প্রতিবেদন

দক্ষিণবঙ্গের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলবে পদ্মাসেতুতে রেল সংযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
গত ১৪ অক্টোবর মুন্সীগঞ্জের মাওয়ায় দেশের রেল খাতের নতুন দিগন্ত উন্মোচনে যুগান্তকারী ‘পদ্মাসেতু রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্পের’ উদ্বোধন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুর মাওয়া প্রান্তে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে ‘পদ্মাসেতু রেল সংযোগ নির্মাণ প্রকল্পের’ আওতায় ঢাকা ও যশোরের মধ্যে রেল সংযোগের যুগান্তকারী এ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করেন।
রেলপথমন্ত্রী মুজিবুল হক রেল সংযোগ প্রকল্পের মডেল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে অবহিত করেন। মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সেনাবাহিনী প্রধান, সিনিয়র আওয়ামী লীগ নেতা, পদ্মাসেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক, উর্ধ্বতন বেসামরিক ও সামরিক র্কমকর্তারা অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
এই প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ে পদ্মা বহুমুখী সেতু দিয়ে জাজিরা ও শিবচর হয়ে মাওয়া ও ভাঙার মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। এর মাধ্যমে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, নড়াইল ও যশোরের মধ্যে রেল সংযোগ স্থাপিত হবে। চীন সরকার মনোনীত নির্মাতা প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেড চীন জিটুজি ব্যবস্থায় এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এ খাতে চীনের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে ২ হাজার ৬৬৭ দশমিক ৯৪ মিলিয়ন ডলারের একটি ঋণচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় ২৩ কিলোমিটার এলিভেটেড রেলপথ নির্মিত হবে। এতে একাধিক এলিভেটরসহ দুটি প্লাটফর্ম, একটি মেইন লাইন ও দুটি লুপ লাইন নির্মাণ করা হবে।
দেশের আস্থা ও নির্ভরতার প্রতীক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোর এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (বুয়েট) এই প্রকল্পে পরামর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদ্মাসেতুর নামফলক এবং মাওয়া অংশে ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার সেতুর কাজের ৬০ শতাংশ অগ্রগতি উদ্বোধন করেন। এ সময় তিনি মাওয়া-কান্দিপাড়া-জসোলদিয়া এলাকায় ১ হাজার ৩০০ মিটার নদীতীর স্থায়ী সুরক্ষা কাজের উদ্বোধন করেন।
এই সেতু নির্মাণে অনুমিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ দশমিক ৩৯ কোটি টাকা এবং এর মধ্যে এই পর্যন্ত ১২ হাজার ৯৭২ দশমিক ৪৬ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে।
সূত্রমতে, সেতুর নির্মাণকাজের সার্বিক অগ্রগতি ৬০ শতাংশ এবং মূল সেতুর দৃশ্যমান অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। সেতুর ৫ম স্প্যান স্থাপন করায় সেতুর মূল কাঠামোর ৭৫০ মিটার দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। সেতুটি সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও উপাদানে স্টিল ও কনক্রিট কাঠামোয় তৈরি হচ্ছে। এর উপরের ডেক দিয়ে যানবাহন এবং নিচের ডেক দিয়ে রেল চলাচল করবে। সেতু নির্মাণ সম্পন্ন হলে দক্ষিণাঞ্চলীয় ১৯ জেলার সঙ্গে ঢাকার সরাসরি সড়ক ও রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে।
৫১ কিলোমিটার হাইওয়ে আধুনিক যান চলাচলের ডিজাইনে দুই লেন থেকে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে এবং এই প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ৬ হাজার ৮৫২ দশমিক ২৯ কোটি টাকা। এতে হাইওয়ের উভয় পাশে ধীরগতির যানবাহনের জন্য ৫ দশমিক ৫ মিটার প্রশস্ত পৃথক লেন এবং হাইওয়ের মাঝখানে ৫ মিটার প্রশস্ত সড়কদ্বীপ রয়েছে। এই সড়কদ্বীপ ব্যবহার করে মেট্রোরেল এবং এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
পাশাপাশি ৫৪টি কালভার্ট, ২০টি আন্ডারপাস, ৪টি ব্রিজ, ২৫টি ছোট ব্রিজ, ৫টি ফ্লাইওভার, ২টি ক্রসিং, ৪টি রেলওয়ে আন্ডারপাস রয়েছে। এসব সুযোগ-সুবিধা যুক্ত হওয়ার পর এটি এক্সপ্রেসওয়েতে রূপান্তরিত করা হবে। ঢাকা থেকে মুন্সীগঞ্জের মাওয়া হয়ে পদ্মাসেতু দিয়ে দক্ষিণবঙ্গের যশোর পর্যন্ত রেলপথ সম্প্রসারিত হলে ঢাকা থেকে যশোর পর্যন্ত দূরত্ব হবে মাত্র ১৬৬.৩৩ কিলোমিটার, যা অনায়াসে ৩ থেকে ৪ ঘণ্টায় অতিক্রম করা যাবে। এজন্য দুটি নতুন প্রকল্প হাতে নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর ফলে রাজধানীর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের যাতায়াত ও বাণিজ্য সুবিধা বাড়বে।
প্রকল্প দুটি বাস্তবায়ন হলে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর ও ফরিদপুরের ভাঙ্গা পর্যন্ত রেল যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে বৃহত্তর ঢাকা বিভাগের ৬ জেলায় বিদ্যমান দুটি স্টেশন ছাড়াও নতুন ৬টি রেলস্টেশন স্থাপন করা হবে। এগুলো হলো কেরানীগঞ্জ, নিমতলা, শ্রীনগর, মাওয়া, জাজিরা ও শিবচর। রেলপথটি নির্মাণে মোট ৩৬৫ দশমিক ১০ হেক্টর জমি অধিগ্রহণের প্রয়োজন হবে। এর মধ্য ২৭৩ হেক্টর ব্যক্তি মালিকানাধীন ও ৯২ হেক্টর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ)। প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যাসহ ৪টি বড় ও ৫৬টি ছোট রেল সেতু নির্মাণ করতে হবে। ৫টি রেলক্রসিংসহ ৪০টি পয়েন্টে আন্ডারপাসসহ জাতীয় মহাসড়কে ৩টি ফ্লাইওভার থাকবে। ঢাকা সিটি করপোরেশন, সিরাজদিখান, শ্রীনগর, লৌহজং, জাজিরা, শিবচর ও ভাঙ্গা উপজেলার প্রায় ৮৭টি মৌজার ওপর দিয়ে এই রেলপথটি নির্মাণ করা হবে। এছাড়া সম্ভাব্য রুট নির্ধারণের জন্য সমীক্ষার সময়ে ৩টি তুলনামূলক বিবরণী তৈরি করা হয়।
সূত্র জানায়, সমীক্ষা-১ অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে অর্থ সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রেলপথটি লাভজনক হবে। ভাঙ্গা থেকে জাজিরা পর্যন্ত রেলপথ ২০২০ সালের মধ্যেই চালু করা সম্ভব হবে। তবে রাজধানী থেকে পদ্মা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে ২০২১ সাল লাগতে পারে। আর পদ্মা সেতুর সঙ্গে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রেল সংযোগ স্থাপনে পাচুরিয়া-ফরিদপুর-পুকুরিয়া-ভাঙ্গা ৬০ কিলোমিটার রেলপথ এরই মধ্যে সংস্কার করা হয়েছে। এছাড়া ভাঙ্গা-যশোর রেলপথ নির্মাণের প্রকল্প উদ্বোধন হয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীর রেল যোগাযোগ দ্রুত হবে। তখন ৩-৪ ঘণ্টায় এ পথে খুলনা থেকে ঢাকা আসা যাবে। বর্তমানে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষকে বঙ্গবন্ধু সেতু হয়ে প্রায় ১০০ কিলোমিটার পথ ঘুরে রেলপথে রাজধানী আসতে হয়। রেলপথটি নির্মাণ হলে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এক-চতুর্থাংশ জনগোষ্ঠী ও দেশের সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নে বিপুল অবদান রাখতে সক্ষম হবে।