আন্তর্জাতিক

স্বাধীনতা চেয়ে স্কটল্যান্ডে ব্যাপক বিােভ : আবার ভাঙছে যুক্তরাজ্য!

স্বদেশ খবর ডেস্ক : যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীন হওয়ার দাবিতে আবারও বিােভ দেখিয়েছে হাজার হাজার স্কটিশ। গত ৬ অক্টোবর স্কটল্যান্ডের রাজধানী এডিনবার্গের রাজপথে নেমে আসেন তারা। ব্রেক্সিট নিয়ে জটিলতায় নতুন করে স্বাধীনতার বিষয়টি সামনে এসেছে সেখানে।
স্কটিশ ন্যাশনাল পার্টি এ বিােভের আয়োজন করে। স্বাধীনতাপন্থি এ দলটির দখলে রয়েছে প্রাদেশিক পরিষদের প্রায় অর্ধেক আসন। ২০১৬ সালের ব্রেক্সিট ভোটের সময় ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকার পে রায় দিয়েছিল স্কটল্যান্ডের জনগণ। কিন্তু ব্রিটেন ভোট দেয় বেরিয়ে যাওয়ার প।ে এ নিয়ে এখন জটিলতা চলছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্যে স্কটল্যান্ডের অবস্থান কী হবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।
এর আগে যুক্তরাজ্য হতে স্বাধীনতার প্রশ্নে স্কটল্যান্ডে ২০১৪ সালে গণভোটের আয়োজন করা হয়। এতে স্বাধীনতার বিরোধিতাকারীরা জয় পায়। এ দফা বিােভের সময় ব্রিটেনের পতাকা নিয়ে পাল্টা বিােভ দেখায় তারাও।
এর আগেও কয়েক দফা স্বাধীনতার জন্য বিক্ষোভ-আন্দোলন করলেও স্কটল্যান্ডের স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন বাস্তব হয়নি। স্কটল্যান্ড ইংল্যান্ডের সঙ্গে গ্রেট ব্রিটেনের অংশ হয়ে থাকবে কি না, এ প্রশ্ন স্কটিশদের মনের মধ্যে আবর্তিত হলেও গ্রেট ব্রিটেন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার েেত্র গণতান্ত্রিক পদ্ধতিই বেছে নিয়েছিল স্কটিশরা। ঠিক হয়েছিল গণভোটের মাধ্যমে স্কটিশরা নিজেদের মতামত উপস্থাপন করবেন। গণভোটে ৫৫ ভাগ ভোট দিয়ে গ্রেট ব্রিটেনের অঙ্গরাজ্য হিসেবে থাকার মনোভাব ব্যক্ত করেন ভোটাররা। স্কটল্যান্ড স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতকারীরা ৪৫ ভাগ ভোট পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত বিচ্ছিন্নকরণের প্রশ্ন পরাজিত হয়। ভোটের ফলাফলে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ইংল্যান্ড।
এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, স্কটল্যান্ড প্রাচীনকাল থেকেই শিল্প ও ব্যবসাবাণিজ্যে যথেষ্ট উন্নত। স্কটল্যান্ডের নর্থ সী-তে পেট্রল পাওয়ার পর এখানকার অধিবাসীদের মধ্যে ইংল্যান্ড ও কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি একটা বিরূপতা সৃষ্টি হতে থাকে। এর কারণ নর্থ সী থেকে প্রাপ্ত তেলের বেশিরভাগ অর্থই কেন্দ্রে চলে যেত এবং স্কটল্যান্ডের ভাগ্যে জুটত সামান্য অংশ। এ দিকটি স্কটল্যান্ডের অনেক শহরের দেয়ালে ছোট ছোট পোস্টার দিয়ে প্রতিবাদ জানানো শুরু হয় প্রায় ৪০ বছর আগে থেকে। পোস্টারে লেখা থাকতোÑ ‘নর্থ সী-র তেলে স্কটল্যান্ডের অধিকার, ইংল্যান্ডের নয়’। এ মনোভাব ক্রমে বর্ধিত রূপ নেয়ার কারণে শেষ পর্যন্ত স্কটল্যান্ড গ্রেট ব্রিটেনের অংশ হিসেবে থাকবে কি না, তা দেখার জন্য গণভোটের ব্যবস্থা করা হয়। গণভোটের ফলাফলে দেখা যায়, স্কটল্যান্ডের সার্বভৌমত্বের পে গ্লাসগোসহ আরো কয়েকটি শহর বেশি ভোট দিলেও ‘না’ ভোটের েেত্র এডিনবরাসহ আরো কয়েকটি শহর প্রধান ভূমিকা গ্রহণ করে। এখানে একটা দিক লণীয় যে, গ্লাসগো শুধু স্কটল্যান্ড নয়, ইংল্যান্ডের অনেক বড় শহরের সমক হলেও এডিনবরা সাংস্কৃতিক শহর হিসেবে পরিচিত। এখানে স্কটিশ ছাড়াও ইংল্যান্ড ও অন্য দেশের অনেকে বসবাস করেন। এ কারণেই হয়ত এখানে বসবাসকারী অ-স্কটিশ সবাই না-সূচক ভোট দেন। গ্লাসগো ও এডিনবরা স্কটল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর। স্কটল্যান্ডে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় থাকলেও সবচেয়ে খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হলো এডিনবরা, গ্লাসগো, সেন্ট অ্যানড্রুস ও অ্যাবারডিন। এডিনবরায় প্রতি বছর সামারে আন্তর্জাতিক বিপণন মেলা ও সাংস্কৃতিক মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সাংস্কৃতিক উৎসবে শহরের বিভিন্ন স্থানে নাটক ও সংগীতের আসর বসে। পৃথিবীর বহু দেশ থেকে শিল্পীরা এখানে এসে নাটক ও সংগীত পরিবেশন করেন। এ কারণে এখানকার সামার থাকে বেশ জমজমাট ও বর্ণাঢ্য। এডিনবরায় দু’টো রাজপ্রাসাদ বিখ্যাত, বিশেষভাবে এডিনবরা ক্যাসল। অন্য রাজপ্রাসাদটি এডিনবরা ক্যাসল থেকে বেশ দূরে, শহরের অন্য প্রান্তে। স্কটল্যান্ড বেশি বিখ্যাত পশম শিল্পের জন্য।
আঠার শতকে স্কটল্যান্ড থেকে অনেকেই কানাডা, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় চলে যাওয়ার কারণে মূল স্কটিশদের সংখ্যা খানিকটা কমে যায়। স্কটল্যান্ডের উত্তরে শতভাগ লোক গ্যালিক ভাষা ব্যবহার করেন। এছাড়া, অধিকাংশ অঞ্চলে ইংরেজি ব্যবহৃত হলেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ৭৫ হাজারের বেশি লোক গ্যালিক ভাষা ব্যবহার করেন। স্কটল্যান্ডের ইতিহাস উত্থান-পতনের অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ। ১৭০৭ সালে স্কটল্যান্ড ও ইংল্যান্ড একত্রিত হয় গ্রেট ব্রিটেন নামে। একই পার্লামেন্টে অংশগ্রহণ করলেও স্কটল্যান্ড নিজস্ব আইন (যা রোমান আইন ধরে গড়ে উঠেছে) ও শিার েেত্র স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখে। চার্চ অব স্কটল্যান্ড মূলত প্রেসবিটেরিয়ান হলেও ধর্মের েেত্র স্বাধীনতা বিদ্যমান। জ্যাকোবাইটসরা ১৭১৫ ও ১৭৪৫ সালে স্কটল্যান্ড বিচ্ছিন্নকরণের চেষ্টা করলেও সার্থকতা লাভ করতে পারেননি।
ইংল্যান্ডের কারেন্সি ব্যাংক অব ইংল্যান্ড মুদ্রণ করলেও স্কটল্যান্ডের কারেন্সি মুদ্রিত হয় ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড, রয়েল ব্যাংক অব স্কটল্যান্ড ও কাইডেসডেল ব্যাংকের নামে। অনেকে ধারণা করেছিলেন, ইংল্যান্ড থেকে স্কটল্যান্ড আলাদা হয়ে গেলে কারেন্সি স্টার্লিং থাকবে কি না। প্রকৃতপে আমেরিকার কারেন্সি ডলার হলেও পৃথিবীর অনেক দেশের মুদ্রার নামই ডলার। এেেত্র কোনো অসুবিধা না হলে স্কটল্যান্ডের মুদ্রা স্টার্লিং রাখলে কোনো তি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে না। স্কটিশ মুদ্রা স্কটিশ স্টার্লিং হিসেবেই পরিচিত হতো। শুধু একটা েেত্র বিতর্কের সম্ভাবনা থেকেই যায়। ইংল্যান্ডের পাউন্ড বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল্যমানে দাঁড়িয়ে আছে।
স্কটল্যান্ডের বিচ্ছিন্ন হওয়ার মানসিকতা বর্তমানে গুরুত্বের অধিকারী। এর আগে গত শতাব্দীর ষাটের দশকে ক্যানাডায় (কানাডা নয়) ফরাসি অধ্যুষিত প্রদেশ ক্যুবেক (কুইবেক নয়) ক্যানাডা থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার পথে অগ্রসর হয়েছিল। ফ্রান্সও এ ব্যাপারে তাদের খানিকটা সমর্থন করে। সাবেক ফরাসি প্রেসিডেন্ট দ্য গল এেেত্র মন্তব্যও করেছিলেন। ক্যুবেকের অধিকাংশ অধিবাসীই ফরাসি। ক্যুবেকের রাজধানী মনট্রিয়ালও শিা ও বাণিজ্যের েেত্র সুপরিচিত নগরী। এখানে বিচ্ছিন্নবাদীদের আন্দোলন যখন তুঙ্গে সে সময় ক্যানাডা বাস্তববুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ফরাসি-ভাষী পিয়ের ত্রুদোকে প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত করে। এর ফলে ফরাসিদের বিচ্ছিন্নতাবাদকে বর্জন দিতে হয়।