আন্তর্জাতিক

পরমাণু চুক্তি ইস্যুতে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে টানাপড়েন : আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে নতুন মেরুকরণ!

স্বদেশ খবর ডেস্ক
১৯৮৭ সালে রাশিয়ার সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। গত ২০ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দেন। তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া বহুদিন ধরেই পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘন করছে।
মস্কোও এ নিয়ে পাল্টা পদক্ষেপ নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
এই অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে বিশ্বের শক্তিধর বৃহৎ দুইটি দেশের মধ্যে দূরত্ব আরো বাড়ছে। এদিকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্যযুদ্ধ এ দুই পরাশক্তির মধ্যে সম্পর্কের বড় ধরনের টানাপড়েন তৈরি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেসামাল আচরণ ও কর্মকা-ে অস্থিরতার কারণে বিশ্বব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের প্রভাব ক্রমেই হ্রাস পেতে থাকে। এতে করে আন্তর্জাতিক নেতৃত্বে নতুন মেরুকরণের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর বিশ্বনেতাদের নেতা হিসেবে ট্রাম্প ক্রমেই ছিটকে পড়ছেন। সে স্থান দখলে চলে যাচ্ছে শি জিনপিং, অ্যাঙ্গেলা মার্কেল কিংবা ভøাদিমির পুতিনের হাতে।
সম্প্রতি রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি সম্পর্কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বহুদিন ধরেই রাশিয়া পরমাণু চুক্তি লঙ্ঘন করে আসছিল। অথচ আমরা চুক্তির শর্ত বজায় রেখে তা মেনেছিলাম এবং চুক্তিকে সম্মান জানিয়ে গেছি। দুর্ভাগ্যবশত রাশিয়া চুক্তিকে অসম্মান করেছে। সেজন্যই আমরা এই চুক্তি বাতিল করছি।
উল্লেখ্য, ১৯৮৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচেভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী দুই দেশই ৩০০ থেকে ৩,৪০০ মাইল দূরত্বে আঘাত হানতে সক্ষম ভূমি থেকে ছোড়া ব্যালাস্টিক এবং ক্রুজ মিসাইল নষ্ট করতে বাধ্য হয়।
এদিকে রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পদক্ষেপকে বিপজ্জনক বলে উল্লেখ করেছেন রাশিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই রায়াকভ। তিনি বলেন, রাশিয়াসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এই পদক্ষেপ মেনে নেবে না। যুক্তরাষ্ট্র যদি হিংস্র ও একতরফাভাবে চুক্তি থেকে সরে যায় তাহলে সামরিক প্রযুক্তি জোরদার করা এবং প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেয়া ছাড়া আমাদের বিকল্প থাকবে না। তবে আমরা এখনই এটা চাইছি না।
এদিকে আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে কংগ্রেসের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগেই রাশিয়ার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের কথা জানালেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ইতোমধ্যেই সতর্কবার্তা জারি করেছে যে, নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে রাশিয়া, চীন ও ইরান।
এদিকে রাশিয়ার সাথে করা স্নায়ুযুদ্ধকালীন পরমাণু অস্ত্র চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে যুক্তরাষ্ট্রকে অবশ্যই আরেকবার ভাবতে হবে বলে মত দিয়েছে চীন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯৮৭ সালে করা ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি (আইএনএফ) থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেয়ার প্রেক্ষাপটে চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং গত ২২ অক্টোবর এ কথা বলেন।
এ বিষয়ে ট্রাম্প বলেন, রাশিয়া বছরের পর বছর ধরে চুক্তিটি লঙ্ঘন করে আসছে। আর চীন স্বাক্ষরকারী দেশ না হওয়ায় এ ধরনের অস্ত্র তৈরির সুযোগ পাচ্ছে।
ট্রাম্পের বক্তব্য সমর্থন করে রিপাবলিকান দলের দুই আইনপ্রণেতা বলেন, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে বিরত রাখলেও চীন এ ধরনের অস্ত্র তৈরির সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। এটি খুবই উদ্বেগের বিষয়।
হুয়া বলেন, চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা প্রসঙ্গে চীনকে টেনে আনা যে সম্পূর্ণ ভুল সে দিকে গুরুত্ব দেয়া উচিত। নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে এবং বিশ্ব স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত সমতা বজায় রাখতে এই চুক্তি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চুক্তি থেকে একতরফা প্রত্যাহার নানা ধরনের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে। তাই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে চুক্তি থেকে প্রত্যাহারের আগে আরেকবার ভাবতে হবে।
এর আগে চলতি বছরের মে মাসের দিকে ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। ওয়াশিংটনে এক সংবাদ সম্মেলন ডেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ ঘোষণা দিয়েছিলেন। একই সাথে ইরানের ওপর পারমাণবিক ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণাও দিয়েছিলেন ট্রাম্প। মার্কিন প্রেসিডেন্ট তখন বলেছিলেন, ইরানের সাথে যে পরমাণু চুক্তি করা হয়েছে সেটি বজায় থাকলে দেশটি পারমাণবিক শক্তি অর্জন করবে। এ ধরনের চুক্তি কখনোই করা উচিত হয়নি। তাছাড়া ইরান সন্ত্রাসবাদকে সমর্থন দিচ্ছে। লেবাননের হিজবুল্লা, ফিলিস্তিনের হামাস এবং আল-কায়েদাকে ইরান সমর্থন দিচ্ছে বলে ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন।
২০১৫ সালে পৃথিবীর পঞ্চ বৃহৎ শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, রাশিয়া এবং নতুন শক্তিধর রাষ্ট্র জার্মানি মিলে পারমাণবিক চুক্তি করেছিল ইরানের সাথে। বারাক ওবামা যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, সে সময় ইরানের সাথে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলো পরমাণু চুক্তি করেছিল। সেই চুক্তির মূল বিষয় ছিল ইরান পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ রাখবে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি কমিশন ইরানের যেকোনো পরমাণু স্থাপনায় যেকোনো সময় পরিদর্শন করতে পারবে। অর্থাৎ ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে সেজন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ইরানকে নজরদারির মধ্যে রাখতে পারবে। আর এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে অর্থনৈতিক অবরোধ তুলে নেয়া হয়েছিল।
কিন্তু ট্রাম্প নতুন করে অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করেছেন ইরানের ওপর। ইরানের সাথে পরমাণু চুক্তি থেকে আমেরিকা যাতে সরে না যায় সেজন্য ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানি বরাবরই ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করছিল, কিন্তু মিত্র দেশগুলোর আহ্বানে কোনো গুরুত্ব দেননি ট্রাম্প। এমতাবস্থায়, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মহল বলছেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একগুঁয়ে মনোভাব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অস্থিরতার কারণে বহির্বিশ্বের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কে নানা টানাপড়েন সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিশ্বব্যাপী মার্কিন প্রভাব ক্রমেই হ্রাস পাচ্ছে। এতে করে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তথা নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী নতুন মেরুকরণ হচ্ছে।