প্রতিবেদন

একাদশ জাতীয় নির্বাচন-২০১৮: জমজমাট ভোটযুদ্ধে জোট-মহাজোটের বাইরে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগ-বিএনপি

বিশেষ প্রতিবেদক
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জমজমাট ভোটযুদ্ধ শুরু হয়েছে। এতে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্ট জোট এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট ও যুক্তফ্রন্ট। এই নির্বাচনকে জোট-মহাজোটের বাঁচা-মরার লড়াই বলা হলেও নির্বাচনে আসলে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। দেশের মানুষও মনে করে, আগামী ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় নির্বাচনের পর হয় আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটই নিশ্চিতভাবে ক্ষমতাসীন হবে।
এখন আসনবণ্টন নিয়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটে চলছে শেষ মুহূর্তের দর কষাকষি। বড় দলগুলো চাচ্ছে কত কম আসন ছাড় দিয়ে ছোট দলগুলোকে সঙ্গে নেয়া যায়। আর ছোট দলগুলো চাচ্ছে সর্বোচ্চ সুযোগ। এ অবস্থায় আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়াকে কেন্দ্র করে ঘরে-বাইরে ত্রিমুখী সংকটে পড়েছে শাসক দল আওয়ামী লীগ এবং প্রধান বিরোধী প বিএনপি। শরিক আর নিজ দলের নেতাদের খুশি করার পাশাপাশি দলের ভেতরের কোন্দল দমন করে ৩০০ আসনে একক প্রার্থী ঘোষণা করাই বড় এই দল দুটির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এেেত্র মতাসীন দল আওয়ামী লীগ রয়েছে কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে। নির্বাচনি আদর্শিক জোট ১৪ দলে আসনবণ্টন নিয়ে তেমন কোনো চাপ নেই আওয়ামী লীগের হাইকমান্ডের ওপর। তবে প্রধান শরিক জাতীয় পার্টি এবং নতুন জোটে আসা অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন যুক্তফ্রন্টের চাহিদা মেটাতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছে মতাসীন দলটিকে। অন্যদিকে শক্তিশালী প্রার্থী না থাকলেও নিবন্ধন বজায় রাখার স্বার্থে ১৪ দলের কিছু শরিক দলের একটি করে হলেও আসন দাবি এবং কিছু ইসলামি দলের বেশ কয়েকটি আসনের দাবি নিয়ে খুব একটা স্বস্তিতে নেই দলটি। তবে আওয়ামী লীগ একাদশ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে জোটের শরিকদের ৬০ থেকে ৬৫ আসন ছেড়ে দিতে নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অন্যদিকে আসনবণ্টন নিয়ে চরম বেকায়দায় রয়েছে বিএনপি। ঐক্যফ্রন্টের অন্যান্য শরিক দল এবং ২০ দলীয় জোটের বিপুল চাহিদা নিয়ে লেজেগোবরে অবস্থা হয়েছে দলটির নীতিনির্ধারকদের। তাছাড়া বিএনপির শীর্ষ নেতা খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে বেশ সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছে দলটি।
একদিকে একেকটি আসনের বিপরীতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী প্রায় ১৫ জন করে। অন্যদিকে শরিক দলগুলোর দেড় শতাধিক আসনের চাহিদা মেটাতে গিয়ে চরম বেকায়দায় পড়তে হয়েছে দলটিকে। কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় দিতে নারাজ। দলটির আশঙ্কা, শরিকদের বিপুল চাহিদা মেটাতে গিয়ে দলের চেইন অব কমান্ডই ভেঙে পড়তে পারে। বিপুলসংখ্যক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছে বিএনপি। সবকিছু সামাল দিয়ে একক প্রার্থী ঘোষণা বিএনপির সামনে পাহাড়সমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। বিএনপিও আওয়ামী লীগের কৌশল অনুযায়ী শরিকদের ৬০ থেকে ৬৫ আসন ছেড়ে দিয়ে জোটকে খুশি রাখতে চায়। জানা গেছে, সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক দলগুলোর চাহিদা বেড়েছে। গত সংসদ নির্বাচনে সব মিলিয়ে ৬০ থেকে ৭০টি আসন ছাড় দেয়া হয়েছিল। এবার শুধু জাতীয় পার্টিই ৬০-৭০ আসনে তাদের প্রার্থীর তালিকা দিয়েছে। যুক্তফ্রন্ট দিয়েছে অর্ধশতাধিক প্রার্থীর তালিকা। জোটের শরিক দল জাতীয় পার্টি-জেপি, তরিকত ফেডারেশন, গণতন্ত্রী পার্টি, ন্যাপসহ বিভিন্ন জোটের বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে তাদের চাহিদার কথা জানিয়েছে আওয়ামী লীগকে। সব মিলিয়ে দেড় শতাধিক আসন চাচ্ছে শরিকরা। জোটের শরিকদের চাহিদা মেটাতে গেলে আওয়ামী লীগকে নিজ দলের প্রার্থীদের নিবৃত্ত করতে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।
জানা যায়, আওয়ামী লীগের দখলে থাকা বেশকিছু আসনও দাবি করছে শরিক দলগুলো। অন্যদিকে যেসব আসনে শরিক দলের প্রার্থী আছেন সেসব আসনেও আওয়ামী লীগের নেতারা মনোনয়ন পেতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছেন। সবকিছু সামাল দিয়ে সবার নিকট গ্রহণযোগ্য প্রার্থী ঘোষণা করাই আওয়ামী লীগের সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ইতোমধ্যে দলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত করেছে আওয়ামী লীগ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজস্ব টিম, দলীয় জরিপ, কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থার একাধিক জরিপের ভিত্তিতেই সারাদেশে প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। আর সেই জরিপের ভিত্তিতেই জোটের শরিকদেরও আসন ছাড় দেবে আওয়ামী লীগ। আগামী নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েই এবার কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায় না আওয়ামী লীগ। এ কারণে যেসব আসনে শরিক দলের শক্তিশালী প্রার্থী রয়েছে, বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে শুধু সেসব আসনেই ছাড় দেবে দলটি। জোটের স্বার্থ বিবেচনা করতে গিয়ে বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা নেই এমন কোনো প্রার্থীকে কোনোভাবেই ছাড় দেবে না আওয়ামী লীগ।
অপরদিকে একদিকে ঐক্যফ্রন্ট ও আরেক দিকে ২০ দলীয় ঐক্যজোটের শরিকদের সঙ্গে আসনবণ্টন নিয়ে বিএনপি হিমশিম খাচ্ছে। এ নিয়ে চলছে দফায় দফায় মিটিং-সিটিং। কিন্তু সহজ সমাধান মিলছে না। একদিকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও অন্যদিকে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক মিত্র জামায়াতসহ ২০ দলীয় জোট। কাউকেই অখুশি করতে চায় না বিএনপি। আবার এমন কিছু আসন রয়েছে যেখানে অন্য দলকে ছাড়ও দেয়া যায় না। তবে জোটের সব দল ধানের শীষ মার্কায় নির্বাচন করায় বিএনপি হাইকমান্ড আসনবণ্টনে অনেকটাই ছাড় দিচ্ছে। তারপরও জোটের শরিক দলগুলোর সঙ্গে দর কষাকষি করে যত বেশি আসন বিএনপির জন্য রাখা যায়, সে চেষ্টা চলছে। প্রথমে ২৬০ আসনে নির্বাচন করার বিষয়ে অটল থাকলেও এখন আরও কিছু আসন ছাড় দেয়ার বিষয়ে নমনীয় অবস্থানে রয়েছে বিএনপি।
আসলে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি একই ধরনের সমস্যায় নিপতিত। নির্বাচনের বহু আগে থেকে নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার জন্য দল দুটি যে জোট-মহাজোট গঠন করেছিল, সেই জোট-মহাজোটই এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপির জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই সমস্যা দেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের জন্য অনেকটাই অম্লমধুর সমস্যা। ভোটের আগে হয়ত বড় দুই দলের এই সমস্যা মিটে যাবে; কিন্তু এতে যে বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে তা হলো যতই জোট-মহাজোট গঠন হোক, বাংলাদেশের রাজনীতি কিন্তু আবর্তিত হয় আওয়ামী লীগ-বিএনপিকে ঘিরেই।