প্রতিবেদন

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্রিয় তৎপরতায় নির্বিঘেœ সম্পন্ন হলো দুর্গোৎসব

নিজস্ব প্রতিবেদক
দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে বিসর্জনের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজার আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। ১৯ অক্টোবর চোখের জলে মা দুর্গাকে বিদায় জানিয়েছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, অসুর শক্তি বিনাশকারী দেবী বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে সব অপশক্তির বিনাশ হবে, বইবে শান্তির সুবাতাস।
সনাতন ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী, বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দেবী ফিরে যান কৈলাসে স্বামীর ঘরে। এক বছর পর নতুন শরতে আবার তিনি আসবেন পিতৃগৃহ এই ধরণীতে।
১৮ অক্টোবরই শারদীয় দুর্গোৎসবের মহানবমী ও দশমী পূজা সম্পন্ন হয়। তবে বিশুদ্ধ পঞ্জিকা অনুসরণ করে রামকৃষ্ণ মিশনে ১৯ অক্টোবর সকালে দশমী পূজা সমাপন ও দর্পণ বিসর্জন করা হয়। বিষাদের ছায়া ছিল ঢাক-ঢোল, কাঁসার ঘণ্টাসহ বিভিন্ন বাদ্যে, আলোকিত করা ধূপ আরতি ও দেবীর পূজা-অর্চনায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী বিভিন্ন নদী, খাল, বিল, পুকুর এবং জলাশয়ে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়।
গত ৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মাধ্যমে পাঁচ দিনের দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এরপর মহাসপ্তমী, মহাঅষ্টমী ও মহানবমীতে হিন্দু সম্প্রদায়ের হাজার হাজার নারী-পুরুষ ধর্মীয় নানা আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। বিজয়া দশমীর দিনে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে তারা এ আনুষ্ঠানিকতা শেষ করেন।
প্রতিমা বিসর্জনের উদ্দেশ্যে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী মন্দির মেলাঙ্গন থেকে কেন্দ্রীয় বিজয়া শোভাযাত্রা বের হয়। পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির যৌথ উদ্যোগে বের হয় বর্ণাঢ্য এই বিজয়া শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি পলাশী মোড় থেকে নগরীর বিভিন্ন সড়ক হয়ে বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটে গিয়ে পৌঁছে। বেলা আড়াইটায় বুড়িগঙ্গার ওয়াইজঘাটের বিনাস্মৃতি স্নানঘাটে আদি মরণচাঁদ, নবকল্লোল পূজাম-পের প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে রাজধানীতে দেবীকে বিদায় জানানোর আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। এ উপলক্ষে ওয়াইজঘাট এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। যাত্রাপথে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে পুলিশ সংশ্লিষ্ট সড়কগুলোতে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখে।
মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক নারায়ণ সাহা মনি জানান, বিভিন্ন ঘাটে রাজধানীর ২২৫টি পূজাম-পের প্রতিমা একে একে বিসর্জন দেয়া হয়।
বিজয়া শোভাযাত্রা ও প্রতিমা বিসর্জনে অংশ নিতে ১৯ অক্টোবর দুপুর গড়িয়ে যেতেই ভক্তরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার পূজাম-প থেকে ট্রাকে করে প্রতিমা নিয়ে সমবেত হতে শুরু করেন ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির প্রাঙ্গণে। সেখান থেকে সম্মিলিত বাদ্য-বাজনা, মন্ত্রোচ্চারণ ও পূজা-অর্চনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় শোভাযাত্রা। ভক্তরা নেচে-গেয়ে শোভাযাত্রাকে বর্ণিল করে তোলেন। অধিকাংশ পূজাম-পের প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হলেও ঢাকেশ্বরী মন্দিরের প্রতিমাটি রেখে দেয়া হয়। কিন্তু পূজার কাজে ব্যবহৃত দেবীর ফুল, বেলপাতা ও ঘট বিসর্জন দেয়া হয়। রামকৃষ্ণ মিশনে সন্ধ্যা আরতির পর মিশনের পুকুরে প্রতিমা বিসর্জন দেয়া হয়। তারপর ভক্তরা শান্তিজল গ্রহণ করেন।
প্রতিমা ঘাটে নিয়ে আসার পর ভক্তকূল শেষবারের মতো ধুপধুনো নিয়ে আরতিতে মেতে ওঠে। শেষে পুরোহিতের মন্ত্রপাঠের মধ্য দিয়ে দেবীকে নৌকায় তুলে বিসর্জন দেয়া হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার কৃষ্ণপদ রায় সাংবাদিকদের জানান, প্রতিমা বিসর্জন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সব ধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি নৌ-পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরাও দায়িত্ব পালন করেন। তাদের সক্রিয় তৎপরতায় কোনো প্রকার অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ছাড়াই প্রায় এক সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠিত দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণভাবে নির্বিঘেœ সম্পন্ন হয়। এ জন্য হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতি তাদের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
কক্সবাজার ও চট্টগ্রামে প্রতিমা বিসর্জন চলে সাগর সৈকতে। একইভাবে সারাদেশে বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে চলে বিসর্জনের পর্ব। ঢাকা মহানগর সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির প্রতিনিধিরা জানান, মূলত দর্পণ বিসর্জনের মাধ্যমে আগের দিনই দেবীর শাস্ত্রীয় বিসর্জন সম্পন্ন হয়। মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে প্রতিমা থেকে ঘটে এবং ঘট থেকে আবার ভক্তের হৃদয়ে মাকে নিয়ে আসাকে বিসর্জন বলে। সনাতন বিশ্বাস ও বিশুদ্ধ পঞ্জিকা মতে, জগতের মঙ্গল কামনায় দেবী দুর্গা এবার ঘোটকে (ঘোড়া) চড়ে মর্ত্যলোকে (পৃথিবী) এসেছিলেন। আর দেবী স্বর্গালোকে বিদায় নিলেন দোলায় (পালকি) চড়ে। যার ফল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, রোগ, মহামারীর প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাবে। তবে ভক্তদের বিশ্বাস অসুর শক্তি বিনাশকারী দেবী বিদায় নেয়ার সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবী থেকে সব অপশক্তির বিনাশ হবে। বইবে শান্তির সুবাতাস।

ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে দেড় বিঘা
জমি দিলেন প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দীর্ঘ ৬০ বছরের পুরনো (ভূমি) সমস্যা মিটিয়ে ১৫ অক্টোবর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরকে দেড় বিঘা জমি প্রদান করেছেন।
পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জী এ বিষয়ে বলেন, মন্দিরের জমির দীর্ঘ ৬০ বছরের সমস্যা মিটিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি আমাদের দিয়েছেন। আমাদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে এই জমি প্রদান করলেন।
নির্মল চ্যাটার্জী দীর্ঘ দিনের সমস্যা সমাধান করে ঢাকেশ্বরী মন্দিরকে জমি দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
শেখ হাসিনা একই দিন সকালে ঢাকেশ্বরী মন্দির পরিদর্শনকালে মন্দিরের জমি সমস্যা সমাধানে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দকে আশ্বাস দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বিকেলে পূজাম-প পরিদর্শনকালে তাদের উদ্দেশে বলেন, আমরা ইতোমধ্যেই সমস্যাটির সমাধান করে দিয়েছি। বাকি কাজ আপনাদের ওপর নির্ভর করবে।