কিন্তু মানুষকে নিয়ে। আর কিছু না। ষড়যন্ত্রটা থাকবে, আছে। যাদের মতায় আসার সামর্থ্য নেই, তারাই ষড়যন্ত্র করছে। আমি জানি সেটা। তবে এটা নিয়ে পরোয়া করি না। তবে নেতাকর্মীদের একটু সজাগ করে দিতে চাই, তাদের অনেকেই ভাবছে ১০ বছর মতায় আছি। এত ভালো কাজ করছি। কাজেই আমরা তো এমনিই চলে আসবো মতায়। কিন্তু বাংলাদেশ তো সে রকম জায়গা না।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, একটা জোট হচ্ছে আমি খুব খুশি। তাদের জোট করার জন্য যদি সহযোগিতা লাগে তবে আমি তা করবো। কারণ আমরা জানি বাংলাদেশে ভোট আছে দুই প।ে একটি হচ্ছে আওয়ামী লীগ আরেকটি হচ্ছে অ্যান্টি আওয়ামী লীগ। এখন অ্যান্টি আওয়ামী লীগ ভোটগুলোকে তো একটি জায়গায় যেতে হবে। তাদের জন্য একটি জোট হচ্ছে এবং সেখানে বড় বড় মানুষও আছে। জোট হওয়া তো ভালো। আমার কথা হচ্ছে, শত ফুল ফুটতে দিন। আর জোট গঠন নির্বাচনের জন্য ভালো। তবে শেষ পর্যন্ত তারা নির্বাচনে আসবে কি না বা আসার সামর্থ্য তাদের আছে কি না বা সেই সাহস আছে কি নাÑ সেটিও কিন্তু একটি প্রশ্ন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মানুষের কাছে উন্নয়ন যাতে দৃশ্যমান হয় সেজন্য আমার ইচ্ছা ছিল পরপর দুই টার্ম মতায় থাকি। আমরা তা পেরেছি। এখন আমার কাছে মতা ‘থাকে লক্ষ্মী, যায় বালাই’। আমার কোনো চিন্তা নেই। ২০ দলীয় জোটের সম্প্রসারণ নিয়ে আমার কোনো ভয় নেই। কিন্তু মানুষ পোড়ানো খেলোয়াড়দের জন্য এত মায়াকান্না কেন?
শেখ হাসিনা বলেন, শয়তানের সঙ্গে যারা (বিএনপি) জোট করতে চায়, তারা নিজেরা কি তা সবাই জানে। এদেশের মানুষ শয়তানদের কখনো ভোট দেবে না। শয়তানদের আর মতায় দেখতে চায় না।
আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইভিএমের ব্যবহার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি কিন্তু ইভিএমের প।ে আজ পর্যন্ত নির্বাচন ব্যবস্থার যতটুকু পরিবর্তন বা আধুনিকায়ন, তা কিন্তু আমরা করেছি।
কেবল ইভিএম নয়, ভোট দেয়ার জন্য আরও আধুনিক ব্যবস্থা তৈরির পে মত দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, বরং এমন একটা ব্যবস্থা তৈরি করা উচিত যে মোবাইল থেকেও যেন আপনারা ভোট দিতে পারেন। কষ্ট করে আর ভোটকেন্দ্রে যাওয়া লাগবে না। জনগণের ভোটের অধিকার সুরতি করা আমাদের দায়িত্ব। আর সেটা মনে করেই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।
কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপন জারির বিরোধিতা করে আন্দোলন চলার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোটা থাকলেই শুধু আন্দোলন। তাই কোটার দরকার নেই। কোটা না থাকলে আন্দোলন নেই, সংস্কারও নেই। যদি কেউ কোটা চায়, তা হলে এখন কোটা চাই বলে আন্দোলন করতে হবে। সেই আন্দোলন যদি ভালোভাবে করতে পারে, তখন ভেবেচিন্তে দেখা হবে কী করা যায়? আন্দোলন ছাড়া কোটা দেয়া হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন দলের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী।