কলাম

আলোচনা ও সমালোচনার পর্যটন শিল্প

মো. সাইফুল্লাহ রাব্বী
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের যাত্রা খুব বেশি দিনের নয়। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হাতে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশ পর্যটন শিল্পের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়েছে।
ইংল্যান্ডে পর্যটন শিল্পের যাত্রা শুরু হয় ১৬৭০ সালে। এর ১৭১ বছর পর ১৮৪১ সালে থমাস কুক নামের একজন ইংরেজ পর্যটন শিল্পে প্রথম প্যাকেজ ট্যুর প্রথার আয়োজন করেন। এই প্যাকেজ ট্যুরে থমাস কুক ৫৭০ জন পর্যটককে নিয়ে ট্রেনে লেইচেস্টার থেকে লাভবোরো ভ্রমণ করেন।
পর্যটক শব্দটির প্রথম প্রয়োগ হয় ১৭৭২ সালে এবং পর্যটন শব্দের ব্যবহার হয় ১৮১১ সালে। সেই হিসাবে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে নবীনই বলতে হয়। আমাদের দেশের লোকজন পর্যটন বলতে বোঝেন হোটেল। অনেকে আবার ভাবেন পর্যটন মানে ঘোরাঘুরি করা। হোটেল ও ঘোরাঘুরি ছাড়াও যে আরও কিছু বিষয় পর্যটনের সাথে সম্পর্কিত, এটা অনেকেই মানতে চান না।
বিশ্ব পর্যটন সংস্থা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে পর্যটকরূপে আখ্যায়িত করতে গিয়ে বলেছে, ‘যিনি ধারাবাহিকভাবে ১ বছর বা তার কিছু কম সময়ের মধ্যে কোনো স্থানে ভ্রমণ ও অবস্থানপূর্বক স্বাভাবিক পরিবেশের বাইরে দর্শনীয় স্থান পরিদর্শনের উদ্দেশ্যে অবসর, বিনোদন বা ব্যবসায়িক কর্মকা- পরিচালনাসহ অন্যান্য বিষয়াদির সাথে জড়িত, তিনি পর্যটক বলে গণ্য হবেন।’
একজন পর্যটককে উপরোক্ত কর্মকা- সম্পাদন করতে যতগুলো কাজের সমন্বয় করতে হয় তা সবই পর্যটনের অন্তর্ভুক্ত। সহজভাবে বলা যায়, পর্যটন হচ্ছে ওই সকল কাজের সমষ্টি যেগুলো সৃষ্টি হয় যখন কোনো পর্যটক ভ্রমণ করেন অথবা কোনো স্থানে অবস্থান করেন।
পর্যটনের অন্যতম পাঁচটি স্তম্ভ হলোÑ আকর্ষণ, পরিবহন ও যোগাযোগ, আবাসন, খাদ্য ও পানীয় এবং বিনোদন। এই স্তম্ভগুলো কোনো না কোনোভাবে ১০৯টি সেক্টরের সাথে যুক্ত। এজন্য পর্যটনকে শিল্পেরও শিল্প বলা হয়।
বর্তমানে অনেক দেশের অর্থনীতি পর্যটনকেন্দ্রিক। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, বর্তমান সময়ে ১০০ কোটিরও বেশি পর্যটক এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ২০২০ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১৬০ কোটি ছাড়িয়ে যাবে।
বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দিন দিন উন্নয়নের পথে এগুচ্ছে। পর্যটন শিল্পের উন্নয়নে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এই শিল্প হবে বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি এবং পর্যটনের মাধ্যমে বদলে যাবে দেশ। ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের তথ্যানুযায়ী, ২০১৪ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ট্যুরিজম অ্যান্ড ট্রাভেলের সরাসরি অবদান ২৯৬.৬ বিলিয়ন টাকা এবং এ খাতে সরাসরি চাকরি পেয়েছেন ০.৯০৩ মিলিয়ন।
পর্যটন এমন এক শিল্প যেখনে সবাই আর্থিক দিক থেকে সুবিধা পায়। আমেরিকার এক পর্যটন বিষয়ক ম্যাগাজিনের তথ্যানুযায়ী, কোনো দেশে একজন পর্যটক ভ্রমণ করতে গেলে ৩০ জন লোকের কাজের সুযোগ হয়।
বাংলাদেশের পর্যটন খুবই সম্ভাবনাময় খাত। পর্যটকদের আকর্ষণ করতে যেসব উপাদান প্রয়োজন তার সবই এদেশে বিদ্যমান, প্রয়োজন শুধু পর্যটকদের কাছে যথাযথভাবে এগুলো উপস্থাপন করা। ইউনেস্কো বাংলাদেশের ৩টি আকর্ষণকে বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে ঘোষণা করেছেÑ বিশ্বের সর্ববৃহৎ অখ- ম্যানগ্রোভ বন-সুন্দরবন, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার ও ষাট গম্বুজ মসজিদ।
সৌন্দর্যের দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশকে বলা হয়েছে রূপের রাণী। এর চারপাশ যেন রূপের আধার। কী নেই এখানে! এদেশে রয়েছে বিশ্বের দীর্ঘতম নিরবচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার, পৃথিবীর একক বৃহত্তম জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল সুন্দরবন, একই সৈকত থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত অবলোকনের স্থান সমুদ্রকন্যা কুয়াকাটা, দুটি পাতা একটি কুঁড়ির নয়নাভিরাম চারণভূমি সিলেট, উপজাতীয়দের বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি ও উচ্চ সবুজ বনভূমি ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম, সমৃদ্ধ অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রতœতাত্ত্বিক নিদর্শন ইত্যাদি। ফলে স্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পে উন্নয়নের সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।
বর্তমান পৃথিবীতে পর্যটন একটি সমৃদ্ধ ও সফল শিল্প। পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ আছে যাদের আয়ের সবচেয়ে বড় খাত পর্যটন শিল্প। এই শিল্প এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট কার্যক্রমের সঙ্গে হাজার হাজার মানুষ জড়িত থাকে। ফলে একটি দেশের বেকার যুবকদের একটি বড় অংশের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।
পৃথিবীর সমগ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি ১১ জনের মধ্যে গড়ে ১ জন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত। এই তথ্য থেকেই পর্যটন শিল্পের সম্প্রসারণশীলতা অনুমান করা যায়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প বিকাশের সমূহ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও স্বাধীনতার ৪৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এক্ষেত্রে আমরা খুব একটা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পারিনি। এই খাতটি থেকে সরকারের বিপুল অর্থ উপার্জনের সম্ভাবনা থাকলেও বরাবরই উপেক্ষিত থেকেছে।
পর্যটন শিল্প বিকাশের পথে আমাদের পর্বতপ্রমাণ সমস্যা নিয়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থা এক্ষেত্রে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেশের যোগাযোগব্যবস্থা যেমন খুব একটা সুবিধাজনক হয়ে ওঠেনি, তেমনি যাতায়াত খরচও তুলনামূলক বেশি হওয়ায় আমরা পর্যটক আকর্ষণে ব্যর্থ হচ্ছি।
বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশ ও সহজসরল মানুষগুলোর আতিথেয়তা যেকোনো পর্যটককে বারবার গ্রামগুলো ভ্রমণ করতে অনুপ্রাণিত করবে। আমাদের দেশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পালা-পার্বণ যেমন পহেলা বৈশাখ, ঘুড়ি উৎসব, আদিবাসীদের বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে আসতে বাধ্য করবে।
পর্যটন শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে বাংলাদেশ সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। সংরক্ষণ এলাকা আইন-২০১০ অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৩৫ হাজার একর জায়গা ‘পর্যটন সংরক্ষণ এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। সেন্টমার্টিনস দ্বীপ, মহেশখালী দ্বীপ, সোনাদিয়া দ্বীপ, নিঝুম দ্বীপ ও সুন্দরবনের কিছু এলাকা নিয়ে ‘স্বতন্ত্র পর্যটক অঞ্চল’ ঘোষণা করা হয়েছে। টেকনাফের সাবরাংয়ে ১১৬৫ একর জায়গাজুড়ে বিদেশি পর্যটকদের জন্য আধুনিক মানের সকল পর্যটন সেবা প্রদানের উদ্দেশ্যে ‘স্বতন্ত্র পর্যটক অঞ্চল’-এর কাজ শুরু হয়েছে।
সবদিক বিবেচনা করলে বলা যায়, বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বর্তমান অবস্থা ভালোর দিকেই যাচ্ছে।
লেখক: গেস্ট লেকচারার
বিবিএ ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট
ডেফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি