কলাম

দুর্নীতির বরপুত্র যখন দেশনায়ক!

আবদুল্লাহ হারুন জুয়েল : আমরা সকাল-সন্ধ্যা রাজনীতিবিদদের নিয়ে নিন্দায় মুখর থাকলেও এই আমরাই আবার রাজনীতিবিদদের নিষ্পাপ সনদ দিয়ে থাকি। আমাদের রাজনৈতিক সমর্থন মোটামুটি তিনটি ভাগে বিভক্ত। একাংশ সবসময় মতাসীনদের প্রতি অসন্তুষ্ট, একাংশ ‘আই হেইট পলিটিক্স’-এ বিশ্বাসী এবং অবশিষ্টাংশ নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থক। এই অবশিষ্টাংশ ‘সব দল সমান’, ‘কেউ ভালো নয়’Ñ এ জাতীয় নিরপে মন্তব্য করলেও চূড়ান্তভাবে কোনো দলের পইে অবস্থান নেন। ফলে দলীয় কোনো নেতার বিরুদ্ধে যত অভিযোগই থাক না কেন, সমর্থকদের কাছে ব্যাখ্যা দাঁড়ায়Ñ জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে কিংবা স্বার্থান্বেষী মহলের ইন্ধনে নিষ্পাপ-নিরপরাধ নেতাকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তাই সার্বিকভাবে দেশের জনগণের উল্লেখযোগ্য একটি অংশকে রাজনীতি সচেতন বলা গেলেও তাদেরকে বোধহয় দেশ সম্পর্কে সচেতন বলা যাবে না।
উপরোক্ত কথাগুলো বলার উপল্য বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দেশের অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিও তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোকে ঢালাওভাবে রাজনৈতিক বলে চিহ্নিত করার প্রয়াস চালান। অবশ্য কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকেই কেউ কেউ রাজনৈতিক বলে অভিহিত করেছিলেন, সেখানে তারেক রহমানের বিচারকে রাজনৈতিক বলায় আশ্চর্যের কিছু নেই। কিন্তু বার বার যে প্রশ্নটি জাগে তা হচ্ছে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যতগুলো অভিযোগ রয়েছে তার কতটি অভিযোগ, কতটি প্রমাণ উপো করা সম্ভব? জানতে ইচ্ছে করে, বিএনপির কোনো নেতা বা সমর্থক কি হলফ করে বলতে পারবেন তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগই মিথ্যা? আর অভিযোগ মিথ্যা না হলে তারেক রহমান কি আইনের ঊর্ধ্বে? তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির যে সকল অভিযোগ রয়েছে তার গতি-প্রকৃতি সম্পর্কে দেশের জনগণের, বিশেষত নতুন প্রজন্মের জানা একান্ত প্রয়োজন। জিয়ার ভাঙা ব্রিফকেস ও সততার গল্প বলে যে ভাবমূর্তি তুলে ধরা হয় তার প্রকৃত চিত্র অবশ্যই জানা উচিত। দেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের জন্য হলেও এ প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

অনিয়ম দিয়ে ব্যবসার শুরু
তারেক রহমানের ব্যবসায়িক জীবনের শুরু ১৯৯১ সালে। এরশাদ প্রদত্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা ছাড়া আয়ের বৈধ কোনো উৎস জানা না গেলেও বিএনপি মতায় আসার পর তারেক রহমান প্রথম আয়কর রিটার্ন দাখিল করেছিলেন নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে। অজ্ঞাত ১২ জন ব্যক্তির কাছ থেকে প্রাপ্ত টাকাকে উৎস হিসেবে দেখিয়ে পূর্ববর্তী দু’টি অর্থ বছরের (১৯৮৯-৯০) আয়কর রিটার্ন দাখিল করে ৪৩ ল টাকা হোয়াইট মানি হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৩ পর্যন্ত নৌ পরিবহনের দু’টি ব্যবসা ছাড়াও আরও অন্তত ছয়টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলেন, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব ছিল না। তবে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে আয় দেখানো হয়। এই আয়ের উৎস কী তা বলার অপো রাখে না। তারেক রহমানের ব্যবসার অংশীদার ছিলেন গিয়াসউদ্দিন আল মামুন। ১৯৯৪ সালে মামুনের ছদ্মনামে তারেক শিল্প ঋণ সংস্থার প্রতিষ্ঠিত ১৬ কোটি টাকা মূল্য নির্ধারণ করা তাজ ডিস্টিলারিজ ক্রয় করেন নামমাত্র মূল্যে। এভাবে শুরু হয় তারেক রহমানের ব্যবসায়িক জীবন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ মতায় আসার পর হঠাৎ করে এত টাকার মালিক হওয়ার কারণে তারেক রহমানকে কোনো আইনি জটিলতায় পড়তে হয়নি। রাজনৈতিকভাবে হয়রানি যদি উদ্দেশ্য হতো তাহলে সে সময়েই তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হতো।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ
অনিয়ম ও সুনির্দিষ্ট উৎস বহির্ভূত আয় থাকলেও ২০০১ সাল পর্যন্ত তারেক রহমানের ব্যবসায়িক কার্যক্রম একটি নির্দিষ্ট সীমায় সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০১-এর নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারের একক কর্তৃত্বের অধিকারী হয়ে ওঠেন তারেক রহমান। মতার কেন্দ্রবিন্দু হয় হাওয়া ভবন। তারেক, মামুন, খালেদা জিয়ার ভাই সাঈদ ইস্কান্দার ও শামীম ইস্কান্দারকে নিয়ে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের কাছে যেনতেনভাবে টাকা উপার্জনই হয়ে ওঠে মুখ্য। রহমান শিপার্স থেকে ক্রমে প্রতিষ্ঠা হতে থাকে রহমান গ্রুপ, ওয়ান গ্রুপ, রহমান নেভিগেশন, চ্যানেল ওয়ান, ডান্ডি ডায়িং, খাম্বা লিমিটেড, এডভান্স এড, আরকে গ্রুপ, টিএম এন্টারপ্রাইজ, ইউনিটেক্স এ্যাপারেলস, ক্রিমেন্টাইন লিমিটেড, ক্রোনোটেক্স লিমিটেড, তুরাগ ফিশারিজ, তাজ ডিস্টিলারিজ, দৈনিক দিনকালসহ নানা প্রতিষ্ঠান।
জিয়া পরিবার কতটি খাত থেকে মোট কত টাকা গ্রহণ করেছিল এবং কোথায় সম্পদ গড়েছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়ার উপায় নেই। উদাহরণস্বরূপ তাজ ডিস্টিলারিজ ক্রয় করা হয়েছিল আবদুল্লাহ আল মামুন নামে। এতে তৎকালীন সময়ের হিসাবে সরকারের তি হয় অন্তত ১১ কোটি টাকা। প্রতিষ্ঠা করা প্রতিটি কোম্পানির বিপরীতে মতার অপব্যবহার করে নেয়া হয়েছিল বিপুল অঙ্কের ঋণ। তখন একাউন্ট হোল্ডারদের পরিচয় চিহ্নিত করার েেত্র সীমাবদ্ধতা ছিল। তাই বেনামে যে অর্থ উপার্জন করা হয়েছে তার হিসাব পাওয়া যায়নি। আবার নির্বাচনে মনোনয়ন ও বিভিন্ন লাভজনক পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন হতো, যার হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়। এছাড়া যেসব ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা তোলা হয়েছিল তাদের কেউই মুখ খোলেননি। জানা যায়, হাওয়া ভবনের একজন কর্মচারীও ওই সময়ে কোটিপতি বনে গিয়েছিল। অতএব তারেক রহমানের দুর্নীতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া কঠিন। কিন্তু তারপরও আর্থিক যেসব তথ্য প্রমাণ ও পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তাতে উপলব্ধি করা যায় কেন বাংলাদেশ পর পর পাঁচ বার দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

তারেক রহমানের বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলা
দুর্নীতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজি সংশ্লিষ্টতার কারণে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ উঠেছিল তার কেবল একটি খ-িত অংশই বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে জানা যায়। ২০০৭ সালে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে শতাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলাসহ তারেক রহমানের বিরুদ্ধে মাত্র আটটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে যে সকল মামলা হয়েছিল তার কয়েকটি উল্লেখ করা যেতে পারে :
১. জ্ঞাত উৎসবহির্ভূত আয় ২ কোটি ৭৪ লাখ ৯৩ হাজার ৮৭ টাকার তথ্য গোপন। কাফরুল থানা মামলা নং ৫২, তারিখ : ২৬.০৯.২০০৭।
২. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের নামে ৩ কোটি ১৫ ল টাকার বেআইনি লেনদেনের ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের নামে ২ কোটি ১০ ল টাকার অর্থ আত্মসাৎ। (রমনা থানা মামলা নং ৮, তারিখ : ০৩.০৭.২০০৮)
৩. অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে, তথ্য গোপন করে ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে রহমান শিপার্স লিমিটেডের নামে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংক থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণ গ্রহণ ও সুদ মওকুফ সুবিধা গ্রহণ।
৪. ২০০৫-০৬ করবর্ষে ২৬ ল ৮৬ হাজার টাকা কর ফাঁকি। (বিশেষ আদালত, মামলা নং ১৮/০৮)
৫. আমিন কনস্ট্রাকশন থেকে জোরপূর্বক ১ কোটি টাকা চাঁদা আদায়। (মামলা নং ৩৪, তারিখ : ০৮.০৩.২০০৭)
৬. মার্শাল ডিস্টিলারিজের মালিক হারুন ফেরদৌসের কাছ থেকে হুমকি দিয়ে ৪৬ লাখ টাকা আদায়। (মামলা নং ১০২, তারিখ : ২৬.০৩.২০০৭)
৭. প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে রেজা কনস্ট্রাকশন থেকে ১ কোটি ৩২ ল টাকা এবং পরবর্তিতে আরও ১৬ ল টাকা চাঁদা আদায় ( মামলা নং ১০৩, তারিখ : ২৭.০৩.২০০৭)
৮. মীর আখতার হুসাইন লি. থেকে জোরপূর্বক ৫৩ ল টাকা চাঁদা আদায় (ধানমন্ডি থানা মামলা নং ০২, তারিখ : ০১.০৪.২০০৭)
৯. আবদুল মোনেম লি. থেকে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়ে ১০ কোটি ৩১ ল টাকা চাঁদা আদায় (শাহবাগ থানা, মামলা নং ১৪, তারিখ : ০৯.০৪.২০০৭)
১০. এসিএল-আরসিএল প্রোজেক্ট থেকে ৪ কোটি ৮৯ ল টাকা চাঁদা আদায় (গুলশান থানা, মামলা নং ১৩, তারিখ: ০৪.০৫.২০০৭)
১১. নির্মাণ ইন্টারন্যাশনালের মালিক খাদিজা ইসলাম থেকে ৫ কোটি টাকা ঘুষ আদায় (গুলশান থানা, মামলা নং ১০১, তারিখ : ০৪.০৫.২০০৭)
১২. সিমেন্স ও টেলিটক থেকে কয়েকশ’ কোটি টাকার ঘুষ গ্রহণ।
১৩. তাজ ডিস্টিলারিজকে লোকসানি কোম্পানি দেখিয়ে ৫ কোটি টাকা নামমাত্র মূল্যে ক্রয়।
১৪. ডান্ডি ডাইং-এর নামে ভুয়া সিকিউরিটি দাখিল করে ঋণ গ্রহণ।
১৫. ইউনিটেক্সের নামে অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ঋণ গ্রহণ।
১৬. রহমান শিপার্স লিমিটেড, রহমান নেভিগেশন লি. ও দৈনিক দিনকাল-এর বিরুদ্ধে ২০০১-০৬ অর্থবছরে বড় অঙ্কের কর ফাঁকি।
১৭. ২ কোটি টাকা ব্যয়ে সিঙ্গাপুর থেকে ৩০০টি মাল্টিমিডিয়া সেট আমদানিতে অনিয়ম।

বিদেশে অর্থ পাচার
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত রাষ্ট্রের এমন কোনো খাত ছিল না যেখানে তারেক রহমান হস্তপে করেননি। হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক ছায়া সরকার ছিল রাষ্ট্রের পাওয়ার হাউজ, আর সেখান থেকে সবকিছুর বিকিকিনি চলেছে টাকার হিসাবে। স্ত্রী, কন্যা, শ্বাশুড়ি এবং বন্ধুদের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ার পর অবৈধ উপায়ে অর্জিত হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের তথ্য আড়াল করে শুরু হয় অর্থ পাচার ও বিদেশে সম্পদ ক্রয়ের পালা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০০২ সাল থেকে তারেক রহমানের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ শুরু হয়। ৪ বছরে তার অন্তত ৩১ বার বিদেশ যাওয়ার তথ্য রয়েছে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, দুবাই, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণের উদ্দেশ্য ছিল মূলত অর্থ পাচার। জিয়া পরিবার অর্থ পাচার ও পাচারকৃত অর্থ বিনিয়োগের জন্য সিঙ্গাপুরে দু’টি কনসোর্টিয়াম গঠন করেছিল। একটি থাইল্যান্ডকেন্দ্রিক তারেক রহমানের মালিকানাধীন কনসোর্টিয়াম যার অন্যতম সদস্য ছিলেন থাইল্যান্ডের সাবেক প্রধানমন্ত্রী থাকসিন সিনাওয়াত্রা। এ পরিবারের অপর কনসোর্টিয়ামের নাম তঅঝত (জাফিয়া, আরাফাত, শর্মিলা, জাহিয়ার নামানুসারে) কনসোর্টিয়াম। আরাফাত রহমান কোকোর মালিকানাধীন এ কনসোর্টিয়াম ২৪টি কোম্পানির সমন্বয়ে গঠিত হয়েছিল, যার একটি দাউদ ইব্রাহিমের ডি কোম্পানি। এই অর্থ পাচার এতটাই সন্দেহজনক ছিল যে যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং পর্যবেক সংস্থা ও গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যের ভিত্তিতে তারেক রহমানের যুক্তরাষ্ট্র প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে মার্কিন প্রশাসন।

তারেকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক তদন্ত
দেশের গন্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলেও তারেক রহমানের দুর্নীতি আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। বিভিন্ন অভিযোগ ও স্যাপ্রমাণের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ২০০৯ সালের ৮ জানুয়ারি তারেক রহমান ও তার ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর ৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজেয়াপ্ত করেছিল, যা সিমেন্স এবং চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাছ থেকে ঘুষ হিসেবে নেয়া হয়েছিল। (মার্কিন জাস্টিস ডিপার্টমেন্টের মামলা নম্বর ১:০৯৯-ঈঠ-০০০২১(ঔউই)। এফবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে যে, তারেক রহমান ও গিয়াসউদ্দিন আল-মামুন তাদের সিঙ্গাপুরের একটি ব্যাংক একাউন্টে নির্মাণ কনস্ট্রাকশন লিমিটেডের পরিচালক এবং চীনের হারবিন ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশনের এদেশীয় এজেন্ট খাদিজা ইসলামের কাছ থেকে সাড়ে ৭ লাখ মার্কিন ডলার ঘুষ নিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ডিপার্টমেন্ট অব জাস্টিস-এর মাধ্যমে তারেক রহমানের ১২ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনা সম্ভব হয়েছিল। এছাড়া বাংলাদেশের আদালতের রায়ের পরিপ্রেেিত ২০১৩ সালে সিঙ্গাপুরের সিটিএনএ ব্যাংকে পাচারকৃত ২১ কোটি টাকার মধ্যে ৮ কোটি টাকা দেশে ফেরত আনা হয়। একইভাবে লন্ডনের ঘধঃ ডবংঃ ব্যাংকে প্রায় ৬ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তারেক রহমানের সম্পদ
বেলজিয়ামে তারেক রহমানের সম্পত্তির পরিমাণ ৭৫০ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়ায় ২৫০ মিলিয়ন ডলার এবং দুবাইতে রয়েছে কয়েক মিলিয়ন ডলার মূল্যের বাড়ি (বাড়ির ঠিকানা: স্প্রিং ১৪, ভিলা: ১২, এমিরেটস হিলস, দুবাই)। সৌদি আরবে মার্কেটসহ অন্যান্য সম্পত্তির কিছু বিবরণ পাওয়া যায় প্যারাডাইস পেপারসে। প্যারাডাইস পেপারের সূত্রে জানা যায়, তারেক জিয়া ২০০৪-০৫ সালে কেইম্যান আইসল্যান্ড এবং বারমুডায় ২ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেন। এছাড়াও তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল-মামুনের ওয়ান গ্রুপের তিনটি কোম্পানি খোলা হয় ট্যাক্স হেভেন সুবিধায়। আরাফাত রহমান কোকো বারমুডার বিভিন্ন কোম্পানিতে ২০০৫ সালে প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন। কোকোর মৃত্যুর পর এই বিনিয়োগ শর্মিলা রহমানের নামে স্থানান্তরিত হয়। প্যারাডাইস পেপার কেলেঙ্কারিতে তারেক রহমান ছাড়াও তার স্ত্রী জোবায়দা রহমান, বেগম জিয়ার ছোট ভাই শামীম ইস্কান্দার, তাঁর স্ত্রী এবং বেগম জিয়ার প্রয়াত ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের নাম উঠে এসেছে।
তারেক রহমানের বিরুদ্ধে লাগামহীন অনিয়ম, দুর্নীতি, মতার অপব্যবহার, বিদেশে টাকা পাচারসহ অভিযোগের পাহাড় রয়েছে। এখানে আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়মের খ-চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। তুলে ধরা হয়নি জঙ্গিবাদে পৃষ্ঠপোষকতা, দেশকে সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করার অপচেষ্টা, শত শত রাজনৈতিক হত্যাকা-ে মদদ দান, কণ্ঠরোধ ও দলীয় কর্মীদের দ্বারা বিরোধী মত দমনের জন্য নির্লজ্জভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার পরিসংখ্যান। এখানে তুলে ধরা হয়নি ব্যক্তিস্বার্থে দেশের প্রতিটি খাতকে ধ্বংস করে অর্থনৈতিক মেরুদ- ভেঙে দেয়ার বিবরণ। শুধু জিয়া পরিবারের পাঁচ বছরের দুর্নীতির উপাখ্যান লিখলে তা মহাকাব্য হয়ে যাবে। আমাদের সচেতন নাগরিকদের বিবেচনা করা উচিত এতসব তথ্যপ্রমাণ থাকার পরও তারেক রহমানের মতো একজন চিহ্নিত ও প্রমাণিত দুর্নীতিবাজ কিভাবে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তর রাজনৈতিক দলের শীর্ষ পদে আসীন থাকেন! ভেবে দেখা উচিত কোন বিবেচনায় এবং কোন মানসিকতার মানুষদের কাছে তারেক রহমান দেশনায়ক হিসেবে বিবেচিত হন। দুর্নীতির অভিযোগ বিবেচনায় তারেক রহমানের সমতুল্য পৃথিবীতে কোনো নেতা আছেন কি না জানি না! যে পাকিস্তান বাংলাদেশ থেকে অনেক পিছিয়ে সেখানে নওয়াজ শরীফকে প্রধানমন্ত্রী পদে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছিল একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সম্মানী নেয়ার অভিযোগে। এমন দুর্নীতিবাজ পৃথিবীর কোথাও নেতৃত্বে থাকার দৃষ্টান্ত আছে বলে মনে হয় না। বিএনপির সমর্থকরা কি নিজেদেরকে পাকিস্তানিদের চেয়েও নিচু মানসিকতার বলে প্রমাণ করছেন না?
বিবেকের কাছে করা এ প্রশ্নগুলো মোটেও রাজনৈতিক নয়। দেশের অগ্রযাত্রাকে উল্টোপথে ধাবিত করে জনগণের বিশ্বাস ভঙ্গ করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের নায়করা যদি দেশনায়ক বলে গণ্য হয় তাহলে অন্ধকার ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।
লেখক: রাজনৈতিক পর্যবেক ও বিশ্লেষক