কলাম

২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবসের গুরুত্ব

অধ্যাপক ড. মিল্টন বিশ্বাস
২১ নভেম্বর সশস্ত্র বাহিনী দিবস। ২০১৮ সালে এসে গত ১০ বছরে সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়ন ও তাদের কার্যক্রমের সাফল্য বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হবে এই দিবসটি উদযাপনের তাৎপর্য। ১৯৭১ সালের এই দিনে বাংলাদেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সম্মিলিতভাবে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আক্রমণের সূচনা করে। ৮০র দশকের মাঝামাঝি থেকে সম্মিলিতভাবে ২১ নভেম্বরকে সশস্ত্র বাহিনী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এর আগে ২৫ মার্চ সেনা, ১০ ডিসেম্বর নৌ এবং বিমান বাহিনী ২৮ সেপ্টেম্বর আলাদা আলাদাভাবে দিবসসমূহ পালন করত। পরে ২১ নভেম্বরের তাৎপর্য সমুন্নত রাখতে সম্মিলিত দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। স্পষ্টত দেখা যাচ্ছে, সশস্ত্র বাহিনী দিবস পালনের পেছনে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সক্রিয়। মুক্তিযুদ্ধে বিভিন্ন সামরিক বাহিনীর অবদানকে সাধারণ জনতার আত্মত্যাগের সঙ্গে একীভূত করে দেখা হয় এ দিবসটিতে।
১৯৭১-এর ২৫ মার্চ পাক হানাদার বাহিনীর তা-বলীলার জবাবে অস্ত্র তুলে নেয় বিপ্লবী ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার ও অন্য সদস্যরা। পরবর্তীতে এগিয়ে আসেন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি নাবিক ও নৌ অফিসার, সেনা ও বিমান কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সর্বস্তরের মুক্তিপাগল হাজার হাজার যুবক। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম ধারণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ।
জাতির এই ক্রান্তিলগ্নে পাকিস্তানি শাসকদের স্বপ্ন নস্যাৎ করা এবং তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয় একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীর। মুজিব নগরে গঠিত অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার কর্নেল এমএজি ওসমানীকে (পরবর্তীতে জেনারেল) মুক্তিবাহিনীর প্রধান নিয়োগ করে। তাঁকে মুক্তিবাহিনীকে পুনর্গঠনের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
সেনাবাহিনীর অফিসার ও সৈনিকগণ দ্রুত নিজেদের সুসংগঠিত করে পাল্টা আক্রমণ শুরু করে। সারাদেশকে বিভক্ত করা হয় ১১টি সেক্টরে, যার নেতৃত্ব প্রদান করা হয় একেকজন সুশিতি পেশাদার সেনা কর্মকর্তাকে। ৮ মাস পর ’৭১ সালের ২১ নভেম্বর চূড়ান্তভাবে সম্মিলিত আক্রমণের পরিকল্পনা গৃহীত হয়। সেদিন স্থল, নৌ ও আকাশপথে কর্নেল ওসমানীর নেতৃত্বে চালানো হয় ত্রিমুখী আক্রমণ। উন্মুক্ত হয় বিজয়ের পথ। এই আক্রমণ পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে সফলতা লাভ করে জলে, স্থলে ও অন্তরী।ে তারা বাধ্য হয় পশ্চাদপসারণে। সুশিতি একটি বাহিনীর বিরুদ্ধে সূচিত হয় মুক্তিবাহিনীর বিজয়ের ইতিহাস। তারপর মিত্র বাহিনীর সহযোগে শুরু হয় সার্বিক যুদ্ধ। ১৬ ডিসেম্বর বাঙালি জাতি ছিনিয়ে আনে চূড়ান্ত বিজয়। প্রকৃতপে এ বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বরের সম্মিলিত আক্রমণ।
মুক্তিযুদ্ধের স্মারক রতি রয়েছে চট্টগ্রামের ভাটিয়ারি মিলিটারি একাডেমিতে। অন্যদিকে নেভাল একাডেমিতে নির্মাণাধীন রয়েছে ‘বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স’। সেখানকার ‘রেডকিন’ চত্বরটি মুক্তিযুদ্ধের পরে মাইন অপসারণের সময় নিহত রাশিয়ান নাগরিক রেডকিনের নামে করা হয়েছে।
১৯৭২ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ প্রতিরা বাহিনীর সদর দপ্তর অবলুপ্ত এবং প্রতিরা মন্ত্রণালয়ের অধীনে তিন বাহিনীর পৃথক সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ পরিচ্ছেদের ৬১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বাংলাদেশ প্রতিরা কর্মবিভাগসমূহের সর্বাধিনায়কত্বা রাষ্ট্রপতির ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে এবং আইনের দ্বারা তার প্রয়োগ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
২.
শেখ হাসিনা সরকারের ১০ বছরে সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়নে আন্তরিক কর্মযজ্ঞ দেখা গিয়েছে। ইতঃপূর্বে ১৯৯৬ সালে এই আওয়ামী লীগ সরকারই তৎকালীন সশস্ত্র বাহিনীর জন্য এপিসি বা অৎসড়ঁৎবফ চবৎংড়হহবষ ঈধৎৎরবৎ, গওএ-২৯ যুদ্ধ বিমান, অত্যাধুনিক ঈষধংং-৪ ফ্রিগেট ও অন্যান্য আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র সংগ্রহ করে। পেশাদারিত্ব বাড়ানোর জন্য ইতোমধ্যে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজ, ওয়ার কলেজ, আর্মড ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ, ইওচঝঙঞ বা চবধপব কববঢ়রহম ইনস্টিটিউট, ইটচ বা ঝপরবহপব ্ ঞবপযহড়ষড়মু ইনস্টিটিউট প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জনবল বাড়ানোর জন্য একটি কম্পোজিট ব্রিগেড, একটি পদাতিক ব্রিগেড, স্পেশাল ওয়ার্কস ব্রিগেড ও বেশ কয়েকটি বিভিন্ন ধরনের ব্যাটালিয়ানসহ অন্যান্য উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর নতুন অৎসড়ঁৎবফ চবৎংড়হহবষ ঈধৎৎরবৎ কেনার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। তখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতিসংঘ মহাসচিবের সঙ্গে সাাতের সময় ফোর্স কমান্ডার বা নীতি নির্ধারণী পর্যায়ের পদের সংখ্যা বাড়ানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সৈনিকদের কল্যাণের জন্য গ্যারিসনে বা তার আশপাশে পরিবারের সঙ্গে বসবাসের কোটা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। অফিসারদের হাউজিং প্লট দেয়ার প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে অনেক আগেই।
২০০৯ সালে বিডিআর সদর দপ্তর পিলখানায় পৈশাচিক হত্যাকা-ে যেসব সেনা কর্মকর্তা শহীদ হয়েছেন তাদের পরিবারের জন্য সরকারের নানাবিধ প্রচেষ্টা বাস্তবায়নের পথে রয়েছে। অন্যদিকে হত্যাকারীদের শাস্তি দেয়ার জন্য ‘দ্রুত বিচার আইনে’ বিচারকার্য সম্পন্ন করা হয়েছে। ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণার মধ্য দিয়ে মেধাবী ও কর্মে নিযুক্ত সেনা কর্মকর্তার প্রতি বর্তমান সরকারের প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন সম্মানজনকভাবে সমাপ্তি লাভ করেছে। কক্সবাজারে বিমান বাহিনীর ঘাঁটি উদ্বোধন করা হয় ২০১১ সালের এপ্রিলে। ২০১৪ সালের ১১জুন ৩টি গও ১৭ হেলিকপ্টার ক্রয় চুক্তি স্বারিত হয়েছে। ২৭ জুন ১৬টি এফ সেভেন (বিজিআই) বিমান ক্রয়ে চুক্তি হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে সারফেইস টু এয়ার মিসাইল (ঝঐঙজঅউ) সংযোজিত হওয়ার পর পরীামূলক ফায়ারিং অনুষ্ঠিত হয় সে সময়।
বিমান বাহিনী একাডেমিতে ৪তলাবিশিষ্ট বঙ্গবন্ধু ভবন কমপ্লেক্সের উদ্বোধন করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ফাইট সেইফটি সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে বিমান বাহিনী কৃতিত্বের স্বারও রেখেছে। এছাড়া জাপানের সুনামিদুর্গতদের জন্য ত্রাণসামগ্রী পৌঁছে দিয়ে বিমান বাহিনী আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমাদৃত এখন।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পুনর্গঠন কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ‘ফোর্সেস গোল ২০৩০’ চূড়ান্তকরণ ও সাংগঠনিক কাঠামোতে জনবল সম্পৃক্তকরণের ল্েয টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্টের পরিবর্তন, পরিমার্জন ও আধুনিকায়নের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। সেনাবাহিনীতে চতুর্থ প্রজন্মের ট্যাংক-এমবিটি ২০০০, অত্যাধুনিক রাডার, সেলফ প্রপেলড গান এবং নতুন হেলিকপ্টার সংযোজন করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নকল্পে আওয়ামী লীগ সরকার রাশিয়ার সঙ্গে ঋণ চুক্তি অনুযায়ী সমরাস্ত্র ক্রয় করেছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বৈশ্বিকমানে আধুনিকায়নের ল্েয জুলাই ২০১৩ থেকে প্রাথমিক পর্যায়ে মেডিকেল কোরে নারী সৈনিক ভর্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। সাংগঠনিক এবং প্রশিণ কার্যক্রম সম্প্রসারণের ল্েয সিলেটে একটি পদাতিক ডিভিশন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইতোমধ্যে ৩টি পদাতিক ব্যাটালিয়নকে রূপান্তর করে একটি ম্যাকানাইজড পদাতিক ব্রিগেড প্রতিষ্ঠা পেয়েছে।
৩.
চট্টগ্রামের মিলিটারি একাডেমি ও নেভাল একাডেমি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এদের গুরুত্ব কী? মিলিটারি একাডেমির কঠোর প্রশিণ বর্তমান তরুণদের অনেকেই সহ্য করতে পারছে না। বাড়ি ফেরত আসছে। লেখাপড়ায় তাত্ত্বিক দিক থেকে তারা এগিয়ে আছে; কিন্তু কষ্টকর শারীরিক শ্রমে একটুতেই কাতর হয়ে পড়ছে। রাইফেল কাঁধে দৌড়ানো আর সাঁতার কাটার মতো সহজ কাজেও তাদের অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এজন্য স্কুল-কলেজে ছেলে-মেয়েদের শারীরিক প্রশিণের মাধ্যমে সুস্থসবলভাবে গড়ে তোলা দরকার।
দেশপ্রেমিক নাগরিক তৈরিতে মিলিটারি একাডেমির অবদান অনস্বীকার্য। মিলিটারি একাডেমির মতো নেভাল একাডেমি সম্পর্কেও সাধারণ জনগণ খুব কমই ধারণা রাখে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট-পরবর্তী বাংলাদেশের স্বৈরশাসকের একাধিপত্যের কারণে জনমনে দেশের সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সম্বন্ধে বিরূপতা জন্মে। একইসঙ্গে ভীতিবোধ ও দূরত্ব সৃষ্টি হয়। প্রতিষ্ঠানগুলো যে আমাদের দেশের এবং জনগণের অর্থে পরিচালিত হয় এ ধরনের সচেতনতা আমাদের মধ্যে এখনও আসেনি।
বাংলাদেশ নেভাল একাডেমি যাত্রা শুরু করে ১৯৭৬ সালে। এটি এক ধরনের সামরিক শিা প্রতিষ্ঠান। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে এটি অবস্থিত। প্রতিষ্ঠানটি অফিসার ক্যাডেট ও সরাসরি ভর্তিকৃত অফিসারদের মৌলিক প্রশিণ প্রদান করে থাকে। ক্যাডেটরা এ একাডেমিতে ১৮ মাসের প্রশিণের শুরুতে বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে সেনা ও বিমান বাহিনীর ক্যাডেটদের সাথে ১০ সপ্তাহের সম্মিলিত প্রশিণে অংশগ্রহণ করে। একাডেমির প্রশিণ শেষে মিডশিপম্যান হিসেবে ব্যবহারিক প্রশিণের উদ্দেশ্যে তারা ৬ মাসের জন্য যুদ্ধজাহাজে গমন করে। অতঃপর তারা বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অ্যা. সা. লেফটেনেন্ট হিসেবে কমিশন লাভ করে। পরবর্তীতে প্রায় এক বছর বিভিন্ন ঘাঁটিতে প্রশিণ শেষে পুনরায় নেভাল একাডেমিতে প্রয়োজনীয় শিা সমাপ্তির পর বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-এর অধীনে বিজ্ঞানে স্নাতক (বিএসসি-পাস) ডিগ্রি অর্জন করে। তবে প্রকৌশল ও বিদ্যুৎ প্রকৌশল শাখার অফিসাররা বুয়েট অথবা এমআইএসটিতে অধ্যয়নের পর গ্র্যাজুয়েশন লাভ করে। ক্যাডেট প্রশিণ ছাড়াও এ একাডেমিতে সরাসরি নিয়োগকৃত অফিসারদের বেসিক কোর্স, জুনিয়র স্টাফ কোর্স, কমন কোর্স এবং কম্পিউটার কোর্স পরিচালনা করা হয়। ক্যাডেটরা দেড় বছর এ ক্যাম্পাসে অবস্থান করে, কখনও তারও বেশি। প্রশিণের সফল পরিসমাপ্তি ও কমিশনিং অনুষ্ঠানের পর তারা মাতৃভূমির সেবায় আত্মনিয়োগ করে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় সাবমেরিন ক্রয়ের পর দেখা গেছে, বর্তমানে নৌশক্তি কেবল যুদ্ধের জন্য নয় বরং আন্তর্জাতিক েেত্র গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সম।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এজন্য পরিবর্তিত জলবায়ুর সঙ্গে মিলিয়ে নেভাল একাডেমিকে সাজাতে হবে। কেবল জলোচ্ছ্বাসের ভয়ে জিনিসপত্র ৩০ ফুটের উচ্চতায় রাখার মধ্যে সীমিত থাকা উচিত নয়; আধুনিকায়ন দরকার। লোকবলও বাড়াতে হবে। মিলিটারি ও নেভাল একাডেমিতে বিপুল সংখ্যক বিদেশি শিার্থী অধ্যয়ন করছে। বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের একটি উৎসে পরিণত হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। তাছাড়া এখান থেকেই প্রশিণপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা প্রতি বছর জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশগ্রহণ করছেন।
৪.
জাতিসংঘ সনদের ষষ্ঠ অধ্যায়ে আন্তর্জাতিক শান্তিরা এবং সপ্তম অধ্যায়ে শান্তি প্রয়োগের বিধান রয়েছে। জাতিসংঘ শান্তিরা কার্যক্রম সংঘর্ষে লিপ্ত দুপরে সম্মতি ও মতৈক্যের ওপর ভিত্তি করে শুরু হয়। শান্তিরা বাহিনীকে সংশ্লিষ্ট পসমূহ কর্তৃক অনুমোদিত একটি শান্তি চুক্তি বা শান্তি ব্যবস্থা বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে মোতায়েন করা হয়। এ পর্যন্ত জাতিসংঘের ৬৮টি মিশনের মধ্যে ৫৪টিতে ১ লাখ ১৮ হাজার ৯৮৫ জন বাংলাদেশি শান্তিরী সদস্য অংশগ্রহণ করেছেন। শান্তিরী কার্যক্রমে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা ৮ হাজার ৯৩৬ জন, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। ১৯৮৮ সালে ইরাক-ইরান শান্তি মিশনে যোগদানের মধ্য দিয়ে এদেশের সেনাবাহিনীর ১৫ জন সদস্য জাতিসংঘের পতাকাতলে একত্রিত হয়। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী শান্তি মিশনে যোগ দেয় ১৯৯৩ সালে। বাংলাদেশ পুলিশ ১৯৮৯ সালে জাতিসংঘ পরিবারের সদস্য হয় নামিবিয়া মিশনের মাধ্যমে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর শান্তিরীরা মিশন এলাকায় বিবাদমান দলকে নিরস্ত্রীকরণ, মাইন অপসারণ, সুষ্ঠু নির্বাচনে সহায়তা প্রদান, সড়ক ও জনপথ এবং স্থাপনা তৈরিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। কঙ্গো, নামিবিয়া, কম্বোডিয়া, সোমালিয়া, উগান্ডা, রুয়ান্ডা, লাইবেরিয়া, হাইতি, তাজিকিস্তান, কসোভো, জর্জিয়া, পূর্ব তিমুর প্রভৃতি স্থানে শান্তিশৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ একটি উজ্জ্বল নাম। জাতিসংঘ শান্তি মিশনে সেনা, নৌ, বিমান বাহিনীর মোট ৯৬ জন সদস্য শহীদ হয়েছেন; পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন ১৪ জন। অন্যদিকে ২০০০ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ১৭ বছরে শান্তিরা মিশনের মাধ্যমে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আয় হয়েছে ২০ হাজার ৪৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। মূলত বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকার রার েেত্র বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের বিশ্বস্ত ও পরীতি বন্ধু হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। কারণ বিশ্বে সকল প্রান্তের দুর্গত, নিপীড়িত ও নিরীহ মানুষের সেবায় এ শান্তিরীদের হাত সর্বদা প্রসারিত। সংঘাতপূর্ণ ও প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়েও তারা আর্তমানবতার সেবা করে চলেছে।
৫.
১৯৭১ সালে সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী সম্মিলিত হয়েছিল জনতার সঙ্গে। সেই ঐতিহাসিক সম্পর্ক অর্থাৎ জনতা ও সশস্ত্র বাহিনীর পারস্পরিক সুসম্পর্ক আমাদের বর্তমান প্রজন্মের জন্য একটি উদ্দীপক বিষয়। জাতির প্রয়োজনে অর্পণ করা কঠিন দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা অনন্য। দেশের প্রতিরার জন্য প্রশিণ আর জনগণের জন্য ভালোবাসাÑ এই দু’টি বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী।
শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে আমাদের পররাষ্ট্র নীতি হচ্ছে ‘সকলের সাথে বন্ধুত্ব কারও সাথে বৈরিতা নয়।’ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক এজন্য প্রয়োজন। পাশাপাশি স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রার জন্য আমাদের সুশিতি ও পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী থাকাটা অন্যতম শর্ত। আজকের পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে তিন বাহিনীর ধ্যান ধারণা, চিন্তা-চেতনার আধুনিকায়ন করে যেতে হবে। কারণ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আমাদের সশস্ত্র বাহিনী জাতিসংঘের শান্তিরা মিশনে অংশগ্রহণ করছে। এই ধারা অব্যাহত রাখা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সমুন্নতি বিধানের জন্য সশস্ত্র বাহিনী দিবস উদযাপনের গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
এবং পরিচালক জনসংযোগ
তথ্য ও প্রকাশনা দপ্তর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়