রাজনীতি

নির্বাচনকে সামনে রেখে পোশাক খাতকে অস্থিতিশীল করার পাঁয়তারা করছে বিএনপি-জামায়াত

নিজস্ব প্রতিবেদক
টার্গেট ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিতব্য একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এ জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে পোশাক খাতকে অস্থির করতে বিএনপি-জামায়াত উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ করেছে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমই।
সংগঠনটির সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান গত ১২ ডিসেম্বর বিজিএমইএ ভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে এ অভিযোগ করেন। ভয়-ভীতি দেখিয়ে যারা বিভিন্ন কারখানার পোশাক শ্রমিকদের কর্মবিরতি পালনে বাধ্য করছে তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনারও আহ্বান জানান তিনি।
বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, গত ২৯ নভেম্বর সরকার নির্ধারিত ন্যূনতম মজুরির গেজেট প্রকাশের পর পোশাক কারখানার মালিকরা মজুরি বাড়াতে রাজি হলেও একটি পক্ষ উসকানি দিয়ে শ্রমিকদের উত্তেজিত করছে। আর শ্রমিকরা কিছু না বুঝেই তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে সহিংস আন্দোলনে অংশ নিচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা শ্রমিকদের আহ্বান জানাচ্ছি, আগামী বছরের জানুয়ারিতে নতুন মজুরি হাতে পাওয়ার পরই আপনারা সিদ্ধান্ত নেবেন। এ রকম আন্দোলন-সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে বিদেশে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হবে। এতে যেসব ক্রেতাকে আমরা রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর দেশে ফিরিয়ে এনেছিলাম তারাও ফিরে যাবে। দেশের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এ রকম একটি খাতকে রক্ষা করতে শ্রমিকদের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
এই অপ্রীতিকর ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের খুঁজে বের করার জন্য গোয়েন্দা পুলিশকে অনুরোধ জানিয়ে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ৮ ডিসেম্বর থেকে হঠাৎ করেই নারায়ণগঞ্জের একটি কারখানায় আন্দোলনের সূত্রপাত হয়। পরে তা গাজীপুরের ১৫টি ও আশুলিয়ার ২০-২২টি কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকরা উৎপাদন বন্ধ রেখে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের উত্তরে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, গাজীপুর ও আশুলিয়ার প্রায় ৫০টি কারখানায় কর্মবিরতির খবর পাওয়া গেছে। নভেম্বরের শেষের দিকে নারায়ণগঞ্জ থেকে এই কর্মবিরতির সূত্রপাত।
আন্দোলনের মাত্রা সম্পর্কে সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দুপুরের পর তারা কাজ করছে না। হঠাৎ রাস্তায় নেমে আসছে। গাড়ি ভাঙচুর করছে। কোনো কিছু না বলেই বের হয়ে যাচ্ছে।
শ্রমিকদের উদ্দেশে বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, ন্যূনতম মজুরির গেজেট প্রকাশিত হয় গত ২৯ নভেম্বর, যা বাস্তবায়ন হবে ডিসেম্বর মাসের বেতনে এবং পরিশোধ করা হবে আগামী জানুয়ারির ৭ থেকে ১০ তারিখের মধ্যে। আপনাদের কাছে আমাদের একান্ত অনুরোধ, জানুয়ারি মাসে আপনাদের বেতন প্রাপ্তির পর যদি কোনো শ্রমিক ভাই বা বোনের আপত্তি থাকে, তা কারখানা কর্তৃপক্ষের কাছে তুলে ধরবেন। কারখানা কর্তৃপক্ষ যদি তা সমাধান করতে না পারে, তাহলে বিজিএমইএর কাছে আসবেন। এরপরও যদি মনে করেন আপনি খুশি নন, তাহলে সরকারের কাছে যাবেন।
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, নতুন মজুরি পাওয়ার আগে কোনো আন্দোলন করার যৌক্তিকতা নেই। আপনাদের সরলতার সুযোগ নিয়ে একটি স্বার্থান্বেষী মহল আসন্ন নির্বাচনের আগে আপনাদের উসকানি দিয়ে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই, ২০১৮ সালের এই মজুরি গেজেট ২০১৩ সালের মজুরি গেজেটের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই করা হয়েছে। তাহলে কারা এই প্ররোচনার সৃষ্টি করছে?
সংবাদ সম্মেলন থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে অনুরোধ করা হয়েছেÑ যারা আমাদের নিরীহ শ্রমিক ভাইবোনদের বিভ্রান্ত করে, তাদেরকে প্ররোচনা দিয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে চাইছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনুন।
সিদ্দিকুর রহমান বলেন, শ্রমিকদের উদ্দেশে বলতে চাই, এমন কিছু করবেন না যাতে ক্রেতাদের আস্থা বিনষ্ট হয়। কারণ ক্রেতারা মুখ ঘুরিয়ে নিলে আপনারা কর্মহীন হয়ে পড়বেন, যা কাম্য নয়।
পোশাক মালিকদের এই নেতা আরও বলেন, ১৫ দিন আগে গেজেট হয়েছে, এখন তিন-চার দিন ধরে কেন কথা হচ্ছে? কারণ ইলেকশন সামনে বলে একটি মহল সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করছে। যারা পেছনে আছেন, উসকানিদাতা, তাদের আইনের আওতায় আনতে হবে। এই সেক্টর নিয়ে কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেয়া হবে না।
সাবেক এফবিসিসিআই সভাপতি ও হামীম গ্র“পের এমডি এ কে আজাদ বলেন, আন্দোলনকারীরা কিছুক্ষণ বসে থাকে, কাজ না করে চলে যায়। অনেকেই বলছে, তাদের বেতন কমে গেছে। আমি কয়েকজনের সাথে কথা বলেছি, তারা ঠিকমতো তাদের সমস্যার কথাও বলতে পারছে না।
এ কে আজাদ আরও বলেন, দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বেছে বেছে ফ্যাক্টরিকে টার্গেট করা হচ্ছে। আজ (১২ ডিসেম্বর) আমার ফ্যাক্টরিতে বিদেশিরা এসেছিল। হেলিকপ্টার দিয়ে তাদের উদ্ধার করা হয়েছে। এই মেসেজ তো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়বে, এটা অনাকাক্সিক্ষত।
বিজেএমইএ নেতারা একটি মহল কর্তৃক গার্মেন্টসে অস্থিরতা তৈরির অভিযোগটি এমন একসময় আনলেন যখন দেশ একটি সাধারণ নির্বাচনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। যে তিনটি স্থানে (নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও সাভার) অস্থিরতা সৃষ্টির পাঁয়তারা চলছে, সে স্থানগুলোতে সারাদেশের ভোটারের উপস্থিতি আছে। গার্মেন্টসে কাজ করার সুবাদে এসব ভোটার কারখানার আশপাশেই ভোটার হয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, কেউ হয়ত যশোরের অধিবাসী, কিন্তু ভোটার হয়েছেন গাজীপুরে, আবার কেউ ফেনীর অধিবাসী ভোটার হয়েছেন নারায়ণগঞ্জে। দেখা যাচ্ছে, যেখানেই ফ্লোটিং ভোটারদের উপস্থিতি বেশি, সেখানেই অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে।
ফ্লোটিং ভোটাররা কাকে ভোট দেবে, সে বিষয়টি অনেকটা নির্ধারিত। এই ভোটারদের অধিকাংশের মতামত হলো উন্নয়ন কর্মকা-ে শেখ হাসিনার পৃষ্ঠপোষকতার কারণেই তাদের পক্ষে নিজ এলাকার বাইরে এসে কাজ পাওয়া সম্ভব হয়েছে। আর এ কারণেই এজাতীয় ভোটাররা আওয়ামী লীগকেই ভোট দিতে একাট্টা। বিষয়টি বিএনপি-জামায়াত অনুধাবন করতে পেরে এখন গার্মেন্টস শিল্পে অস্থিরতা তৈরির পাঁয়তারা করছে। তারা ভালোভাবেই বুঝেছে, তিন দফা বেতন বাড়িয়ে যে শেখ হাসিনা গার্মেন্টসের ন্যূনতম মজুরি সাড়ে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করেছেন, সে মজুরি পাওয়া শ্রমিকরা ভোটের লাইনে দাঁড়িয়ে নৌকা মার্কাতেই ভোট দেবেন।
গার্মেন্টসের লাখ লাখ কর্মী যাতে নৌকা মার্কায় ভোট দিতে না পারে, সেজন্য যে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে, তাকে থামিয়ে দিতে এখন সরকার তথা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। গার্মেন্টস সেক্টরের লাখ লাখ ভোট নৌকার পক্ষে নিতে হলে ভোটের আগেই এ জাতীয় অস্থিরতা সমূলে উৎপাটনের ব্যবস্থা নিতে হবে।