প্রতিবেদন

আসনবণ্টন ইস্যুতে গৃহবিবাদের আশঙ্কায় শঙ্কিত-দ্বিধাবিভক্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি

মেহেদী হাসান : সর্বশেষ ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি দলটি। ফলে টানা ১০ বছর জাতীয় নির্বাচনের বাইরে ছিল বিএনপি।
৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা-না-করা নিয়ে দলটির মধ্যে প্রচ- দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ইত্যাদি দাবিতে তারা এবারও নির্বাচন বয়কটের চিন্তাভাবনায় ছিল। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দলটির জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সফল সংলাপের মধ্য দিয়ে বিএনপির নির্বাচনে অংশ না নেয়ার শঙ্কা কেটে যায়। শেষ পর্যন্ত খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অধীনেই নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি।
এরই মধ্য দিয়ে প্রায় ১০ বছর পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে মাঠে নেমেছে বিএনপি। প্রার্থীদের সাাৎকার, জোট ও ফ্রন্টের সাথে আসন ভাগাভাগি আর প্রস্তুতি নিয়ে দলের নেতারা পার করছেন ব্যস্ত সময়। সারাদেশের বিএনপি নেতারা এখন ঢাকায়। সাথে আছেন তাদের কর্মীবাহিনীও। অপো করছেন প্রার্থীতালিকার চূড়ান্ত ঘোষণার। এ মুহূর্তে দলের গুলশান অফিসের সামনে রীতিমতো জনসমুদ্র। সেখানে উৎসবের আবহ। তবে আসনবণ্টন নিয়ে আছে নানা অভিযোগও। বিশেষ করে ঐক্যফ্রন্টের নেতা ড. কামাল-রব-মান্নারাই বিএনপির কাছে দুই শতাধিক আসন দাবি করেন। এর বাইরে কাদের সিদ্দিকী চেয়েছেন ২০টির মতো আসন এবং ২০ দলীয় জোটের শরিক জামায়াত ও এলডিপিসহ অন্যরা আরো শতাধিক আসন দাবি করেÑ এ নিয়ে সংকট নয় বরং মহাসংকটে রয়েছে বিএনপি। বিএনপির ক্ষুব্ধ এক নেতা স্বদেশ খবরকে বলেন, শরিকরা ধানের শীষে ভোট করবেন এবং তারা সবাই তিনশতাধিক আসন দাবি করছে; অর্থাৎ ভোটে কি বিএনপির কোনো প্রার্থী থাকবে না? তাই এখন আওয়ামী লীগ নয়, ঐক্যফ্রন্ট ও শরিক দলের নেতাদেরই প্রধান প্রতিপক্ষ ভাবছে বিএনপির অনেক নেতা। দলটির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, বিএনপি নেতাদের বঞ্চিত করে নিশ্চিত জয়ী হওয়া আসনগুলো ছেড়ে দেয়া হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীদের। দীর্ঘকাল পর ভোটে আসার কারণে বিএনপিতে এবার প্রার্থীর ছড়াছড়ি। রেকর্ডসংখ্যক সাড়ে ৪ হাজার দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি হয়েছে এবার। এদের সবাই নিজেকে যোগ্য প্রার্থী মনে করেন। সবাই দাঁড়াতে চান নির্বাচনে। এমপি হতে চান। কেউ কেউ প্রকাশ্যেই বলছেনÑ ধানের শীষ না পেলেও নির্বাচন করবেন। এই অবস্থায় বিএনপির দুশ্চিন্তা এখন ‘বিদ্রোহী’ সামলানো নিয়ে এবং ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আসন বিনিময় নিয়ে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নানা কারণে এবার বিএনপির প্রার্থী সংখ্যা যেমন বেশি তেমনি বিদ্রোহ দেখা দেয়ার সম্ভাবনাও বেশি। চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লন্ডনে। প্রার্থীদের বিদ্রোহ সামাল দেয়াটা সেজন্যই এবার বেশ কঠিন হতে পারে।
তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিষয়টি মাথায় রেখে প্রার্থীদের সাাৎকার গ্রহণের সময় কিছু পদপে নিয়েছে বিএনপি, যা শেষ পর্যন্ত কাজে লাগতে পারে বিদ্রোহ নিরসনে। এক সঙ্গে একটি আসনের সব প্রার্থীকে ডেকে সেখানে তারেক রহমান তাদের কিছু নির্দেশনা দেন এবং অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি আদায় করেন। এর অন্যতম হচ্ছে দল যাকে প্রার্থী করবে তার পে সবাইকে কাজ করতে হবে। যদি তার ব্যত্যয় ঘটে তবে দল থেকে আজীবন বহিষ্কার করা হবে। প্রার্থীরা দলীয় মনোনয়ন বোর্ডকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তার পে তারা সবাই সম্মিলিতভাবে কাজ করবেন।
সূত্র জানায়, একটি নির্বাচনি আসনে বিএনপির যতজন মনোনয়ন ফরম কিনেছেন তাদের সবাইকে একসঙ্গে পার্লামেন্টারি বোর্ডের বৈঠক রুমে ডাকা হয়েছে। সেখানে তাদের নির্বাচনি প্রস্তুতি ও দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এতে ভিডিও কনফারেন্স সিস্টেমে তারেক রহমানের সক্রিয় উপস্থিতি ছিল। ওই দিকনির্দেশনায় বলা হয়েছে, এই নির্বাচন চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনেরই একটি অংশ। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে লড়াইয়ে জেতা যাবে না। কোনোভাবেই যেন স্থানীয় নেতাকর্মীদের ঐক্যে ফাটল না ধরে। সবাই দলীয় প্রার্থীকে জেতাতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করবেন। দলীয় মনোনয়ন নিয়ে এলাকায় যেন কোনো কোন্দল না হয়, সে বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
দলীয় মনোনয়ন বোর্ডের নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছে, সরকারি দলকে এবার ফাঁকা মাঠে খেলতে দেয়া যাবে না। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো আরেকটি নির্বাচন হবে না। শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের মাঠে থাকতে হবে।
ভোটের দিন হাল ছাড়া যাবে না। যেকোনো মূল্যে ভোট কেন্দ্র পাহারা দিতে হবে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতিও রাখতে হবে।
এ প্রসঙ্গে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, আমাদের দলে কোনো কোন্দল বা বিদ্রোহের আশঙ্কা নেই। সবাই দলের নির্দেশ মানতে অঙ্গীকার করেছেন। এই নির্বাচনকে শুধু নির্বাচন নয়, এটাকে আমরা আন্দোলন হিসেবে নিয়েছি।
মির্জা ফখরুল বলেন, হাত-পা বাঁধা অবস্থার মধ্যেও আমাদের এগুতে হবে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোট কেন্দ্রে আসতে হবে। জনগণের শক্তি দিয়ে অবাধ নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে হবে। প্রতিরোধ তৈরি করতে হবে। এটা বাঁচা-মরার সংগ্রাম। নির্দেশনায় আরো বলা হয়েছেÑ আর পালিয়ে থাকার সময় নেই। আপনারা পালিয়ে না থেকে এবার গ্রামে যান। মানুষের সঙ্গে কথা বলুন। সরকারের দুঃশাসনের কথা মানুষকে জানান।
বলা বাহুল্য, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বিএনপির পার্লামেন্টারি বোর্ডের সদস্যদের দিকনির্দেশনা অনেকটাই চাপা পড়ে যাচ্ছে ২০ দলীয় জোট ও ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আসনবণ্টন ইস্যুতে।
আসলে বিএনপি এবার ভোটে যাচ্ছে দুই পাশে দুই জোট নিয়ে। একদিকে তাদের পুরনো সঙ্গী ২০ দলীয় জোট, অন্যপাশে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট। দুই জোট নিয়েই সমস্যায় আছে বিএনপি। জোটের নামসর্বস্ব দলও বিএনপির নিশ্চিত আসনটি দাবি করছে। এতে করে সঙ্গত কারণে ওই আসনের বিএনপির জনপ্রিয় প্রার্থী ও তার অনুসারীরা ক্ষুব্ধ হচ্ছেন। দিন যত যাচ্ছে এই সমস্যা গৃহবিবাদে রূপ নিচ্ছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দলটির এই গৃহবিবাদ কতটা প্রকট আকার ধারণ করে তা নিয়ে শঙ্কিত ও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি।