ফিচার

শিশুর মোটা হওয়া প্রতিরোধে অভিভাবকদের সচেতনতা জরুরি

স্বদেশ খবর ডেস্ক : শিশুদের, বিশেষত শহরে বেড়ে ওঠা শিশুদের অভিভাবকরা প্রায়ই গর্বভরে বলে থাকেন, আমার বাচ্চা না বাড়ির খাবার একেবারেই পছন্দ করে না! টিফিনে তার চাইÑ চিপস, বার্গার বা পেস্ট্রি।
যে শিশুরা এ ধরনের খাবার খেয়ে অভ্যস্ত, লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি। এরা অল্পতেই হাঁপিয়ে যায়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে তাদের অনেকের মাঝে-মধ্যে দেখা দেয় মাথা ও ঘাড় ব্যথা। শুধু উচ্চ রক্তচাপ নয়, ডায়াবেটিস, লিভারের রোগই নয়Ñ বাইরের খাবার খাওয়া অনেক শিশু হৃদরোগের মতো গুরুতর সমস্যায়ও ভোগে, যা নিয়ে বাবা-মায়েরা প্রায়ই হন নাজেহাল। শিশু-কিশোরদের অত্যধিক মোটা হওয়ার সমস্যাটির জন্য অবশ্য বাবা-মায়ের ভুলই বেশি দায়ী। ইউনিভার্সিটি অফ নর্থ ক্যারোলিনা (টঘঈ) স্কুল অফ মেডিসিনের গবেষকদের দাবি, ‘শিশুদের সাথে আমরা যা করি তার কারণেই শিশুরা মোটা হচ্ছে’। সাধারণত বাবা-মায়েরা যে ভুলগুলো করে থাকেন তা হলো :

শিশুদের ঘুমের সময় বোতলের
মাধ্যমে খাওয়ানো
গবেষকদের দাবি, প্রায় ৪৩ শতাংশ পিতামাতাই শিশুদের ঘুমের সময় বোতলের মাধ্যমে খাওয়ানোর অভ্যাস করেন। এর ফলে শিশুর প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাওয়া হয় এবং দাঁতে ছিদ্র হওয়া বা কানের ইনফেকশন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে শিশু।

চার মাস বয়সের আগেই শক্ত খাবার দেয়া
অনেকেই মনে করেন যে, শিশুকে সিরিয়াল খাওয়ালে তাদের ঘুম ভালো হবে। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশুকে ৪ মাস বয়সের আগেই শক্ত খাবার দেয়া হয় তাদের ৩ বছর বয়সের মধ্যেই মোটা হওয়ার সম্ভাবনা ৬ গুণ বৃদ্ধি পায়। জন্মানোর পরে যত তাড়াতাড়ি শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করা হয় তা তাদের জীবনের পরবর্তী ২০ বছর ধরে ওজন বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করে। প্রায় ১২ ভাগ পিতামাতাই এই কাজটি করেন বলে টঘঈ-এর গবেষণায় দাবি করা হয়েছে।

মিষ্টি খাবারের লোভ দেখানো
শিশুকে শাকসবজি খাওয়ানোটা বেশ কঠিন কাজ। এজন্য বেশিরভাগ অভিভাবকই যে ভুলটি করে থাকেন তা হলো শিশুকে মিষ্টি খাবার দেয়ার প্রলোভন দেখান। তারা বলেন, ‘তুমি যদি গাজর খাও তাহলে তোমাকে আইসক্রিম দিব’। দুর্ভাগ্যবশত এই কৌশলটির ফলে শিশু গাজর বা অন্য কোনো সবজির তুলনায় পুরস্কারটির প্রতিই আগ্রহী হয়ে ওঠে বেশি। এই আচরণের ফলে মিষ্টিজাতীয় খাবারকেই বেশি মূল্যবান হিসেবে বিবেচনা করতে শেখে শিশু-কিশোররা। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে শিশুকে বিশেষ কোনো খাবার খাওয়ার জন্য পুরস্কৃত করা হলে মূল খাবারের প্রতিই আগ্রহ কমে যায় তার।

বেশি বেশি স্ন্যাক্স খেতে দেয়া
সারাদিনে বাচ্চাদের বেশি বেশি স্ন্যাক্স খেতে দিলে তাদের শরীরে ক্যালরি জমা হতে থাকে। এর ফলে পুষ্টিকর খাবার যেমন শাকসবজি, ফলমূল ইত্যাদি খাবারের প্রতি অনীহা সৃষ্টি হয়। তাই বাচ্চাদের সকাল, দুপুর ও রাতের খাবার সময়মতো খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন এবং মূল খাবার ও স্ন্যাক্সের মধ্যে ২ ঘণ্টার বিরতি যেন থাকে সেভাবেই খেতে দিন। দিনে ২-৩ বারের বেশি স্ন্যাক্স খেতে দেবেন না এবং ১৫০ ক্যালরির মধ্যে তা সীমিত রাখুন।

কোমল পানীয় পান করতে দেয়া
পেডিয়াট্রিক্স জার্নালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানের যুবকরা তাদের দৈনিক ক্যালরির ১০-১৫ ভাগই চিনিযুক্ত কোমল পানীয় (স্পোর্টস ড্রিংক বা ফ্রুট ড্রিংক) থেকে গ্রহণ করে। গত ১০ বছরে শিশুদের মধ্যে এই ধরনের পানীয় গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে তাদের দৈনিক ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ ২৪২ থেকে ২৭০ ক্যালরির বেশি হয়ে যায়। এই ধরনের পানীয়তে চিনির পরিমাণ বেশি থাকে এবং পুষ্টি উপাদান কম থাকে। তাই আপনার সন্তান যেন এই ধরনের পানীয় বেশি বেশি গ্রহণ না করে সেদিকে খেয়াল রাখুন। তাকে পানি, লো ফ্যাট মিল্ক ও ঘরে তৈরি ফলের জুস খেতে উদ্বুদ্ধ করুন।

বাচ্চার দাবির কাছে নতিস্বীকার করা
খাওয়ার সময় আপনার সন্তান যদি পিজা, চিকেন নাগেটস, বার্গার, পাস্তা বা ফ্রাই খেতে চায়Ñ তাহলে এসব অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ানোর আবদার আপনার মেটানো ঠিক হবে না। সকাল, দুপুর ও রাতের প্রধান খাবারগুলো যেন পুষ্টিকর হয়Ñ সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে বাবা-মাকেই। শিশুর পছন্দের দিকেও অবশ্য নজর দিতে হবে। এজন্য ঘরেই তৈরি করে দিতে পারেন তার পছন্দের খাবারটি। এগুলো তৈরিতে ব্যবহার করুন চর্বিহীন মাংস, লো ফ্যাট দুধ, পনির, দই ইত্যাদি।

দেরিতে ঘুমাতে যাওয়া
কম ঘুম যেমন শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য তিকর তেমনি অধিক ঘুমও ভালো নয়। শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত ঘুম প্রয়োজন। আপনার সন্তানকে রাতের বেলায় তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যেতে বলুনÑ যাতে সে সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে পারে। সকালের নাশতা খেতে দেরি হলে তা দিনের অন্যান্য কাজের ওপরও প্রভাব ফেলবে। সকালে স্বাস্থ্যকর খাবার খেলে পেট ভরা থাকে এবং ুধাও কম পায় বলে অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাক্স খাওয়ার আবদার করে শিশু। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ঘুম থেকে জাগার সময়টিও নির্ধারণ করে দিন এবং সে অনুযায়ী তাকে প্রস্তুত করুন।

বাচ্চাদের খেলাধুলার সুযোগ করে না দেয়া
এমনিতেই এখনকার বাচ্চাদের খেলাধুলার সময় কমে আসছে। বাসা থেকে স্কুল যাচ্ছে তা-ও রিকশা বা গাড়িতে চড়েই। তার সাথে যোগ হয়েছে একের পর এক জাংকফুড। তাই বাচ্চাদের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। তবে আপনি যদি উপরের উল্লেখ করা ভুলগুলো এড়িয়ে চলেন আর এর সঙ্গে বাচ্চাকে প্রতিদিন কিছু না কিছু খেলা বা হাঁটার সুযোগ করে দেন, তাহলে আপনার বাচ্চা সুস্থ এবং হাসিখুশি থাকবে।
ধরুন, স্কুলে নিয়ে যাওয়ার পথে গাড়ি বা রিকশা ছেড়ে কিছুটা পথ হেঁটে যান। অথবা দিনের কোনো একসময়ে হয়ত বাসার কাছে ছাদে বা পার্কিং লটে বাচ্চাকে একটু খেলতে দিন। চেষ্টা করুন মাঝে-মধ্যে বাসার কাছে কোনো মাঠ বা পার্কে নিয়ে যেতে। এর ফলে বাচ্চার সঙ্গে আপনারও সময় কাটানো হবে।

শেষ কথা
বাচ্চার স্বাস্থ্য ভালো হলে মা-বাবা এবং নানি-দাদি তো ভীষণ খুশি। কিন্তু মনে রাখবেন, মোটা হয়ে যাওয়া আর স্বাস্থ্য ভালো থাকা এক বিষয় নয়। ছোট বেলা থেকেই বাড়তি ওজন বাচ্চার অ্যাজমা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। এছাড়া মোটা হওয়ার কারণে সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার বিষয় তো আছেই। তাই বাচ্চার ভালোর জন্য ওর বাড়তি ওজন তৈরি হওয়ার কারণগুলো এড়িয়ে চলা নিশ্চিত করতে হবে আপনাকেই।