রাজনীতি

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ: অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে সবাইকে অংশগ্রহণের আহ্বান শেখ হাসিনার

নিজস্ব প্রতিবেদক : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন সংলাপের জন্য অক্টোবরের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবর চিঠি পাঠান। চিঠি পাওয়ার পরপরই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসবেন বলে জানিয়ে দেন। সেই সঙ্গে অপরাপর দল ও জোটের সঙ্গেও সংলাপ হবে বলেও জানিয়ে দেয়া হয়। সে মতে ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারি বাসভবন গণভবনে ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সংলাপে বসে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
১ থেকে ৭ নভেম্বর ২৫টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপে বসে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। ৭ নভেম্বর ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা সংলাপের পর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব সংলাপ শেষ হয়।
নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯টি হলেও সব মিলিয়ে ৫১টি রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে নির্বাচনি সংলাপ করেন শেখ হাসিনা। এর মধ্যে ড. কামালের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্ট এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, ১৪ দলীয় জোটের শরিক দল ও বেশ কয়েকটি ইসলামি দলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপ ছিল উল্লেখযোগ্য।
গত ১ নভেম্বর আওয়ামী লীগ ও ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে অনুষ্ঠিত প্রথম দফা সংলাপে কার্যকর কিংবা বিশেষ কোনো সমাধান না আসায় ঐক্যফ্রন্টের আগ্রহেই ৭ নভেম্বর দ্বিতীয় দফা সংলাপ হয়। সীমিত পরিসরে আবারও সংলাপ চেয়ে ৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন। এতে সাড়া দেন প্রধানমন্ত্রী। দ্বিতীয় দফা সংলাপেও সরকারি দলের পক্ষে নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা।
আনুষ্ঠানিক সংলাপ শেষে প্রধানমন্ত্রী বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে। ৮ নভেম্বর রাতে গণভবনে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় তিনি এ মন্তব্য করেন।
একাদশ সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে ১ নভেম্বর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিভিন্ন মত ও পথের প্রায় ৫১টির মতো জোট ও দলের সঙ্গে ধারাবাহিক সংলাপ করেন আওয়ামী লীগ নেতারা।
জানা গেছে, ৮ নভেম্বর সন্ধ্যায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার তফসিল ঘোষণার পর আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে তার সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ, আবদুর রহমান, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, ব্যারিস্টার মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন। অন্যদের মধ্যে ছিলেন ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন ও সাধারণ সম্পাদক গোলাম রব্বানী।
বৈঠকে উপস্থিত কয়েকজন নেতা বলেন, আপা (প্রধানমন্ত্রী) বলেছেন, সংলাপ ফলপ্রসূ হয়েছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে।
বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্টের কোনো দাবি মানা ছাড়াই সংলাপ কিভাবে ফলপ্রসূ হলো সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ওই নেতারা বলেন, অপেক্ষা করুন, দেখতে পাবেন।
নির্বাচন পেছানোর বিষয়ে বিএনপির দাবির বিষয়ে জানতে চাইলে ওই নেতারা বলেন, বিএনপি ২৩ ডিসেম্বরের বদলে ৩০ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানিয়েছে। এটা মানা যায়। এক সপ্তাহ পেছালে যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সবাই নির্বাচনে আসে তা হলে তো ভালো। তবে এটা একান্তই নির্বাচন কমিশনের বিষয়। নির্বাচন কমিশন চাইলে নির্বাচন এক সপ্তাহ পেছাতে পারে। তবে কোনোভাবেই তফসিল আর পেছানোর সুযোগ নেই। এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র নির্বাচন কমিশনের। আওয়ামী লীগের এখানে কিছুই করার নেই। তবে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগ চায়, সব দল নির্বাচনে অংশ নিক, নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হোক।
১ নভেম্বরের প্রথম দফা সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাধারণ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে বলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের আশ্বস্ত করে বলেন, সরকার নির্বাচনে কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না। গণভবনে ১৪ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আমরা অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আশ্বাস দিচ্ছি। এ ব্যাপারে নির্বাচন কমিশন স্বাধীন ও কর্তৃত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের বলেছেন, নির্বাচন কমিশনে সরকার কোনো প্রকার হস্তক্ষেপ করবে না; বরং নির্বাচন কমিশন যদি চায় তাহলে সহযোগিতা করা হবে।
সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন প্রসঙ্গে কোনো আলোচনা হয়েছে কিনা সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ড. কামাল হোসেনকে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর চিঠির উত্তরে একটা বিষয় লেখা ছিল গণতন্ত্রের স্বার্থে সংবিধানসম্মত সব বিষয়ে আলোচনা হবে। পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশে নির্বাচনের আগে সংসদ ভেঙে দেয়া হয় না। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশেও নির্বাচনের সময় সংসদ বহাল থাকে। তফসিল ঘোষণার পর আইন প্রয়োগকারী সংস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগ নির্বাচন কমিশনের অধীনে চলে যায়। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিএনপি তথা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টকে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন।
ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘অত্যন্ত খোলামেলা পরিবেশে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সাথে প্রধানমন্ত্রীর কথা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্ট নেতারা যে যা বলতে চেয়েছেন, তা নির্দ্বিধায় বলেছেন। একেকজন তিন-চার বার করেও বক্তব্য রেখেছেন। কেউ তাদের বাধা দেননি। নেত্রী তাদের বক্তব্য মনোযোগ দিয়ে শুনেছেন। তাদের কিছু অভিযোগ ছিল, আমরা ভদ্রোচিতভাবে এগুলোর জবাব দিয়েছি। আমাদের সিনিয়র নেতারাও এ সময় বক্তব্য রেখেছেন।’ তিনি বলেন, আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। কিছু কিছু বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি। প্রধানমন্ত্রী তাদের পরিষ্কার বলে দিয়েছেন সভা, সমাবেশ ও মতপ্রকাশে কোনো বাধা দেয়া হবে না।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক বলেন, ঐক্যফ্রন্টের আরেকটি দাবি ছিল বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন এ ব্যাপারেও তাঁর কোনো আপত্তি নেই।
অপর এক প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) বিষয়ে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা এই প্রযুক্তির ব্যবহারকে সমর্থন করি। তবে নির্বাচন কমিশন আগামী নির্বাচনে সীমিত আকারে ইভিএম ব্যবহার করবে।
সংলাপে রাজনৈতিক মামলার ব্যাপারে ড. কামাল হোসেন এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আপনারা রাজনৈতিক মামলাগুলোর তালিকা দিন। তারা সেই তালিকা দিয়েছে এবং সে অনুযায়ী যথারীতি কাজ চলছে বলেও জানান ওবায়দুল কাদের।
এদিকে ধারাবাহিক সংলাপের অংশ হিসেবে গত ৫ নভেম্বর শেখ হাসিনার সাথে সংলাপে বসে সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টি (জাপা)। গণভবনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে এই সংলাপে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন সম্মিলিত জাতীয় জোটের ৩৩ জন নেতা অংশ নেন। সংলাপ শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংয়ে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী সঙ্গে সংলাপে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসইেন মুহম্মদ এরশাদ খুশি। তিনি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন করার ইচ্ছা ব্যক্ত করে আওয়ামী লীগের সাথে জোটবদ্ধ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন এবং বলেছেন, আসন্ন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার না করাই ভালো। তবে বিএনপি নির্বাচনে না এলে এরশাদের জাতীয় পার্টি এককভাবে ৩০০ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিকল্পধারা বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন জোট যুক্তফ্রন্টের মধ্যকার সংলাপ হয় ২ নভেম্বর। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপের অংশ হিসেবে ২ নভেম্বর সন্ধ্যায় এই সংলাপ শুরু হয়। এর পরপরই সংলাপের বিষয় নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাজির হন বিকল্পধারার প্রেসিডেন্ট এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, সংলাপে তিনি সুনির্দিষ্ট দাবি-দাওয়া উপস্থাপন করেছেন। সরকারি দলের পক্ষ থেকে এসব দাবি পূরণের আশ্বাস দেয়া হয়েছে।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী আরো বলেন, তার দেয়া দাবিগুলো পূরণ হলে বর্তমান সংবিধানের মধ্যে থেকে শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাবে যুক্তফ্রন্ট।
বদরুদ্দোজা চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে শুরু হওয়া সংলাপের সূচনা বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে চায়। জনগণ যেন তাদের নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে, সেটাই তাদের লক্ষ্য। কিভাবে সেই নেতৃত্ব খুঁজে নিতে পারে, তাই এখন মূল বিষয়। গণভবনে আসার জন্য যুক্তফ্রন্টের নেতাদের স্বাগত ও ধন্যবাদও জানান প্রধানমন্ত্রী।

শেষ কথা
মাসখানেক আগেও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সংলাপের দাবি উড়িয়ে দিয়েছিলেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। তারা সোজা বলেছিলেন, কোনো ব্যক্তি বা দলের সাথে কোনো আলোচনা হবে না, বরং সংবিধান অনুযায়ী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচন হবে। তবে অক্টোবরের শেষ দিকে ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপের আগ্রহ ব্যক্ত করে চিঠি দিলে এবং শেখ হাসিনা তাতে সম্মতি জানানোর পরই সংলাপের অর্গল ভেঙে যায়। শুরু হয় বিএনপির সঙ্গে আওয়ামী লীগের বহুকাক্সিক্ষত সংলাপ। সংলাপে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়ে সব রাজনৈতিক দলকে একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার আহ্বান জানান। প্রধানমন্ত্রীর এই আহ্বানে সাড়া দেয় বিএনপি। দলটি ১১ নভেম্বর নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। দেশবাসী মনে করছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে সাড়া দিয়ে বিএনপিসহ সব রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়ায় সংলাপ হয়েছে অর্থবহ এবং এই অর্থবহ সংলাপের পথ ধরেই সব দলের অংশগ্রহণে ২৩ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।