অর্থনীতি

যে কারণে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ দিনদিনই বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক
পৃথিবীর পরিশ্রমী জাতিগুলোর মধ্যে জাপান অন্যতম। অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবদিক দিয়ে জাপান খুব দ্রুত এগিয়ে গেছে এবং আরো যাচ্ছে। বাংলাদেশের সঙ্গে জাপানের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আগে থেকেই অনেক ভালো ছিল। জাপানি বিনিয়োগ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য সবসময়ই আশীর্বাদস্বরূপ; যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতিনিয়তই যুক্ত করছে নতুন মাত্রা।
২০০৮ সালে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানি ছিল ৭০টি, ২০০৯ সালে ছিল ৮২টি, ২০১১ সালে ১১৩টি, ২০১৩ সালে ১৬৭টি, ২০১৫ সালে ২৩২টি, সর্বশেষ ২০১৭ সালে জাপানি কোম্পানি হয় ২৬৯টি। বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহ দিন দিন বাড়ছে।
সর্বশেষ এ আগ্রহ দেখিয়েছে জাপানের জে টি গ্রুপ। বাংলাদেশের আকিজ গ্রুপের সঙ্গে জাপানের জে টি গ্রুপ একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। চুক্তি অনুযায়ী জাপান টোব্যাকো বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম টোব্যাকো কোম্পানিকে প্রায় ১২৪.৩ বিলিয়ন বা ১২ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার বিনিময়ে অধিগ্রহণ করবে।
উল্লেখ্য, জাপান টোব্যাকো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান যারা প্রায় ১৩০টি দেশে প্রায় ৬০ হাজার কর্মী নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে।
স্বাধীনতার পর থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে জাপানের মোট বিনিয়োগের পরিমাণ হলো ১ হাজার ৫১২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর এই একটি অধিগ্রহণেই বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪৭৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার জাপানি বিনিয়োগ হবে; যা দেশের ইতিহাসে একটি অনন্য রেকর্ড।
এই বিনিয়োগ বর্তমান সরকারের বিনিয়োগবান্ধব নীতির প্রতি জাপানি ব্যবসায়ীদের আস্থার একটি সুস্পষ্ট প্রতিফলন। ব্যবসার অনুকূল পরিবেশের পাশাপাশি দেশের সবল অর্থনীতি ও দক্ষ জনশক্তিও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করেছে।
গত এক দশকের মধ্যে বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানির সংখ্যা বেড়েছে চারগুণেরও বেশি। বড় বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে। ২০১৭ সালে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে ১ হাজার ১৩০ কোটি ইয়েন বিনিয়োগ করছে, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৮৪০ কোটি টাকার সমান। এই টাকার ৮৭ শতাংশই হলো মূলধন। ২০১৬ সালে এই বিনিয়োগ আরও বেশি ছিল।
সম্প্রতি আরও কিছু বড় বড় জাপানি কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। জাপানের মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী কোম্পানি ইয়ামাহা বাংলাদেশে মোটরসাইকেল কারখানা করার প্রস্তাব দিয়েছে। এরই মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মোটরসাইকেল উৎপাদনকারী কোম্পানি হোন্ডা মুন্সীগঞ্জে ২৫ একর জমিতে মোটরসাইকেল সংযোজন ও যন্ত্রাংশ উৎপাদনের কারখানা তৈরি করেছে, যা চলতি বছর থেকে পণ্য উৎপাদন শুরু করবে। হোন্ডা মোটর করপোরেশনের বিনিয়োগের পরিমাণ ৪ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩৬৯ কোটি টাকা। জাপানের আরেকটি বড় কোম্পানি সজিব করপোরেশন মিরসরাইয়ে একটি শিল্পপার্ক তৈরির জন্য ১ হাজার একর জমি বরাদ্দের আবেদন করেছে। দেশের বিদ্যুৎ খাতের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সামিট করপোরেশন ২৪ হাজার কোটি টাকার একটি বিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করছে জাপানি কোম্পানি মিতসুবিশি। তামাকজাত দ্রব্য উৎপাদন ও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠান জাপান ট্যোবাকো বাংলাদেশের আকিজ গ্রুপের তামাক ব্যবসা কিনে নিয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ইস্পাত পণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান নিপ্পন অ্যান্ড সুমিটোমো মেটাল ইস্পাত কারখানার জন্য জমি নিয়েছে। দ্রুতই কোম্পানিটি তাদের কারখানা চালু করবে। তবে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো যেমন ভারত, শ্রীলংকা, মিয়ানমার, নেপাল ইত্যাদি দেশগুলোতে জাপান যে পরিমাণ বিনিয়োগ করছে তা বাংলাদেশে বিনিয়োগের তুলনায় আরও বেশি। তাই বিনিয়োগের ক্ষেত্রে জাপানি কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী করতে সরকারকে আরও জোরালো ভূমিকা পালন করতে হবে।
জানা গেছে, জাপানের যেসব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চীনে ব্যবসা করছে, তারা আগামী দু-এক বছরের মধ্যে নতুন কোনো দেশে বিনিয়োগ করতে চায়। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রথম পছন্দ ভারত, আর দ্বিতীয় দেশটি হলো বাংলাদেশ। শ্রমিকের স্বল্প মজুরি, সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যয়, কম ব্যয়ে ব্যবসা পরিচালনার পাশাপাশি এ দেশে ব্যবসা করে মুনাফা করা সম্ভবÑ এমনটাই মনে করেন জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তারা। সে জন্যই তারা বাংলাদেশে অধিকহারে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী।
জাপান সরকারের বাণিজ্য বিষয়ক সংস্থার (জেট্রো) সাম্প্রতিক এক জরিপে এসব বিষয় উঠে এসেছে। জেট্রো বলছে, বিশ্বের ২০টি দেশে ব্যবসা পরিচালনা করছেÑ জাপানের এমন ১০ হাজার ৭৮টি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর ২০১৭ সালের অক্টোবর ও নভেম্বরে জরিপ করেছে তারা। এ ক্ষেত্রে প্রশ্নপত্রের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানের সিইওদের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে।
সংস্থাটি বলছে, চীনে ব্যবসা পরিচালনায় নানা বাধার কারণে অনেক জাপানি ব্যবসায়ী সে দেশ থেকে তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিতে চান। জরিপ বলছে, জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইওদের প্রথম পছন্দ ভারত। ৭৮ শতাংশই সে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী। আর বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন ৭১ দশমিক ৭ শতাংশ সিইও। ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে বিনিয়োগ করতে চান যথাক্রমে ৬৬ শতাংশ ও ৬০ দশমিক ৯ শতাংশ সিইও। ৪৬ শতাংশ সিইও চীনেই ব্যবসা বাড়াতে চান। জরিপে অংশ নেয়া ৭১ শতাংশ সিইও-ই আশা করেন, বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে অধিক মুনাফা অর্জন করা সম্ভব। এর বড় কারণ হলো বাংলাদেশে শ্রমিকের মজুরি খুবই কম, মাসে সর্বোচ্চ ১০০ ডলার দিয়েই এদেশের শ্রমিকদের কাজ করানো যায়; যা চীনে ৪০৩ ডলার ও ভারতে ২৩৯ ডলার। জেট্রো বলছে, জাপানে ১০০ ডলারে যে পণ্য উৎপাদন করা যায়, বাংলাদেশে তা উৎপাদন করা যায় অর্ধেক দামে।