প্রতিবেদন

জাপানভিত্তিক সাময়িকী নিক্কেইকে দেয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা : ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে

স্বদেশ খবর ডেস্ক
বাংলাদেশের অর্থনীতি যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আগামী তিন বছরে এ দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত হবে। আর ২০২৪ সালের মধ্যে নিম্ন আয়ের দেশের বদনাম ঘুচাবে।
গত ৫ ডিসেম্বর জাপানভিত্তিক সাময়িকী নিক্কেই এশিয়ান রিভিউকে দেয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা উপরোক্ত আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। সাক্ষাৎকার প্রদানের একদিন পর ৬ ডিসেম্বর ওই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করে নিক্কেই এশিয়ান রিভিউ। আগামী ৩০ ডিসেম্বর জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করে এশিয়ার রাজনীতি, বাণিজ্য ও কূটনীতি বিষয়ক সাময়িকীটি। সাক্ষাৎকার প্রতিবেদনটিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রায় বর্তমান সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ ও সাফল্য তুলে ধরা হয়। এতে বর্তমান সরকারের বিদ্যুৎ উৎপাদন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে সাফল্য বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শেখ হাসিনা গত প্রায় এক দশক ধরে দেশের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৬ থেকে ৭ শতাংশে ধরে রেখেছেন। আর গত জুনে শেষ হওয়া অর্থবছরে তাঁর দেশ ৭.৮৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে।
এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৮.২৫ শতাংশ এবং ক্রমাগত এ হার আরো বাড়তে থাকবে।
শেখ হাসিনা দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘আমি যদি নির্বাচিত হই, আমি আশ্বস্ত করতে পারি যে আমরা যে কর্মসূচি হাতে নিয়েছি তাতে ২০২১ সাল নাগাদ প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে পৌঁছাবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ধাপে ধাপে নীতি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দেশে পরিণত হতে পারবে। এর একটি উদাহরণ হলো তিনি ১০০টি বিশেষ নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলের নেটওয়ার্কে বিদেশি কোম্পানিগুলোকে কারখানা স্থাপনে রাজি করানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। বর্তমানে এমন ১১টি অঞ্চলে কার্যক্রম চলছে, আরো ৭৯টি এখনো নির্মাণাধীন আছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, আসন্ন নির্বাচন শেখ হাসিনার নীতিমালার জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি পরীক্ষা। ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছিল। সেবার নির্বাচন বর্জন করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তবে এবার বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে, যদিও তাদের নেত্রী জেলে আছেন। জনমত জরিপগুলোর ফলাফলে দেখা গেছে, ৩০০টি আসনের মধ্যে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়লাভ করবে আওয়ামী লীগ।
সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আগামী বছর যত দ্রুত সম্ভব দ্বিতীয় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প বাস্তবায়নে দরপত্র আহ্বান করা হবে। অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মধ্যে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ প্রক্রিয়াকে বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যপূর্ণ করার প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এ পারমাণবিক কেন্দ্রটি স্থাপন করা হবে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে উদ্ধৃত করে নিক্কেই এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ১৭ হাজার ৩৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার ৫৮ শতাংশই প্রাকৃতিক গ্যাসের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়ে থাকে। তবে দেশের গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায়, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস-এলএনজি আমদানি উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতি বছর বাংলাদেশে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে ১০ শতাংশ হারে।
নিক্কেই এশিয়ান রিভিউর প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৯ সালে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে উচ্চাকাক্সক্ষী অবকাঠামো কর্মসূচি হাতে নেন শেখ হাসিনা। তাঁর শাসনকালে বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা ২৭টি থেকে বেড়ে ১২১টিতে দাঁড়িয়েছে। ১৬ কোটি ৬০ লাখ জনসংখ্যার মধ্যে ৯৩ শতাংশের কাছে বিদ্যুৎ পৌঁছে গেছে। তাঁর ক্ষমতায় আসার আগে তা ৪৭ শতাংশ ছিল। আগামী বছরের মাঝামাঝি নাগাদ শতভাগ মানুষের কাছে বিদ্যুৎ সুবিধা পৌঁছে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, চীন তার জাতীয় কর্মসূচি ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভস’-এর অধীনে বাংলাদেশে বর্তমান সময়ে অনেক উন্নয়ন প্রকল্পে জড়িত। এরই মধ্যে দেশটি বাংলাদেশে দ্বিতীয় পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের চুক্তি অনুযায়ী, এ দেশে ৩৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে চীনের। এর মধ্যে ২৪ বিলিয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণে দ্বিপক্ষীয় সহায়তা ও ১৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার যৌথ প্রকল্পের জন্য। ভারতের সঙ্গে দরপত্রে জেতার পর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে এখন ২৫ শতাংশ শেয়ার চীনের। এছাড়া চীনের সামরিক সরঞ্জাম আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অন্যতম শীর্ষ দেশগুলোর একটি।
পরাশক্তি দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্কের ওপর জোর দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঢাকা শুধু তাদের প্রস্তাবই গ্রহণ করবে, যাদের প্রস্তাব আমাদের জন্য উপযোগী ও স্বস্তিদায়ক হবে।’
সাক্ষাৎকারে প্রধানমন্ত্রী মিয়ানমার থেকে ৮ লাখ রোহিঙ্গা পালিয়ে আসার বিষয়ে কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছে। কারণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশিরাও পাকিস্তানের এমন নিপীড়নের শিকার হয়েছিল। তখন প্রায় এক কোটি বাংলাদেশিকে আশ্রয় দেয় ভারত।’
নিজেদের অতীত পরিস্থিতির কথা স্মরণ করে একান্ত মানবিক কারণেই বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন শেখ হাসিনা।