রাজনীতি

নিয়ন্ত্রণহীন বিএনপি: চিন্তিত দলের শীর্ষ নেতৃত্ব : মনোনয়নবাণিজ্যের প্রতিবাদে বিক্ষোভ-ভাঙচুর ও সহিংস তা-বে লিপ্ত বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিত নেতাকর্মী

নিজস্ব প্রতিবেদক
দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে পড়েছে বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতরা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিতদের কর্মী-সমর্থকরা ৭ ও ৮ ডিসেম্বর গুলশান ও নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগ এনে মিছিল-স্লোগানসহ বিক্ষোভ-ভাঙচুর ও সহিংস তা-ব চালায়। তারা নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে এবং কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়। কেউ কেউ মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগ এনে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে গালাগাল করে।
গুলশান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ প্রদর্শনকারীরা দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালায় এবং দলীয় মহাসচিবের গাড়িতে হামলা করে। এ সময় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িচালক আহত হন।
দলীয় নেতাকর্মীদের মুখে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠায় বিপাকে পড়ে যায় বিএনপি। মনোনয়নকে কেন্দ্র করে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে দলটি। এ নিয়ে চিন্তায় পড়ে যান দলের শীর্ষ নেতৃত্ব। পরিস্থিতি সামাল দেয়া অসম্ভব হতে পারে ভেবে কোনো কোনো আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করে দলীয় হাইকমান্ড। এই প্রক্রিয়ায় নড়াইল-১ ও ময়মনসিংহ-৩ আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করে বিএনপি। নড়াইল-১ আসনে আগে দেয়া হয়েছিল সাজ্জাদ হোসেনকে। পরে তার জায়গায় বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমকে দেয়া হয়। আর ময়মনসিংহ-৩ আসনে আগে দেয়া হয়েছিল আহাম্মদ তায়েবুর রহমান হিরণকে। পরে তার জায়গায় এস এম ইকবাল হোসেনকে মনোনয়ন দেয় বিএনপি। অন্য মনোনয়নবঞ্চিতরা এতে আরো ক্ষেপে যান।
এর মধ্যে অন্যতম চাঁদপুর-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপি নেতা আ ন ম এহছানুল হক মিলন, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার, গোপালগঞ্জ-১ আসনে দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী সেলিমুজ্জামান, মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, নির্বাহী কমিটির সদস্য হাসান মামুন, শেরপুর একটি আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ফাহিম চৌধুরীর সমর্থকরা তাদের অনুসারী নেতাকর্মীদের নিয়ে মনোনয়ন দিতে নয়াপল্টন ও গুলশান চেয়ারপারসনের কার্যালয়ের বাইরে সহিংস বিক্ষোভ প্রদর্শন করে কার্যালয়ের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের অবরুদ্ধ করে রাখে।
বিএনপির মনোনয়নবঞ্চিতদের বিক্ষোভ ৯ ডিসেম্বরও অব্যাহত থাকে। আগের দুই দিনের মতো এদিনও বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে দলের মনোনয়নবঞ্চিতদের কর্মী-সমর্থকরা সিনিয়র নেতাদের বিরুদ্ধে মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগ এনে প্রতিবাদের ঝড় তোলে। এ সময় তাদের মুখে স্লোগান ছিলÑ ‘অবৈধ নমিনেশন মানি না মানি না’, ‘মনোনয়নবাণিজ্য করেছে যারা সরকারের দালাল তারা’, ‘অবিলম্বে প্রার্থী পরিবর্তন করতে হবে, করতে হবে’। এ সময় ভেতর থেকে বার বার মাইকিং করে তাদের নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। তবে এ আহ্বানের প্রতিবাদে এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা গুলশান কার্যালয়ের গেট ভাঙার চেষ্টা করে।
৯ ডিসেম্বর গুলশান কার্যালয়ে প্রবেশ করতে গিয়ে মনোনয়নবঞ্চিতদের তোপের মুখে পড়েন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। এ সময় তিনি বলেন, তিনি বিএনপির কেউ নন, মনোনয়ন দেয়াও তার কাজ নয়।
এদিকে ঝিনাইদহ-৩ আসনে বিএনপি থেকে মনোনয়ন পেলেও শেষ মুহূর্তে জামায়াতের চাপে তাকে পরিবর্তন করে জামায়াতের মতিয়ার রহমানকে আসনটি দিয়ে দেয়া হয়। এর প্রতিবাদে বিএনপি থেকে পদত্যাগ করেন বিএনপির কেন্দ্রীয় সহ-সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক কণ্ঠশিল্পী মনির খান। ৯ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে তিনি বিএনপি ছাড়ার ঘোষণা দেন।
শেষ দিনে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে বিএনপির মধ্যে হ-য-ব-র-ল অবস্থা তৈরি হয়। মনোনয়নবঞ্চিতদের চাপের মুখে শেষ মুহূর্তে কিছু আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করে বিএনপি। প্রার্থী পরিবর্তন করে আবারও বাতিল করে নতুন প্রার্থী দেয়া হয়। যেমন ৯ ডিসেম্বর নতুন করে মনোনয়ন পান ৮ ডিসেম্বর খালেদার গুলশান কার্যালয়ের দরজায় লাথি-ঘুষি মারা দলটির প্রয়াত মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ারপুত্র ডাবলু। মানিকগঞ্জ-১ আসনে মনোনয়ন আগে এম এ জিন্নাহ কবিরকে দেয়া হলেও পরে চাপের মুখে ডাবলুকে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে আবারও ডাবলুকে বাদ দিয়ে আগের প্রার্থী বহাল রাখা হয়। এ ছাড়া শেরপুর-২ আসনে মোখলেছুর রহমান রিপনকে বাদ দিয়ে জাহেদ আলী চৌধুরী, ভোলা-১ আসনে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থকে পরিবর্তন করে দেয়া হয় বিএনপির গোলাম নবী আলমগীর, সিরাজগঞ্জ-৬ আসনে কামরুদ্দিন ইয়াহিয়া খানকে বাদ দিয়ে ড. এম এ মুহিত, ঢাকা-১৪ আসনে আমিনুল ইসলামকে বাদ দিয়ে আবুবকর সিদ্দিক সাজু, চট্টগ্রাম-৮ আসনে মোর্শেদ খানের পরিবর্তে আবু সুফিয়ান, সাতক্ষীরা-২ আসনে জামায়াতের মুফতি রবিউল বাশারকে বাদ দিয়ে বিএনপির ড. শহীদুল আলমকে মনোনয়ন দেয়া হয়। এছাড়া একাধিক প্রার্থীর মধ্যে শেষ পর্যন্ত কুমিল্লা-৫ এ অধ্যক্ষ ইউনুসকে, কুমিল্লা-১০ এ মনিরুল হক চৌধুরীকে, ফেনী-১ আসনে রফিকুল ইসলাম মজনুকে, ঢাকা-৫ এ নবীউল্লাহ নবীকে, ঢাকা-১ এ আবু আশফাককে, সিলেট-৬ আসনে ফয়সাল আহমেদ চৌধুরী ও ঢাকা-১৭ আসনে বিজেপির আন্দালিব রহমান পার্থকে মনোনয়ন দেয়া হয়।
৮ ডিসেম্বর মধ্যরাতে মনোনয়নবঞ্চিতদের হামলার শিকার বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ৯ ডিসেম্বর গুলশান কার্যালয়ে যাননি। এ কারণে গুলশান কার্যালয়ে মনোনয়ন বিতরণ কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। তবে মির্জা ফখরুল উত্তরার বাসায় বসে দলীয় কজন প্রার্থীর মধ্যে মনোনয়ন বিতরণসহ প্রয়োজনীয় কাজ সেরেছেন বলে জানা যায়। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানসহ কিছু নেতাকর্মী গুলশান কার্যালয়ে অবস্থান করলেও তারা ভেতর থেকে গেট বন্ধ করে রাখেন।
৯ ডিসেম্বর কুমিল্লা-৪ আসনের মনোনয়নবঞ্চিত সাবেক সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের এম আবদুল্লাহ, ঢাকা-৬ আসনের ইঞ্জিনিয়ার ইশরাকের পক্ষে কয়েক শত কর্মী-সমর্থক বিক্ষোভ শুরু করে। তারা বিভিন্ন স্লোগান দিতে দিতে সিনিয়র নেতাদের নামে মনোনয়নবাণিজ্যের অভিযোগ আনে। সেই সঙ্গে অবিলম্বে মনোনয়নবঞ্চিত যোগ্য নেতাদের মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানায়। কিন্তু তাদের দাবি অগ্রাহ্য করে বার বার গুলশান কার্যালয়ের ভেতর থেকে মাইকে বিক্ষোভকারীদের নিজ নিজ এলাকায় চলে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু যখনই এমন আহ্বান জানানো হয় তখনই বিক্ষোভকারীরা আরও বেশি উত্তেজিত হয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করতে থাকে।
এক পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের মধ্যে উত্তেজনা বেড়ে যায়। তারা খালেদা জিয়ার কার্যালয়ের প্রধান গেট ভাঙার চেষ্টা চালায়। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ না করার অনুরোধ জানিয়ে মাইকে বলা হয়, আজ অফিস বন্ধ। এতে আরও বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া কুমিল্লা-৪ আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর সমর্থকরা মাথায় সাদা কাপড় পরে গুলশান কার্যালয়ের ভেতরে থাকা নেতাকর্মীদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, যদি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীকে মনোনয়ন না দেয়া হয় তাহলে তারা ১৫ দিনের জন্য অনশনে যাবেন। এ সময় কেউ কেউ বলেন, আমরা গণহারে পদত্যাগ করব। বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা আরও বলেন, কুমিল্লা-৪ আসনে জেএসডির আবদুল মালেক রতনের সঙ্গে এলাকার মানুষের কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি ভোটকেন্দ্রে কোনো এজেন্ট দিতে পারবেন না। আমরা তাকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করলাম। তারা বলেন, মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী বিএনপির রাজনীতি করেন বলেই তার বিরুদ্ধে ২৯ মামলা।
মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর পক্ষে বিক্ষোভকারীরা বলেন, মুন্সীভাই আমাদের দলের নেতা, কুমিল্লা-৪ আসন থেকে তিনি ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। তাকে বাদ দিয়ে যাকে দেয়া হয়েছে তিনি কখনোই এলাকায় যান না। আমরা তাকে চিনি না, তাকে আমরা মানি না। অবৈধ নমিনেশন মানি না।
মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের মনোনয়নবঞ্চিত এম আবদুল্লাহর সমর্থকরাও বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বলেন, এম আবদুল্লাহর মনোনয়ন না নিয়ে তারা ফিরবেন না। এম আবদুল্লাহর কর্মী-সমর্থকরাও মাথায় সাদা কাপড়ের ব্যান্ড লাগিয়ে গুলশান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকে আমরা আবদুল্লাহ ভাইকে চাই, অন্য কাউকে মুন্সীগঞ্জ-১ আসনে মেনে নেব না। এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক পাওয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে ভোটারদের সংযোগ নেই বলেও তারা জানান।
একই সঙ্গে ঢাকা-১ আসনের আবু আশফাক উদ্দিনের সমর্থকদেরও গুলশান কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করতে দেখা যায়। তবে পরে তার মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়টি দলীয় হাইকমান্ড থেকে নিশ্চিত করা হলে তার কর্মী-সমর্থকরা সেখান থেকে চলে যায়।
এর আগে ৮ ডিসেম্বর সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত চাঁদপুর-১ আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন, নারায়ণগঞ্জ-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট তৈমুর আলম খন্দকার ও গোপালগঞ্জ-১ আসনের মনোনয়ন প্রত্যাশী সেলিমুজ্জামানসহ বেশকজন মনোনয়নবঞ্চিত নেতার কর্মী-সমর্থকরা নয়াপল্টন বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয় এবং খালেদা জিয়ার গুলশান কার্যালয়ে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে । তারা গুলশান কার্যালয় থেকে বের হওয়ার সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িতে হামলা করে। গাড়ি ভাঙচুরের পাশাপাশি তারা এক ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে মির্জা ফখরুলকে অবরুদ্ধ করে রাখে।
৮ ডিসেম্বর বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা চাঁদপুর-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলনের বিপুলসংখ্যক কর্মী সমর্থক কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে জড়ো হয়। প্রথমে তারা কার্যালয়ের ভেতরে থাকা দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে দেখা করে তাদের দাবির পক্ষে কারণ তুলে ধরেন। তারা বিএনপি কার্যালয়ের গেটে স্লোগান দিতে দিতে মিছিল করে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করেন। এক পর্যায়ে তারা বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গেটে তালা ঝুলিয়ে দেন। তারা অবিলম্বে চাঁদপুর-১ আসনে এহছানুল হক মিলনকে মনোনয়ন দেয়ার দাবি জানান। তাদের দাবির পক্ষে প্রতিবাদ মিছিল লেখা একটি ব্যানার ফটকে ঝুলিয়ে দেয়া হয়। কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের ফটকে তালা দেয়ায় ভেতরে আগে থেকে অবস্থান করা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভিসহ কজন নেতাকর্মী আটকা পড়েন। তবে এক পর্যায়ে মিলনের বাদ পড়ার বিষয়টি রুহুল কবির রিজভী দেখার আশ্বাস দিলে মিলনের সমর্থকরা রাস্তায় নেমে মিলন ভাই, মিলন ভাই বলে স্লোগান দিতে থাকেন। পরে তারা চাঁদপুর-১ আসনে মনোনয়নের বিষয়ে দলের সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানিয়ে প্রধান ফটকের তালা খুলে দেন। কিন্তু এর কয়েক ঘণ্টা পরে এহছানুল হক মিলনসহ আরওকজন মনোনয়ন প্রত্যাশীর অনুসারী কর্মী-সমর্থকরা সেখানে গিয়ে আবারও কার্যালয়ের প্রধান ফটকে তালা লাগিয়ে দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকে।
চাঁদপুর-১ আসনে মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক এহছানুল হক মিলন। কিন্তু সেখানে এবার মনোনয়ন পেয়েছেন বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য ও মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি মোশারফ হোসেন। ত্যাগী ও দলের জন্য নিবেদিত এহছানুল হক মিলনকে মনোনয়ন না দিয়ে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে মালয়েশিয়া বিএনপির সভাপতি আদম ব্যাপারি মোশারফ হোসেনকে মনোনয়ন দেয়ায় মিলন সমর্থকদের বিক্ষোভ ছিল বেশ আগ্রাসী।
নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বিক্ষোভ শেষে মনোনয়নবঞ্চিতদের কর্মী-সমর্থকরা বিএনপি চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে হামলা ও ভাংচুর করে। বিক্ষুব্ধরা গুলশান কার্যালয়ের সামনে এসে বিক্ষোভ করার পাশাপাশি ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। এর পর তারা কার্যালয়ের ফটকে গিয়ে ভাঙচুর করে। এক পর্যায়ে প্রধান ফটক ভেঙে ফেলার চেষ্টা করে। তাদের ছোড়া ইটের আঘাতে কার্যালয়ে জানালার কাচও ভেঙে যায়। এ সময় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও নজরুল ইসলাম খানসহ দলের কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা সেখানে অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন।
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লড়তে এবার বিএনপির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী আগ্রহ প্রকাশ করে। এরই অংশ হিসেবে এবার দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ৪ হাজার ৫৮০ জন বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে। একেকটি সংসদীয় আসনে গড়ে ১৫ জনেরও বেশি নেতাকর্মী মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করে। ৭ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ২০৬টি সংসদীয় আসনের জন্য ২০৬ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এতে বাদ পড়েন দলটির অনেক নেতা, আলোচিত সাবেক মন্ত্রী, এমনকি কয়েকজন সাবেক এমপিও।
এদের মধ্যে রয়েছেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান সেলিমা রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, গাজীপুরের সাবেক মেয়র ও সাবেক মন্ত্রী অধ্যাপক আবদুল মান্নান ও তার ছেলে মনজুরুল করিম রনী, সাবেক মন্ত্রী মেজর মঞ্জুর কাদের (অব.), সাবেক এমপি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মসিউর রহমান, সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহছানুল হক মিলন ও তার স্ত্রী নাজমুন নাহার বেবী, সাবেক এমপি ও সুনামগঞ্জ জেলা বিএনপি সভাপতি কলিম উদ্দিন মিলন, সাবেক এমপি ইসরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো, বিএনপি সাবেক মহাসচিব প্রয়াত খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের ছেলে খোন্দকার আবদুল হামিদ ডাবলু, দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়ার স্ত্রী সাহিদা রফিক প্রমুখ। সাবেক সাংসদ রাশেদা বেগম হীরা (চাঁদপুর-১) ও নিলুফার চৌধুরী মনি (জামালপুর সদর) আসনে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ২০০৮ সালে তারা সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির মনোনীত সাংসদ ছিলেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আতাউর রহমান ঢালী ঢাকা-১৩ আসনে মনোনয়ন চেয়েও পাননি। কুষ্টিয়া-৩ আসনের মনোনয়নবঞ্চিত হয়েছেন সাবেক সাংসদ সোহরাব উদ্দিন। ঢাকা-২০ আসনে সাবেক সাংসদ ব্যারিস্টার জিয়াউর রহমান খানও এবার মনোনয়ন পাননি। প্রয়াত মন্ত্রী হারুনুর রশীদ খান মুন্নুর মেয়ে দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আফরোজা খান রীতাও মানিকগঞ্জ-৩ আসনে মনোনয়ন চেয়ে পাননি। মনোনয়ন পাননি মেহেরপুর-২ আসনের সাবেক সাংসদ আমজাদ হোসেন। যদিও তাদের সবাইকে এবার মনোনয়ন দেয়ার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছিল বিএনপি হাইকমান্ডের পক্ষ থেকে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, লে. জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.), নজরুল ইসলাম খান, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া ও সালাউদ্দিন আহমেদ এবার দল থেকে মনোনয়ন চাননি। সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও মনোনয়ন চাননি। তবে দলীয় মনোনয়নের চিঠি পেয়েও মনোনয়নপত্র দাখিল করেননি ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু, যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিব-উন নবী খান সোহেল।
এদিকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বড় কোনো বিক্ষোভ হয়নি। ছোট-খাটো দু’একটি প্রতিক্রিয়া, এটা কি নতুন কিছু? বরং যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা নিজ নিজ এলাকায় অত্যন্ত জনপ্রিয়। আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে শুরু করে এলাকার মানুষের কাছে তাদের সম্পৃক্ততা অত্যন্ত নিবিড়। সুতরাং যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছে তারা প্রাণবন্ত এবং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল প্রতিকূলতার মুখে লড়ে যাবেন।
যিনি ধানের শীষের প্রতীক পেয়েছেন, তার সঙ্গে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আছেন, থাকবেন। আমি বিখ্যাত একজন ব্যক্তির উদ্ধৃতি করে বলছি যে, ‘আনন্দ দিনের চাইতে দুঃখ দিনের বন্ধন অনেক দৃঢ়।’
আমরা দুঃখের মধ্যে আছি, আমরা উৎপীড়নের মধ্যে আছি, আমাদের বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়। রিজভী এভাবে মনোনয়নবঞ্চিত বিএনপি নেতা ও তাদের কর্মী-সমর্থকদের শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীকে বিজয়ী করতে দলীয় নেতাকর্মীসহ সমগ্র দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।