প্রতিবেদন

নৌঘাঁটি বিএনএস শেখ মুজিব-এর কমিশনিং অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা : বানৌজা শেখ মুজিব ঘাঁটি জনকল্যাণ ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা রাখবে

মেজবাহউদ্দিন সাকিল : স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে সৃষ্টি হয়েছে বাংলাদেশ নৌবাহিনী, যা স্বাধীনতা-পরবর্তী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারের আমলে নতুন রূপে যাত্রা শুরু করে। আর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার হাত ধরে আধুনিক যুগে প্রবেশ করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১০ বছরের শাসনামলে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নের লক্ষ্যে সরকারের গৃহীত প্রতিরক্ষা নীতিমালা-২০৩০ এর আলোকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উন্নয়নেও ব্যাপক কাজ হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বর্তমানে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে বিশ্বমানের আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের এ ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখতে চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গত ৫ নভেম্বর বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নৌঘাঁটি হিসেবে ‘বিএনএস শেখ মুজিব’-এর কমিশনিং অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী এ নিশ্চয়তা প্রদান করেন।
উল্লেখ্য, রাজধানী ঢাকার খিলক্ষেত এলাকায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে এই প্রথম কোনো নৌঘাঁটির কমিশনিং করা হলো।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানস্থল থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে ঢাকা, খুলনা ও চট্টগ্রামে নৌবাহিনীর ২২টি বহুতল ভবন উদ্বোধন, সাভারে বিএন টাউনশিপের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং স্থানীয় এরিয়া কমান্ডার, নৌবাহিনী কর্মকর্তা এবং তাঁদের সহধর্মিণীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।
সাভারে চীনা কোম্পানি এই বিএন টাউনশিপ নির্মাণ করবে। এর আওতায় ১০টি ২৭তলা এবং ১২টি ২৬তলা অত্যাধুনিক সুবিধা সংবলিত আবাসিক ভবন নির্মিত হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ক্রমবিকাশ এবং জাতি গঠনে তাদের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ নেভি ইন দি টুয়েন্টি ফার্স্ট সেঞ্চুরি’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা বিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিক (অব.), নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল নিজামউদ্দিন আহমেদসহ উর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।
বিএনএস শেখ মুজিবের কমান্ডিং অফিসার মইনুদ্দিন মালিক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট থেকে কমিশনিং ফরমান গ্রহণ করেন।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী নতুন নৌঘাঁটিতে পৌঁছলে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সালাম জানানো হয় এবং জাতীয় সংগীত বাজানো হয়।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে বলেন, বানৌজা শেখ মুজিব ঘাঁটি নিজস্ব অপারেশনাল কর্মকা-ের পাশাপাশি জনকল্যাণ এবং জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলায় বিশেষ ভূমিকা পালন করবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা নৌঅঞ্চলে নৌবাহিনী সদরদপ্তর, একটি ছোট ঘাঁটি ব্যতীত আর কোনো স্থাপনা আগে ছিল না। ২০০৯ থেকে ২০১৮ এই সময়ের মধ্যে এই নৌবাহিনীকে বিভিন্নভাবে আমরা শক্তিশালী করেছি এবং আন্তর্জাতিক মানের উপযুক্ত করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, আমি নৌবাহিনীর সদস্যবৃন্দকে বলবো, নৌবাহিনীতে দীর্ঘদিন যাবৎ মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ স্থাপনা, কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং নাবিকদের আবাসিক ভবন ছিল না। ফলে তীব্র সংকটের মধ্যদিয়ে তাদের দিন যাপন করতে হয়েছে। আজকে এ সমস্যাটির কিছুটা হলেও সমাধান হয়েছে এবং ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা নৌ অঞ্চলে আমরা এ সংক্রান্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছি।
শেখ হাসিনা বলেন, পুনরায় নির্বাচিত হয়ে সরকার গঠন করতে পারলে নৌবাহিনীকে আরো শক্তিশালী করে গড়ে তোলার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী নৌবাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, আমরা চাই যারা আমার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য কাজ করেন, যারা স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের অতন্দ্র প্রহরী, তারা ও তাদের পরিবার যেন সুন্দরভাবে বসবাস করতে পারেন, সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারেন এবং আন্তরিকতার সঙ্গে দেশের জন্য কাজ করতে পারেন। সেই লক্ষ্যে আমার সরকার কাজ করে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চেয়েছিলেন একটি আধুনিক উন্নত বাংলাদেশ গড়তে এবং একটি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের উপযোগী সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তুলতে। তাই তিনি সশস্ত্র বাহিনীর জন্য একটা প্রতিরক্ষা নীতিমালা তৈরি করে দিয়ে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা সে সময়ের কথা স্মরণ করে বলেন, যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ সীমিত অর্থ, একটা টাকাও রিজার্ভ মানি ছিল না, গোলায় ধান ছিল না, তার ওপর এক কোটি মানুষ শরণার্থী, তিন কোটি মানুষ গৃহহারা, লাখো মা-বোন নির্যাতিতা, আহত মুক্তিযোদ্ধা এবং শহীদ পরিবারÑ তাদের পুনর্বাসন এবং একটি বিধ্বস্ত দেশকে গড়ে তোলার মতো কঠিন দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ নৌবাহিনীও গড়ে তোলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকেই এই নৌবাহিনী গড়ে ওঠে। এমনকি ১৯৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু নৌবাহিনীর বৃহত্তম প্রশিক্ষণ ঘাঁটি বানৌজা ঈশা খান কমিশনিং করেন এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে নেভাল এনসাইন প্রদান করেন। একই সময়ে তিনি দেশের সমুদ্রসীমা নির্ধারণের জন্য ১৯৭৪ সালে ‘দি টেরিটোরিয়াল ওয়াটারস অব মেরিটাইম জোনস অ্যাক্ট’ প্রণয়ন করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা চেয়েছেন দেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ করতে এবং আমাদের সশস্ত্র বাহিনীকে আরো আধুনিক করতে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে ২১ বছর পর যখন আমরা সরকার গঠন করি তখন আমাদের নৌবাহিনীর জন্য প্রথম আধুনিক ফ্রিগেট ক্রয় করা হয়। অন্যান্য যুদ্ধজাহাজ এবং আধুনিক সরঞ্জাম সজ্জিত করে একে আধুনিকায়নের পদক্ষেপ আমরা নিয়েছিলাম এবং নৌবাহিনীকে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলারও পরিকল্পনা আমাদের ছিল।
শেখ হাসিনা বলেন, মাত্র ৫ বছর সরকারে ছিলাম। তার মাঝে যতটুকু করা সম্ভব করেছি। এরপর ২০০৯ সালে আবার আমরা যখন সরকারে আসি তখন থেকে নৌবাহিনীর উন্নয়নে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮Ñ এই সময়ের মধ্যেই আজকের নৌবাহিনী একটি বিশ্বমানের আধুনিক বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠেছে।
আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ত্রিমাত্রিক বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশ নৌবাহিনী গড়ে উঠায় শেখ হাসিনা এই বাহিনীকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন করবো ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে। ২০২০ সালে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী, আর আমরা ২০২০ থেকে ২০২১ পর্যন্ত সময়কে ‘মুজিব বর্ষ’ ঘোষণা দিয়েছি। এরই মধ্যে বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে গড়ে উঠবে ইনশাআল্লাহ। আর ২০৪১ সালে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ায় উন্নত দেশ।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, বাংলাদেশ উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে এগিয়ে যাবে সেই সঙ্গে আমাদের নৌবাহিনীও আরো আধুনিক ও শক্তিশালী হবে।
শেখ হাসিনা বলেন, এ নৌবাহিনীর কথা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৬ দফাতেও উল্লেখ ছিলÑ নৌবাহিনীর ঘাঁটি এই বাংলার মাটিতেই হতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা একটা পূর্ণাঙ্গ ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনী গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছি এবং নৌবাহিনীর সদস্যদের আর্থসামাজিক সমস্যা মেটানোসহ তাদের জন্য কল্যাণমূলক কাজ, যা যা করা দরকার তা করতে সমর্থ হয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নৌবাহিনীর প্রতিটি সদস্যের জীবনমানের উন্নয়ন কামনা করে যেসব স্থাপনা করা হয়েছে সেগুলো রক্ষণাবেক্ষণে সকলের প্রতি যতœবান হওয়ার আহ্বান জানান।