ফিচার

বাংলার লোকগানের সঙ্গে ইউরোপ ও পারস্যের মেলবন্ধন : চতুর্থ আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের সফল সমাপ্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক : বাংলার লোকগানের সঙ্গে ইউরোপ ও পারস্যের মেলবন্ধনের মধ্য দিয়ে চতুর্থ আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসবের সফল সমাপ্তি ঘটেছে। ১৫ নভেম্বর শুরু হয়ে উৎসব শেষ হয় ১৭ নভেম্বর। সান কমিউনিকেশন্স এবং সান ফাউন্ডেশন-এর উদ্যোগে আয়োজিত আন্তর্জাতিক লোকসংগীতের এবারের উৎসবে বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৭টি দেশ থেকে ১৭৪ জন লোকসংগীত শিল্পী অংশ নেন।
আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টের শেষ দিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্পেনের চার তরুণীর ব্যান্ড ‘লাস মিগাসের’ পরিবেশনা। দলটি স্পেনের ফেমেনকো আর মেডিটোরিয়ান ধারার সুরের অপূর্ব সংমিশ্রণ ঘটিয়েছে তাদের গানে। গায়িকা বেগো সালাজার, গিটারিস্ট মারতা রবলেস, ভায়োলিন বাদক রোজার লসকস ও পারকাশানিস্ট তাবা ফেমেনেকো, জ্যাজ সংগীতে নিজস্ব ঢংয়ে সংগীত পরিবেশন করেন। তাদের পরিবেশনা ঢাকার দর্শকদের সংগীতের নতুন স্বাদ দিয়েছে।
উৎসবের শেষ দিনে আরেক আকর্ষণ ছিল পাকিস্তানের শাফকাত আমানাত আলী। ওস্তাদ আমানাত আলী খাঁর পুত্র শাফকাত প্রথমে আলোচনায় আসেন তার ব্যান্ড ফিউজনের মাধ্যমে। ‘আখোঁ কি সাগার’, ‘খামাজ’, ‘তেরে বিনা’ গানগুলো বেশ জনপ্রিয় হয়। পাটিয়ালা ঘরানার এই গায়ক পরে মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক প্লেব্যাক করেছেন। ‘মিতওয়া’, ‘বিন তেরে’সহ অসংখ্যা জনপ্রিয় গান তিনি উপহার দিয়েছেন। ফোক ফেস্টের শেষ দিনে শেষ পারফর্মার হিসেবে তার জনপ্রিয় সব গান গেয়ে দর্শক মাতিয়ে তোলেন শাফকাত আমানাত আলী।
উৎসবের শেষ দিনে আরও সংগীত পরিবেশন করে বাংলাদেশের বাউল কবির শাহ ও গানের দল নকশীকাঁথা। নকশীকাঁথা বাংলাদেশের ফিউশনধর্মী ফোক ব্যান্ড। দেশের লোকগানগুলোকে মঞ্চে পরিবেশন করছে দলটি। বর্তমানে এই ব্যান্ডে আছেন ভোকাল ও পারকেশনিস্ট সাজেদ ফাতেমী, কাহান, ঢোল ও ডিজ্যাম্বে-বুলবুল, অ্যাকুইসটিক গিটার, রাবাব ও দোতারা-সুমন, বেইজ গিটার-ফয়সাল, মেলোডিকা, অ্যাকোরডিয়ান-রোমেল।
নকশীকাঁথা তাদের বেশকিছু জনপ্রিয় গান শোনায়। তারা শুরু করেন বন্দনা গীতি দিয়ে। সাঁওতালি গান ‘তুকে লিয়ে’, ‘ও কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’, ‘নয়া বাড়ি লইয়ারে বাইদা লাগাইলো বাইগুন’, ‘জবর সুন্দরি কইন্যা জলে দিছো ঢেউ’সহ বেশকিছু গান শ্রোতাদের মুগ্ধ করে।
এরপর মঞ্চে আসেন বাংলা লোকসংগীতের এক অনন্য নাম বাউল কবির শাহ। তার গায়কী দিয়ে তিনি দর্শকশ্রোতাদের মাতিয়ে রাখেন। বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের কাছে তার গানের হাতেখড়ি। বিচ্ছেদ ভাবের গান, ভাটিয়ালী, মুর্শীদি গানে পারদর্শী এই শিল্পী বাংলাদেশের গানের জগতে আশীর্বাদস্বরূপ। তিনি গেয়ে শোনানÑ ‘কে কয় পিরিত ভালা’, ‘কৃষ্ণ আইলা রাধার কুঞ্জে’, ‘দুই চাক্কায় দৌড়ে গাড়ি কি আর করবি মন’, ‘নাতিন তুমি কাইন্দ না জামাই লইন্ডনি’, ‘ভব সাগরের নাইয়া, মিছা গরব করো রে পরার ধন লইয়া’, কোন মেস্তরি নাও বানাইলো এমন দেখা যায় ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে ময়ূরপঙ্খী নাও’ ও ‘তোমার লাগি সাজাইয়াছি ফুলের বিছানা’।
এরপর মঞ্চে আসে স্পেনের বার্সেলোনার জনপ্রিয় ব্যান্ড ‘লাস মিগাস’। এ দলের গানকে কেউ বলেন মেডিটেরিয়ান গান কেউবা বলেন আত্মার গান। ব্যান্ডটির সদস্যরা ভোকাল-বেগো সালাযার, গিটার-মারতা রোবলস, গিটার-আলিশিয়া গ্রিলো এবং ভায়োলিন-রসার লসকস। চারজনের ভিন্ন ভিন্ন ভাবনা, মতাদর্শ এক করে তৈরি করেন তাদের মিউজিক, যা শ্রোতাকে নিয়ে যায় এক নস্টালজিক, ইউফোরিক যাত্রায়। ২০১৭ সালে লাস মিগাসের অ্যালবাম ‘ভেন্তে কনমিগো’ ফেমিংগো মিউজিক হিসেবে ১৮তম ল্যাটিন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে মনোনয়ন পেয়েছিল।
এর আগে ১৫ নভেম্বর বাংলার ঐতিহ্যবাহী লোকনাচের মধ্য দিয়ে শুরু হয় চতুর্থ আন্তর্জাতিক লোকসংগীত উৎসব। সামিনা হোসেন প্রিমার পরিচালনায় নৃত্যদল ভাবনা পরিবেশন করে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের বর্ণিল নাচ। নাচের উপস্থাপনায় বর্ণময় হয়ে ওঠে উৎসব মঞ্চ। ‘সোহাগ চাঁদ বদনি ধনী নাচ তো দেখি’ এ গানের সঙ্গে নৃত্য দিয়ে শুরু করে শিল্পীরা। এরপর পাহাড়ি নৃত্য, রাঁয়বেশে নৃত্য পরিবেশন করেন তাঁরা।
প্রথম দিনের দ্বিতীয় শিল্পী ছিলেন মাতাল কবি রাজ্জাক দেওয়ানের শিষ্য নারায়ণগঞ্জের আবদুল হাই দেওয়ান। গুরু তাকে উপাধি দিয়েছেন ‘হাফ মাতাল’। এই উপাধি নিয়েই গানে গানে মানুষের মন রাঙিয়ে তুলছেন তিনি। তিনি গেয়ে শোনান ‘মা গো মা-জি গো জি/পড়লাম কি রঙ্গে/ভাঙা নৌকা বাইতে আইলাম গাঙ্গে’, ‘তুই বড় রঙিলা বাওয়াইরে, বাওয়াই কতই জাদু জানো’, ‘বাজার ভালো না গো বন্ধু, বাজার ভালো না’, ‘কোনো বা দেশে রইলা দয়াল’, ‘বন্ধু রে তোর জ্বালায় বাঁচি না’ ও ‘তোমারও লাগিয়া রে বন্ধু’।
উৎসবের দ্বিতীয় দিনে পোল্যান্ডের লোকগানের দল দিকান্দা প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে কোনো পরিবেশনায় অংশ নেয়। বলকান এবং জিপসির প্রভাব থাকা মধ্য ইউরোপের এ দলটি গানের তাল আর লয়ের দিক দিয়ে বিশ্বব্যাপী শ্রোতাদের হৃদয় জয় করে নিয়েছে। দিকান্দা ব্যান্ডটি তাদের প্রতিটি গানের শব্দের মাঝে তৈরি করে নিজস্ব লোকজ শব্দ, যা সবার কাছে ‘দিকান্দিশ’ নামে পরিচিত। এ ব্যান্ডের শিল্পীরা হলেন গায়িকা আনিয়া উইটজাক ও কাসিয়া বগুশ।
গায়িকা আনিয়া উইটজাক ভাঙা বাংলায় কয়েকবার বাংলাদেশের দর্শকদের প্রতি তার ভালোবাসা জানান। বলেন, গানের ভাষা আমাদের নিজস্ব, কিন্তু ভাবগুলো চিরায়ত।
আনিয়া গানে গানে বলছিলেন দুঃখ বেদনার কথা। আবার কখনো বলছিলেন, আমরা আমাদের পরিবারকে ভালোবাসি। স্বামীকে, স্ত্রীকে, সন্তানদেরকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসার মধ্য দিয়েই আমরা বেঁচে থাকতে চাই, বাঁচি। আসুন সেই ভালোবাসায় অবগাহন করি সুরে সুরে।