প্রতিবেদন

সরকারের সময়োচিত ও কার্যকর সিদ্ধান্তে বিদ্যুতের উৎপাদন বেড়েছে ছয়গুণ

নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশে এখন ঝুপড়ি নেই, এদেশ এখন আলোর ঝলকানির দেশ। বাংলাদেশ যতটুকু উজ্জ্বল হয়েছে সেটাকে অন্ধকার করা যাবে না। আগামী পাঁচ বছর সরকারের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে দরিদ্রতার হার দশ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। ১৯৯১ সালে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ৫৮ শতাংশ। বর্তমান সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে এখন তা ২২ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।
গত ১৯ অক্টোবর সিলেট সদর উপজেলা পরিষদ মাঠে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার প্রকল্প’ এবং পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক-এর সুবিধাভোগীদের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের শুরু থেকেই বিদ্যুৎ নিয়ে অনেক বেশি চিন্তাভাবনা ছিল। এটা নিয়ে সরকার অনেক কাজ করেছে। শুরুর দিকে অনেক সমালোচনা সত্ত্বেও আমরা শতভাগ সফল হয়েছি। বিদ্যুতের উৎপাদন ছয়গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে দেশে এখন বিদ্যুতের সংকট নেই। দেশ বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করছে। মানুষের জীবনমান উন্নত হয়েছে। উৎপাদনও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
অর্থমন্ত্রী বলেন, সর্বত্র মানুষের মঙ্গলের সুযোগ করে দিতে শেখ হাসিনার সরকার কাজ করছে। বিগত দশ বছরে শেখ হাসিনা সরকারের ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রা অনেকাংশে পূরণ হয়েছে। অবশিষ্ট কাজগুলো পূরণ করতে এবং সরকারের উন্নয়ন ও জনবান্ধব উদ্যোগকে ত্বরান্বিত করতে জনগণের ঐক্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের বর্ণনা দিতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ৬ গুণ বৃদ্ধির কথা বলেন।
তবে এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বর্তমান সরকারের বিগত ১০ বছরের শাসনামলে সবচেয়ে বেশি উন্নতি সাধিত হয়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাপনায়। আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছিল ২০০৯ সালের ৬ জুন। সেই বিদ্যুতের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ২৬৮ মেগাওয়াট। এরপর প্রতি বছরই দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের ১৯ মার্চ সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে ১৮ হাজার ৮৪ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ৯ বছরের ব্যবধানে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পার্থক্য ১৪ হাজার ৮১৬ মেগাওয়াট।
এই দুই সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের তুলনামূলক চিত্রই বলে দিচ্ছে বিদ্যুৎখাতের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রয়েছে। একইসঙ্গে দেশজুড়ে কমে গেছে লোডশেডিংয়ের দুর্বিষহ যন্ত্রণা। যদিও মাঝে মধ্যে এখনও বিতরণ ত্রুটিতে ভুগছেন গ্রাহক। তবে বিদ্যুতের জন্য হাহাকার আর নেই। রাজধানীর সব এলাকায় যেখানে প্রতিঘণ্টায় লোডশেডিং হতো, সেই অবস্থা এখন অনেক সহনীয় পর্যায়ে এসেছে। পিডিবির ওয়েবসাইট বলছে, গত ১৫ মার্চ দেশে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ হাজার ৭১৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়েছে। এছাড়া গত বছরের ১৮ নভেম্বর বিদ্যুৎ উৎপাদন ওই বছরের সর্বোচ্চ ছিল ৯ হাজার ১১ মেগাওয়াট। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০১৬ সালের ৩০ জুন ৭ হাজার ৪৮৫ মেগাওয়াট সর্বোচ্চ উৎপাদন হয়েছে।
সরকারের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, দেশের প্রতিটি ঘরে পর্যায়ক্রমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেয়ার কাজ শেষ করা হবে ২০২১ সাল নাগাদ। এ জন্য বিদ্যুতের উৎপাদন যা-ই হোক না কেন, প্রতি মাসেই নতুন তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ সংযোগ দেয়া হচ্ছে। এভাবে প্রতি মাসে নতুন গ্রাহক যুক্ত হওয়ায় সংকট সৃষ্টি হলেও তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান বলছে, বিগত ৯ বছরে বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নতুন ৮৮টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। এ সময়ে অবসরে গেছে মাত্র তিনটি কেন্দ্র। ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ছিল মাত্র ২৭টি আর এখন ১১২টি।
পাওয়ার সেল সম্প্রতি যে হিসাব দিয়েছে তাতে দেখা যায়, ২০০৯ সালে দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪ হাজার ৯২৪ মেগাওয়াট। এখন ক্যাপটিভসহ যা ১৬ হাজার ৪৬ মেগাওয়াটে দাঁড়িয়েছে। ওই সময় বিদ্যুতের সুবিধা পেতো ৪৭ ভাগ জনগণ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৭ ভাগে।
উৎপাদন বাড়ার পাশাপাশি বিগত ১০ বছরে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইনও বেড়েছে। ২০০৯ সালে মোট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন ছিল ৮ হাজার কিলোমিটার। এখন যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার ৬৮০ কিলোমিটারে। গ্রিড সাবস্টেশনের ক্ষমতা ছিল ২০০৯ সালে ১৫ হাজার ৮৭০ এমভিএ। এখন যার পরিমাণ ৩০ হাজার ৯৯৩ এমভিএ। নতুন নতুন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ করায় ব্যাপকভাবে বিতরণ লাইন বৃদ্ধি করা হয়েছে। ৯ বছরে ১ লাখ ৮০ হাজার কিলোমিটার নতুন বিতরণ লাইন নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৯ সালে বিতরণ লাইন ছিল ২ লাখ ৬০ হাজার কিলোমিটার, এখন যা বেড়ে ৪ লাখ ৪০ হাজার কিলোমিটারে দাঁড়িয়েছে। মাথাপিছু বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিমাণ ২২০ কিলোওয়াট ঘণ্টা থেকে বেড়ে ৪৩৩ কিলোওয়াট ঘণ্টায় দাঁড়িয়েছে। সাধারণ গ্রাহকের সংখ্যা ১ কোটি ৮ লাখ থেকে বেড়ে ২ কোটি ৮৭ লাখে উন্নীত হয়েছে। কৃষিকাজে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণও বেড়েছে। ২০০৯ সালে ২ লাখ ৩৪ হাজার সেচপাম্প বিদ্যুতে চলতো, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ লাখ ৬১ হাজারে।
২০০৯ সাল থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে সেগুলোর মধ্যে সরকারি খাত থেকে এসেছে ৩২টি। এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ৬০৬ মেগাওয়াট। বেসরকারি খাত থেকে এসেছে ৫৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র; এসব কেন্দ্রের উৎপাদন ক্ষমতা ৪ হাজার ২১৩ মেগাওয়াট।
সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ এসেছে সাশ্রয়ী জ্বালানি গ্যাস থেকে অর্থাৎ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে। এর পরিমাণ ৫ হাজার ১৪৬ মেগাওয়াট। অন্যদিকে প্রায় ৩ হাজার ৬৭০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ এসেছে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে, যা ব্যয়বহুল। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানিতেও সরকারের উদ্যোগ আলোর মুখ দেখতে শুরু করেছে। বর্তমানে ৩ মেগাওয়াটের একটি সৌর বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। শিগগিরই আরও কিছু কেন্দ্র স্থাপনের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।