প্রচ্ছদ প্রতিবেদন

ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়াধীন বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : আওয়ামী লীগ আবার সরকার গঠন করতে পারলে দেশে ক্ষুধা-দারিদ্র্য থাকবে না

মেজবাহউদ্দিন সাকিল
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ২১ অক্টোবর গণভবন থেকে চারটি জেলার সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে সংযুক্ত হয়ে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়াধীন ৬৬টি শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম, ৬টি জেলার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি)-র সিনথেটিক টার্ফসমৃদ্ধ মাল্টি স্পোর্টস কমপ্লেক্স উদ্বোধন করেন। ভিডিও কনফারেন্সে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণ দেন এবং স্থানীয় জনসাধারণ ও উপকারভোগীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
ভিডিও কনফারেন্সে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বীরেন সিকদার, উপমন্ত্রী আরিফ খান জয় এবং বিকেএসপি’র মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আনিসুর রহমান বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি জাহিদ আহসান রাসেল এসময় গণভবন প্রান্তে উপস্থিত ছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর ভাষণে তরুণ প্রজন্মকে দেশের সবচেয়ে বড় শক্তি আখ্যায়িত করে তাদের কর্মসংস্থানে সরকারের নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন এবং উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আগামী নির্বাচনে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভোট চান।
শেখ হাসিনা বলেন, আগামী নির্বাচনে যদি বাংলাদেশের জনগণ নৌকা মার্কায় ভোট দেয় এবং আমরা যদি আবারো সরকার গঠন করে দেশের সেবা করতে পারি তাহলে আমি এটা দ্ব্যর্থহীনভাবে বলতে পারি, ২০২০ সালের মধ্যে দেশে কোনো ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থাকবে না এবং দেশকে আমরা আরো উন্নয়নের পথে এগিয়ে নিয়ে যাব।
প্রধানমন্ত্রী যুবসমাজের কাছে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে বলেন, আমাদের যুবসমাজ দেশের উন্নয়নে তাদের মেধা ও মননকে কাজে লাগাবে এবং নতুন নতুন চিন্তাভাবনা করবে যেন এই দেশকে আরো দ্রুত কিভাবে উন্নত করে গড়ে তোলা যায়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা যোগাযোগব্যবস্থা থেকে শুরু করে দেশের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। সেই সাথে আমরা ক্রীড়া এবং যুব উন্নয়কে সবসময় গুরুত্ব দিই। আওয়ামী লীগ যখনই জনগণের ভোট পেয়ে সরকার গঠন করেছে তখনই খেলাধুলাসহ দেশের সার্বিক উন্নয়নে কাজ করেছে। আওয়ামী লীগ সরকার একেবারে তৃণমূলের স্কুল পর্যায় থেকে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপ এবং বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন আন্তঃস্কুল প্রতিযোগিতার আয়োজন করে খেলোয়াড় বের করে আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সেই সাথে স্থানীয় এবং একেবারে দেশজ খেলাগুলো যেন হারিয়ে না যায় সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। খেলাধুলা এবং শরীরচর্চায় ছেলে-মেয়েদের আরো উৎসাহিত করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, খেলাধুলা ও সংস্কৃতি চর্চায় আমাদের ছেলে-মেয়েদের আমরা যতবেশি সম্পৃক্ত করতে পারবো ততবেশি তাদের চরিত্র অনমনীয় ও দৃঢ় হবে। এতে তারা সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হবে, মাদকগ্রহণ ও জঙ্গিসম্পৃক্ততার মতো কোনো বিপথে তরুণসমাজ যাবে না।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ক্রিকেট, ফুটবল, হকি, দাবাসহ বিভিন্ন খেলায় বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সার্ক অনূর্ধ্ব ১৫ এবং ১৮ ফুটবলে বাংলাদেশের নারীরা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ২০১১ সালে বাংলাদেশ মহিলা ক্রিকেট দল ওয়ান ডে স্ট্যাটাস অর্জন করে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে। ২০১৭ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত আইসিসি চ্যাম্পিয়ন’স ট্রফিতে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল সেমিফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে, ইসলামিক সলিডারিটি গেমস-২০১৭-তে শুটিংয়ের মিশ্র দ্বৈতে স্বর্ণ পদক এবং ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রৌপ্য পদক লাভ করে, আর্চারিতে ২০১৭-তে ৬টি স্বর্ণ পদক এবং প্রতিবন্ধীদের বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ক্রীড়ায় বাংলাদেশের প্রতিবন্ধীরাও সাফল্য লাভ করে।
বর্তমান সরকারের সময়ে আইসিসি ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট, বঙ্গবন্ধু সার্ক ফুটবল, বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ ফুটবল, সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ, পুরুষ এশিয়া কাপ হকি-২০১৭সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়ে এবং প্রতিবন্ধীদের ক্রীড়া প্রতিভা বিকাশে সবরকমের সুযোগ সৃষ্টিতে সরকার সর্বদা চেষ্টা করে যাচ্ছে। সরকার চায় তরুণ প্রজন্ম যেন সবসময় খেলাধুলার সাথে সম্পৃক্ত থাকে।
জাতীয় ক্রীড়ানীতির খসড়া ইতোমধ্যে প্রস্তুত হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার ৬ এপ্রিলকে জাতীয় ক্রীড়া দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে (বিকেএসপি) বিভাগীয় পর্যায়ে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, খেলাধুলার মানোন্নয়নে প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য তুলে ধরে এবং পরিবেশকে রক্ষা করে আন্তর্জাতিক মানের ক্রিকেট ভেন্যু ও বিভিন্ন স্টেডিয়াম তৈরি করায় সরকার সচেষ্ট রয়েছে।
দেশের ৬টি শারীরিক শিক্ষা কলেজে ‘বিপিএড’ ডিগ্রি প্রদান করা হচ্ছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতি জেলায় যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকার যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে উদ্যোগ গ্রহণ করবে, যেখান থেকে যুবকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াবে এবং নিজের পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে সমর্থ হবে। দেশের ৬৪ জেলায় ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি চালু করার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তরুণ যুবসমাজ নিজেদের কর্মসংস্থান নিজেরাই করে নিতে পারবে।
দেশের যুব সমাজকে আগামীর ভবিষ্যৎ আখ্যায়িত করে শেখ হাসিনা বলেন, এই তরুণ যুবকদেরকে আমরা একটা দক্ষ প্রজন্ম হিসেবে গড়ে তুলতে চাই।
প্রধানমন্ত্রী তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টিতে কর্মসংস্থান ব্যাংক প্রতিষ্ঠা এবং এসব ব্যাংক থেকে বিনা জামানতে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা প্রদানের তথ্য তুলে ধরে বলেন, তরুণদের বেকারত্বের অভিশাপ থেকে মুক্ত করার জন্যই আমরা এ উদ্যোগ নিয়েছি। আর কারো বেকার থাকার কোনো সুযোগ নেই। একটু উদ্যোগ নিলেই নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে। কেননা তারুণ্যইতো মেধা মনন বিকাশের সময় এবং নিজেকে ও দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া তরুণদেরই কাজ।
বেসরকারি খাতকে সরকার উৎসাহিত করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মোবাইল ফোন বেসরকারি খাতে দিয়েছিলাম বলেই আজ মানুষের হাতে হাতে মোবাইল ফোন। সরকার ৪৪টি টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়েছে। তবে এতগুলো টেলিভিশনের লাইসেন্স দেয়ায় ভুক্তভোগী যে সরকারই হচ্ছে তা-ও মনে করিয়ে দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, সব টেলিভিশনই এখন ঢালাওভাবে সরকারের সমালোচনা করছে। অবশ্য এর মাধ্যমে কর্মসংস্থানও হচ্ছে বলে মনে করেন তিনি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা কোথায় ছিলাম, আর এখন কোথায় এসেছি! মাত্র ১০ বছরে এই পরিবর্তন হয়েছে। এটা সম্ভব হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করেছে বলে। আর তরুণ প্রজন্ম ভোট দিয়েছে বলে।
এসময় তরুণদের মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনা এবং প্রযুক্তির আপডেট জ্ঞান লাভ করার তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি কম্পিউটার যন্ত্রাংশসহ অন্যান্য তথ্যপ্রযুক্তি সামগ্রীর ওপর শুল্ক হ্রাসে সরকারের উদ্যোগ তুলে ধরে দেশের উন্নয়নে কিছু ট্যাক্স প্রদান জরুরি উল্লেখ করে বলেন, প্রয়োজনীয় ট্যাক্স দিতে হবে। তাহলেই উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কথায় কথায় ট্যাক্স কমানোর দাবি করলে উন্নয়ন হবে কিভাবে?
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে এ কথাও সত্য যে, দেশের মানুষ ট্যাক্স দিচ্ছে বলেই বাজেট ৭ গুণ বৃদ্ধি করতে পেরেছি। সবচেয়ে বড় কথা, বাইরের কাছে হাত পাততে হচ্ছে না। এটা আমাদের জন্য সম্মানের। এই সম্মান ধরে রাখতে চাই। আত্মনির্ভরশীল দেশ গড়ে তোলাই আমাদের প্রধান লক্ষ্য।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি আমার বর্তমানকে উৎসর্গ করছি তরুণদের ভবিষ্যতের জন্য। আমাদের বর্তমান, আমরা তো চলেই যাচ্ছি। আমাদের বর্তমানে যতটুকু কাজ আমরা এগোতে পারি সেটা আমরা উৎসর্গ করেছি তরুণ প্রজন্মের জন্য। তারা আমাদের ভবিষ্যৎকে গড়ে তুলবে, এগিয়ে নিয়ে যাবে। এই চলার গতিটা যেন কখনো থেমে না যায়।
তরুণদের উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের ছেলে-মেয়েদের এটাই বলবো তারা যেন মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া শিখে। আর প্রযুক্তি ব্যবহারে আরো অভ্যস্ত হতে হবে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। যত দিন যায় প্রতিনিয়ত আধুনিক প্রযুক্তি বের হয়।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা যতদিন ক্ষমতায় আছি এই পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যা যা পদক্ষেপ নেয়া দরকার সেগুলো আমরা নেবো।
উন্নয়নের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখা জরুরি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশ এবং এই গতিধারা আমাদের অব্যাহত রাখতে হবে। জাতির পিতা আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছেন। এখন দেশকে আমাদেরই এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ২০২০ সালে আমরা জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করবো এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ হবে জাতির পিতার স্বপ্নের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ। ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ।
শেখ হাসিনা বলেন, আজকের যারা শিশু-কিশোর এবং তরুণ তাদের ভবিষ্যৎ যেন আরো সুন্দর, উজ্জ্বল ও সফল হয় সেদিকে লক্ষ্য রেখেই সরকার শতবর্ষ মেয়াদি ‘ডেল্টা প্ল্যান-২১০০’ গ্রহণ করেছে। এই ডেল্টা প্ল্যান হলো উন্নত বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। আর এ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণসমাজ উন্নত-সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের দেখা পাবে।