আন্তর্জাতিক

সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরেই সাংবাদিক খাশোগিকে হত্যায় উদ্বিগ্ন বিশ্ব

স্বদেশ খবর ডেস্ক
তুরস্কের সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যা মারাত্মক ভুল বলে স্বীকার করেছে সৌদি আরব। তবে দেশটি সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান ওই হত্যার নির্দেশ দেননি।
সৌদি আরবের এমন ঘোষণায় দুনিয়াজুড়ে ক্ষোভ ও নিন্দার ঝড় উঠেছে। ১৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো খাশোগিকে হত্যার কথা স্বীকার করে তারা। সৌদি কর্তৃপক্ষের এমন দাবির প্রেক্ষিতে দেখা দিয়েছে তীব্র সন্দেহ, সংশয়।
অন্যদিকে হত্যায় ক্রাউন প্রিন্স জড়িত দাবি করে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন সিনেটর। সিনেটর রিচার্ড ডারবিন বলেছেন, ক্রাউন প্রিন্স এ হত্যায় জড়িত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা উচিত।
জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মার্কেল এ ঘটনার প্রেক্ষিতে সৌদি আরবের কাছে অস্ত্র বিক্রি অনুমোদন করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন।
কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সৌদি আরবের সাথে কয়েক শ’ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা চুক্তি বাতিল করার হুমকি দিয়েছেন।
তবে খাশোগি হত্যার পেছনে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের হাত রয়েছে এমন সকল দাবি নাকচ করে দিয়ে সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আহমেদ আল-জুবেইর বলেছেন, মোহাম্মদ বিন সালমান এ হত্যাকা-ের বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
সৌদি আরবের দাবি, ২ অক্টোবর খাশোগি ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটে প্রবেশ করলে তাকে জেরা করা হয়। এক পর্যায়ে তিনি মারমুখী হয়ে উঠলে মারামারির এক ঘটনায় খাশোগি নিহত হন। প্রশ্ন উঠেছে, তাকে হত্যা করা হলে মৃতদেহ কী করা হয়েছে? কিন্তু সৌদি কর্মকর্তারা বলতে পারছেন না জামাল খাশোগির মরদেহ কোথায় রয়েছে। এতে সৌদি আরবের সর্বশেষ ভাষ্যের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুবেইর বলেন, যারা এই হত্যাকা-ে জড়িত ছিল তারা কেউই ক্রাউন প্রিন্সের ঘনিষ্ঠজন ছিল না। এমনকি সৌদি আরবের গোয়েন্দা সংস্থার উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরাও এ বিষয়ে অবগত ছিলেন না।
তিনি বলেন, তুরস্কের কাছে হত্যাকা-ের অডিও প্রমাণ রয়েছে এরকম দাবি সম্পর্কে তিনি কিছু শোনেননি।
জুবেইরকে খাশোগির মারামারির বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, হত্যার প্রেক্ষাপট এখনো তদন্তাধীন রয়েছে। আমরা বের করার চেষ্টা করছি কনস্যুলেটের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল!
এদিকে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সৌদি প্রেস এজেন্সি জানিয়েছে, খাশোগির ছেলে সালাহর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছেন বাদশাহ সালমান ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান। একইদিনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুবেইরও খাশোগির পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, এটি একটি ভয়াবহ বিয়োগন্তক ঘটনা। আমরা তার পরিবারের দুঃখ উপলব্ধি করতে পারছি। এসময় তিনি খাশোগির পরিবারকে আশ্বস্ত করে বলেন, দুর্ঘটনাবশত একটি বড় ভুল হয়ে গেছে। যারা এ হত্যাকা-ের সঙ্গে যুক্ত ছিল তাদেরকে যথাযথ শাস্তির মুখোমুখি করা হবে।
উল্লেখ্য, সৌদি আরব ১৮ দিন ধরে ইস্তাম্বুলে দেশটির কনস্যুলেটে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যার কথা অস্বীকার করে আসছিল। ১৯ অক্টোবর প্রথমবারের মতো খাসোগি হত্যার কথা স্বীকার করে নেয় দেশটি। এ হত্যার পেছনে তারা যে ব্যাখ্যা দিয়েছে তা বিশ্বনেতারা অগ্রহণযোগ্য বলে অভিহিত করে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়েছেন। এরই মধ্যে সৌদি ভাষ্যও পরিবর্তিত হয়েছে কয়েকবার। প্রত্যেকটি ভাষ্যেই দাবি করা হচ্ছে দেশটির ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান নির্দোষ এবং এ হত্যার পেছনে তার হাত নেই।
এদিকে সাংবাদিক জামাল খাশোগির হত্যাকা-ের বিষয়ে সব সত্য প্রকাশ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যিপ এরদোগান। তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে কোনো রাখঢাক করা হবে না। ইস্তাম্বুলে দেয়া এক ভাষণে এরদোগান বলেন, শিগগিরই দলীয় বৈঠকে তিনি এ বিষয়ে সকল সত্য প্রকাশ করবেন। কেন সৌদি আরব থেকে ১৫ সদস্যের বিশেষ টিম কনস্যুলেটে এসেছিল, সৌদির পক্ষ থেকে এসব বিষয়ে বিস্তারিত আমাদের বলতে হবে।
স্পষ্টতই এতে সৌদি আরবের এই বয়ান হুমকির মুখে পড়েছে। এরদোগান ঘোষণা করেছেন, আমরা খাশোগি হত্যার ন্যায়বিচার চাই। এই তদন্ত সব নগ্ন মিথ্যাচারের খোলস খুলে দেবে। খাশোগি হত্যার প্রেক্ষাপট পুরোপুরি উন্মোচন করা হবে।
জামাল খাশোগিকে ইস্তাম্বুলের সৌদি কনস্যুলেটে হত্যার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নেয়ার পর সৌদি আরবকে শাস্তি দিতে চাপ বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাটরা যুক্তরাষ্ট্রের এই আরব মিত্রের বিরুদ্ধে নানা শাস্তির প্রস্তাব দিয়ে চলেছেন। এর মধ্যে সর্বাত্মক নিষেধাজ্ঞা থেকে অস্ত্র চুক্তি বাতিলও রয়েছে। তবে এসবই নির্ভর করছে খাশোগি হত্যায় মোহাম্মদ বিন সালমানের সংশ্লিষ্টতার ওপরে। তার নির্দেশেই খাশোগিকে হত্যা করা হয়েছে প্রমাণিত হলে সৌদি আরবের সামনে ভয়াবহ সংকট অপেক্ষা করছে।
সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সিনেটর বব করকের বলেন, আমার ধারণা যে, বিন সালমান এ হত্যাকা-ে জড়িত ছিলেন। তিনি এ হত্যাকা- পরিচালনা করেছেন এবং খাশোগিকে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ীই হত্যা করা হয়েছে।
করকের সৌদি আরবের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির সম্মিলিত চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানান।
এছাড়া এনবিসিতে দেয়া সাক্ষাৎকারে সিনেটর রিচার্ড ডারবিন বলেন, সৌদি ক্রাউন প্রিন্স এ হত্যাকা-ে জড়িত থাকলে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি আরবের রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা উচিত।
খাসোগির হত্যা নিয়ে সৌদি বয়ানের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্স। এক যৌথ বিবৃতিতে এ তিন দেশ বলেছে, এ হত্যাকা- কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না। আমরা এর তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।
বিশ্বনেতারা বলছেন, এটি খুবই উদ্বেগের বিষয় যে, একটি দেশের দূতাবাসের অভ্যন্তরে অন্য একটি দেশের একজন নাগরিককে হত্যা করা হবে। এটি কোনোভাবেই মেনে নেয়া যায় না।