প্রতিবেদন

শিগগিরই বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে চালু হচ্ছে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার

নিজস্ব প্রতিবেদক
ডাটা সেন্টার হলো সরকারি-বেসরকারি খাতে তথ্য সংরণের জন্য নির্দিষ্ট স্থান যেখানে ডাটা সংরণ প্রক্রিয়াকরণের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থাপনা রয়েছে। বৈশ্বিক অবকাঠামোতে বৃহৎ ডাটা সেন্টারগুলো দিনে দিনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কোনো কোম্পানির কাজের প্রকৃতি, অবস্থান ও ডাটা ব্যবহারের হার প্রভৃতির ওপর নির্ভর করে সার্ভারের কনফিগারেশন, নেটওয়ার্ক ও টপোলজি এবং সহায়তাকারী সরঞ্জামের চাহিদা। এই চাহিদাগুলোর ওপর ভিত্তি করেই প্রাথমিকভাবে ডাটা সেন্টারের ডিজাইন করা হয়।
এই ডিজাইনের েেত্র বাঁধা-ধরা কোনো নিয়ম ছিল না। টেলিকমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন ২০০৫ সালে ডাটা সেন্টারের শ্রেণিবিন্যাসের জন্য মানদ- তৈরির ল্েয ঞওঅ–৯৪২ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। এই প্রকল্পের গবেষণালব্ধ জ্ঞানের মাধ্যমেই ডাটা সেন্টারকে মোট চারটি ভাগে ভাগ করা হয়Ñ ক. টায়ার-১; খ. টায়ার-২; গ. টায়ার-৩; ঘ. টায়ার-৪।
তত্ত্বীয়ভাবে টায়ার-১ এবং টায়ার-২ ডাটা সেন্টারের কোনো অংশ অকার্যকর হলে সমস্ত সিস্টেম বন্ধ রেখে মেরামত করার প্রয়োজন হয়। কিন্তু টায়ার-৩ ও টায়ার-৪ ডাটা সেন্টারের যেকোনো অংশ মেরামতের সময় ওই অংশের কার্যক্রম বিকল্পভাবে চালু রাখা সম্ভব। অর্থাৎ ডাটা সেন্টারের সার্ভিসের নিরবচ্ছিন্নতা বজায় থাকে। টায়ারের সংখ্যাগত মান যতবেশি তার নির্ভরযোগ্যতাও তত বেশি।
বিশ্বে বৃহৎ কোম্পানি বা সরকারি সংস্থাগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ডাটা সেন্টার পরিচালনা করে। ডাটা সেন্টারগুলোই বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় কাউড সলিউশনের জোগানদাতা। এই ডাটা সেন্টারকে কোনো দেশ বা কোম্পানির জন্য ব্রেইন হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরে বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে সেরকমই একটি ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার চালুর সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। এই ডাটা সেন্টার হবে এশিয়ার প্রথম এবং বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহৎ। ডাটা সেন্টারটি হবে বাংলাদেশের ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার বা জাতীয় তথ্য ভা-ার। অনুষ্ঠানিকভাবে চালুর মাধ্যমে সরকারি সকল ধরনের গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর তথ্যসহ ব্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র, বাণিজ্য সংস্থার তথ্য সংরণ করা হবে এ ডাটা সেন্টারে। ফলে দেশের সরকারি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ডাটা আরো সুরতি হবে। একই সঙ্গে এ ডাটা সেন্টারের মাধ্যমে সরকারের সকল মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সকল সরকারি কার্যালয়ের আইসিটি কার্যক্রম সরাসরি যুক্ত থাকবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ডাটা বা নথি সংরণ ও সুরতি রাখতে এবং জাতীয় ই-সেবা সিস্টেমের মাধ্যমে নাগরিকসেবা দ্রুত নিশ্চিত করতে ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টারটি গড়ে তোলা হয়েছে। অতীতে এ ধরনের সেবার জন্য সরকারি বিভিন্ন ওয়েবসাইট এবং তাদের তথ্য সংরণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ডাটা সেন্টারের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এসব তথ্য নিরাপদ রাখতে ওইসব দেশের ডাটা সেন্টারকে পেমেন্ট করতে হয়েছে। কাউড কম্পিউটিং ও জি-কাউড প্রযুক্তির ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার দেশে স্থাপন হওয়ায় দেশের ডাটা নিরাপত্তায় উন্নত বিশ্বের মতো বাংলাদেশও তথ্য নিরাপত্তায় স্বনির্ভর হয়ে উঠল।
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের সার্বিক তত্ত্বাবধানে দিনে দিনে ডিজিটাল বাংলাদেশের কলেবর বাড়ছে। আর পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেশি পরিমাণে ডাটা সংরণের প্রয়োজনীয়তা। বাংলাদেশের ডিজিটাল কার্যক্রমের যে অগ্রগতি তাতে আমাদের আরো বৃহৎ আকারের ডাটা সেন্টারের প্রয়োজন। এ কারণে এই ডাটা সেন্টারে সমতা বাড়ানোর জন্য প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। এই ডাটা সেন্টারের সমতা আরো তিনগুণ বাড়াতে ইতোমধ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।
সূত্র জানায়, ২০১৫ সালের ৬ অক্টোবর একনেক সভায় এই প্রকল্পটি অনুমোদন হয়। ২০১৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এ ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার প্রকল্পের কাজ শুরুর উদ্বোধন করেন। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের জুনের মধ্যে ডাটা সেন্টারের নির্মাণ কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু নানা কারণে কিছুটা সময় পিছিয়ে গিয়ে ডাটা সেন্টার এখন চালুর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত হয়েছে। এ ডাটা সেন্টার নির্মাণের ১ হাজার ৫১৬ কোটি ৯১ লাখ টাকার মধ্যে সরকার ৩১৭ কোটি ৫৫ লাখ এবং অবশিষ্ট ১ হাজার ১৯৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা দিয়েছে চীনের এক্সিম ব্যাংক। বিশালাকার এই ডাটা সেন্টারে রয়েছে উচ্চ মতার ৬০৪টি র‌্যাক, উচ্চ গতির ৪০ জিবিপিএস রিডান্ডেন্ট ডাটা কানেকটিভিটি ও ৯ এমভিএ লোডের রিডান্ডেন্ট লাইনসহ ২৪ ঘণ্টার নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সংযোগ।
এর আগে দেশের প্রয়োজনীয়তার নিরিখে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলে (বিসিসি) প্রথম ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার গড়ে তোলা হয়। থ্রি টিয়ার ওই ডাটা সেন্টারে র‌্যাক রয়েছে ৬৭টি। ওই ডাটা সেন্টারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের ডাটা, সরকারি ওয়েবসাইট, সরকারি কর্মকর্তাদের ই-মেইল হোস্টিং সার্ভিস, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকার তথ্যভা-ার, ই-সেবা সংক্রান্ত কার্যক্রম, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-ভ্যাট, ই-ট্যাক্স ইত্যাদি সিস্টেম, অর্থ বিভাগের অনলাইন বেতন ও পেনশন নির্ধারণী সিস্টেমকে স্থাপন করা হয়।
উল্লেখ্য, বর্তমানে বিশ্বে মাত্র পাঁচটি বৃহৎ ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টার রয়েছে। এগুলো হলো স্পেনের মাদ্রিদ ও আলকালা ডি হেনারেস-এ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লাস ভেগাস ও ওলাথ-এ এবং কানাডার গুয়েল্ফে। ছয় নম্বর ফোর টিয়ার ডাটা সেন্টারটি হলো বাংলাদেশে।