প্রতিবেদন

দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের রেকর্ড সৃষ্টি করতে চান সিইসি

নিজস্ব প্রতিবেদক
নতুন প্রোপটে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করার জন্য রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা বলেছেন, দলীয় সরকারের অধীনে থেকে যে সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব এবারের নির্বাচন সেই ইতিহাস সৃষ্টি করবে।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গত ১৩ নভেম্বর রিটার্নিং কর্মকর্তাদের ব্রিফিং অনুষ্ঠানে সিইসি কে এম নুরুল হুদা প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে, তাতে আমরা খুশি হয়েছি। সকলের সহযোগিতায় আমরা একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করতে চাই।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উদ্দেশে সিইসি বলেন, ‘আপনারা দেশি-বিদেশি সকল স্তরের সংস্থার পর্যবেণে রয়েছেন। এ বছর নির্বাচনের পরিবেশ হবে ভিন্ন। আমাদের দেশে কখনো সাধারণ নির্বাচন হয়েছে রাষ্ট্রপতির অধীনে, কখনো সেনাবাহিনী, কখনো কেয়ারটেকারের অধীনে। কিন্তু অন্যান্য নির্বাচন থেকে এই নির্বাচন সম্পূর্ণ ভিন্ন। কারণ সংসদ ও সরকার বহাল রেখে এই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৪ সালে এমন একটি নির্বাচন হয়েছিল; কিন্তু সেই নির্বাচনে সব দল অংশ নেয়নি। আমরা আনন্দিত যে, এবার নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশ নিতে যাচ্ছে। সে কারণে আপনাদের দায়িত্বও অনেক বেড়ে গেছে এবং ভেজালমুক্ত নির্বাচন অনুষ্ঠানে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে।
এখন থেকে নির্বাচনের সকল দায়িত্ব রিটার্নিং কর্মকর্তাদের উল্লেখ করে সিইসি বলেন, নির্বাচন হতে হবে সম্পূর্ণ অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে। ভোট একটি উৎসব। ভোটের দিন ভোটাররা আনন্দমুখর পরিবেশে ভোট দিতে যাবে। সবাই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।
ভোট প্রদান ক ছাড়া বাকি সব স্থানে পর্যবেকসহ সবাই যেতে পারবেন এবং তা পর্যবেণ করতে পারেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে নির্বাচন জনগণ গ্রহণ করবেন, যে নির্বাচন সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য হবেÑ সেটিই হবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। এই অবস্থা রিটার্নিং কর্মকর্তার সৃষ্টি করতে হবে। কিভাবে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা নিয়োগ করবেন, ভোটক তৈরি করবেন সব দায়িত্ব আপনাদের। সবাই আন্তরিকভাবে নির্বাচন পরিচালনা করলে সামগ্রিকভাবে আমাদের ওপর জনগণের সন্দেহ থাকবে না।
প্রার্থী ও রাজনীতিবিদদের সাথে সুসম্পর্ক রাখার নির্দেশ দিয়ে সিইসি বলেন, অনেকেই এমপি ছিলেন, অনেকে যারা এমপি ছিলেন না তারা এলাকায় সম্মানিত ব্যক্তি। তাদের সাথে যদি সুসম্পর্ক রাখেন, তাহলে কেউই নির্বাচনে সমস্যা সৃষ্টি করবেন না। তাদেরকে কখনো প্রতিপ হিসেবে নেবেন না। তাদের সহযোগিতা করলে তারাও আপনাদের সহযোগী বন্ধু হিসেবে কাজ করবে। বিরোধিতা করবে না। নিরপেতা হবে একমাত্র মাপকাঠি।
সকল ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে থেকে নিরপেভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়ে সিইসি কে এম নুরুল হুদা বলেন, আপনাদের কারণে নির্বাচন কমিশনের যাতে বদনাম না হয় সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে।
রিটার্নিং কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের এক সপ্তাহ পর ২২ নভেম্বর প্রধান নির্বাচন কমিশনার কেএম নুরুল হুদা নির্বাচন কমিশনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানে সিইসি জানান, একাদশ জাতীয় নির্বাচন উপলে এবার ১৫ দিন আগেই সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন করা হবে। প্রাথমিক অবস্থায় তারা জেলা পর্যায়ে ছোট ছোট টিমে বিভক্ত হয়ে পুলিশের সঙ্গে কাজ করবে। ১৫ ডিসেম্বরের পর সশস্ত্র বাহিনীর ছোট ছোট দল পুলিশের সঙ্গে দেখা করবে। সশস্ত্র বাহিনীর ছোট টিম প্রতিটি জেলাতেই থাকবে। এদের নিয়ে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। তাদের যাতায়াতের ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। অন্যান্য বাহিনী ও ম্যাজিস্ট্রেটকে তথ্য দিয়ে সহায়তা করতে হবে।
বৈঠকে সিইসি উল্লেখ করেন, নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রার্থিতা প্রত্যাহরের পর আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক চূড়ান্ত বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক বিশেষ অনুষ্ঠানে শৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর প্রতি আরও ১২ দফা নির্দেশনা প্রদান করা হয়।
সিইসি এ সময় পুলিশ বাহিনীর কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপে নির্বাচন আয়োজনে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। পুলিশ প্রশাসনের কারণে নির্বাচন যেন প্রশ্নবিদ্ধ না হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
অনুষ্ঠানে পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে প্রধান নির্বাচন কমিশনার তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট গ্রহণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহ না করার নির্দেশ দিয়ে বলেন, যদি কোনো তথ্য জানার প্রয়োজন হয় গোপন সূত্র থেকে তা সংগ্রহ করতে হবে।
তিনি ইসিতে বিএনপির জমা দেয়া মামলার তালিকা সম্পর্কে বলেন, বিএনপি যেসব তালিকা দিয়েছে তা অধিকাংশই ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে করা মামলা।
এ সময় তিনি পুলিশ বাহিনীর উদ্দেশে তফসিল ঘোষণার পর কাউকে যাতে হয়রানি বা মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার করা না হয় সে বিষয়ে সতর্ক দৃষ্টি দেয়ার নির্দেশনা দেন। সিইসি আরও বলেন, আইনশৃঙ্খলার বিভিন্ন পর্যায়ের তথ্য একমাত্র পুলিশের কাছেই থাকে। তাই বিভিন্ন বাহিনী পুলিশের কাছ থেকেই পরামর্শ নেবে। পুলিশকে এখনই কৌশলগত পরিকল্পনা তৈরি করতে হবে।
বৈঠকে সিইসি নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা নিয়েও কথা বলেন। পুলিশের উদ্দেশে তিনি বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা রোধ করা ঐতিহ্যগতভাবেই আপনাদের দায়িত্ব। এবারও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আপনারা দায়িত্ব পালন করবেন। সংবিধানমতে কর্তৃত্ব নয়, বিবেকমতো কাজ করতে হবে। নির্বাচন যেন কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব পালনে পূর্ণ স্বাধীনতা থাকবে। তবে নির্বাচন কমিশন তা নজরদারি করবে। নির্বিঘেœ দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভালোভাবে যাচাই না করে কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে না। আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।
বৈঠকে সিইসি পুলিশ বাহিনীকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের তথ্য সংগ্রহ করতে নিষেধ করেন। বলেন, এটা আমরা চাই না। তফসিল ঘোষণার পর কাউকে বিনা ওয়ারেন্টে গ্রেপ্তার করা যাবে না। কারও বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক রাজনৈতিক মামলা করা যাবে না।