Uncategorized

বাংলাদেশের নারী ফুটবলের উন্নয়নে এগিয়ে এলো ইউনিসেফ

ক্রীড়া প্রতিবেদক : সবার জন্য শিক্ষার পাশাপাশি মেয়েদের খেলাধুলার জন্য দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে জাতিসংঘের অঙ্গসংস্থা ইউনিসেফ। এবার বাংলাদেশের নারী ফুটবলের (অনূর্ধ্ব-১৬) উন্নয়নে এগিয়ে এসেছে তারা।
দেশের ৬৪ জেলায় প্রতিভা অন্বেষণ ও টুর্নামেন্ট আয়োজনের মাধ্যমে মেয়েদের উৎসাহিত এবং ভবিষ্যতে জাতীয় দল গঠনে বাফুফের সঙ্গে কাজ করবে প্রতিষ্ঠানটি। ৩ ডিসেম্বর বাফুফে ভবনে দুপক্ষের মধ্যে এ সংক্রান্ত এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দুই বছর মেয়াদি এ চুক্তিতে বাফুফের পক্ষে সভাপতি কাজী সালাহউদ্দিন ও ইউনিসেফের বাংলাদেশ প্রতিনিধি এডওয়ার্ড বেগবেদার স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠানে বেগবেদার বলেন, এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশজুড়ে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা প্রতিভা তুলে আনার মাধ্যমে খেলাধুলার জগতে ইউনিসেফের অংশীদারিত্ব বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি হবে। খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের কাছে পৌঁছানো ছিল ইউনিসেফের একটি সুস্পষ্ট পদক্ষেপ এবং সাধারণভাবে শিশুদের বিশেষ করে মেয়ে শিশুদের ক্ষমতায়নে ফুটবলের মতো খেলা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের অনূর্ধ্ব-১৬ জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড়রা এখন মেয়েদের ক্ষমতায়ন ও শৃঙ্খলমুক্তির আদর্শস্বরূপ এবং তারা দেশের মেয়েদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। খেলাধুলা সাম্য ও সকলের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টিকে তুলে ধরে এবং সমাজের বদ্ধমূল ধারণা ও নেতিবাচক রীতিনীতি ভাঙতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেসব ধারণা ও রীতিনীতি বাল্য বিবাহ, শিশু পাচার ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাসহ মেয়েদের বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি করে।
উল্লেখ্য, প্রতিটি শিশুর অধিকার এবং সমৃদ্ধির জন্য কাজ করে যাচ্ছে ইউনিসেফ। অংশীদারদের সাথে ১৯০টি দেশ ও অঞ্চলে এই অঙ্গীকারকে বাস্তবে পরিণত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে তারা। সর্বত্র সকল শিশুর কল্যাণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ও বঞ্চিত শিশুদের কাছে সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে দেয়ার জন্য বিশেষ প্রচেষ্টাকেন্দ্রিক এই কর্মকা- চালিয়ে যাচ্ছে ইউনিসেফ।
আসলে মেয়েরাই এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের মেয়েদের ফুটবল। ময়মনসিংহের ধোবাউড়া উপজেলার কলসিন্দুর স্কুল ও কলেজ সবচেয়ে প্রতিভাবান খেলোয়াড় জোগান দিয়েছে মেয়েদের ফুটবলে। জাতীয় যুব মহিলা দলে এই অঞ্চল থেকে খেলছে ১১ খেলোয়াড় এবং তারা প্রত্যেকে গত ৪ বছরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। যাদের মধ্যে আছে গোলরক্ষক মাহমুদা আক্তার, ডিফেন্ডার শামসুন্নাহার ও মিডফিল্ডার সানজিদা আক্তার ও মারিয়া মান্ডা।
ধীরে ধীরে দেশের অন্যান্য অঞ্চল ময়মনসিংহের মহিলা ফুটবলের আধিপত্যের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে। কলসিন্দুরের সঙ্গে অন্যান্য এলাকা থেকে আসা মেয়েরাও কম অবদান রাখেনি। টাঙ্গাইলের কৃষ্ণা রানী, কুষ্টিয়ার নীলা (নীলুফা ইয়াসমিন), রংপুরের ইশরাত জাহান মৌসুমী ও সিরাত জাহান স্বপ্না দারুণ খেলছে।
জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকা ৩৯ জন মেয়ের মধ্যে ময়মনসিংহের ১১, রংপুরের ৮, সাতক্ষীরার ৪, তিনজন করে ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, কুষ্টিয়া ও একজন করে রাজশাহী, সিলেট ও কক্সবাজারের।
সম্প্রতি ঠাকুরগাঁওয়ের সাঁওতাল মেয়েরা নজর কেড়েছে। গত বছরের অনূর্ধ্ব-১৪ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপের রানার্স-আপ হওয়া ঠাকুরগাঁও দলের আট মেয়ে এসেছে সাঁওতাল পরিবার থেকে, যারা উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিয়েছে।
যুব মহিলা ফুটবলে বাংলাদেশের সাফল্যের পেছনে ভৌগোলিক একটা বিষয়ও থাকতে পারে। ভারতের যুব মহিলা দল সম্প্রতি বাংলাদেশে এসেছিল অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে। তাদের প্রধান কোচ মায়মল রকি দীর্ঘদিন কাজ করছেন মেয়েদের ফুটবলের সঙ্গে। তিনি জানিয়েছেন, মনিপুর ও উড়িষ্যৎার মেয়েরা সবসময় ফর্মে থাকে ভারতের মহিলা দলের নিয়ন্ত্রণও থাকে তাদের হাতেই। এই দুটি রাজ্য অবস্থিত ভারতের উত্তরাঞ্চলে এবং রাজ্য দুটির মাঝেই অবস্থান বাংলাদেশের। গত ৩ বছরের সাফল্যময় ভ্রমণে বাংলাদেশের মেয়েরা হারিয়েছে তাদের পশ্চিমে থাকা এশিয়ার প্রায় সব দেশকে, যদিও হারাতে ব্যর্থ হয়েছে পূর্বে থাকা বেশিরভাগ দেশকে।
বাফুফের সেক্রেটারি আবু নাঈম সোহাগ বলেন, তারা বাংলাদেশের প্রতিভাবান মহিলা ফুটবলারদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীরভাবে ভাবছি। এজন্য বিকেএসপিতে মেয়েদের প্রাথমিক বন্দোবস্ত করা হয়েছে। শিগগিরই একটা জিমের ব্যবস্থা হয়ে যাবে মেয়েদের। এশিয়ার শীর্ষ দেশগুলো থেকে বাংলাদেশের মেয়েরা পিছিয়ে আছে ফিটনেসে।
আবু নাঈমের মতে, যদি জাতীয় দলের শীর্ষ পর্যায়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়, তবে প্রথমে খেলোয়াড়দের শারীরিক শক্তি নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিশ্বাস করেন যে, মেয়েদের নিয়ে বাফুফের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সিনিয়র পর্যায়েও আলো ছড়াতে পারবেন তারা।
মহিলা ফুটবলে বেশিরভাগ মেয়েরা এসেছে অসচ্ছল পরিবার থেকে। তারাই বেছে নিয়েছে মহিলা ফুটবলকে, যেখানে ভবিষ্যৎ কিংবা সচ্ছলভাবে বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ৩৯ জন মেয়ের মধ্যে ২১ জন মাসে ১০ হাজার টাকা বেতন পায় বাফুফে থেকে, বাকিরা পায় ৩ হাজার টাকা।
যদি দেশের মহিলা ফুটবলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়, তাহলে ২০০২ ও ২০০৯ সাল ছিল মেয়েদের ফুটবল চালুর প্রথম ধাপ; যখন মহিলা ক্রীড়া সংগঠক ও নারীবাদী কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন মৌলবাদীদের প্রতিরোধ ভাঙার পথে, যারা আটকাতে চেয়েছিল মেয়েদের ফুটবলকে।
দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত পর্বটা শুরু স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে, যেখানে দূর হয়ে যায় মেয়েদের নিয়ে সব কুসংস্কার।
কোনো সন্দেহ নেই, জাতীয় যুব মহিলা দলের ধারাবাহিক সাফল্যের গল্প দেশের মেয়েদের অন্যান্য খেলায় অনুপ্রেরণা জোগাবে। মেয়েদের অনুপ্রেরণা জোগাতে এই মিছিলে যোগ দিয়েছে ইউনিসেফ। আন্তর্জাতিক এই সংস্থা মেয়েদের ফুটবলে পৃষ্ঠপোষকতা নিয়ে এগিয়ে আসায় এখন বলা যায়, বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল এগিয়ে যাবে দৃঢ়ভাবে।