প্রতিবেদন

বায়তুল মোকাররমসহ দেশের বৃহৎ ও নামকরা মসজিদগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ভূমিকা

নিজস্ব প্রতিবেদক : বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ১৯৬০ সালের ২৭ জানুয়ারি এ মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ফিল্ড মার্শাল মুহাম্মদ আইয়ুব খান। প্রখ্যাত স্থপতি টি. আবুল হোসেন থারিয়ানি মসজিদ কমপ্লেক্সটির নকশা প্রণয়ন করেন। পবিত্র কাবা শরিফের আদলে এর ডিজাইন করা হয়েছে, যাতে আধুনিক ও মুসলিম স্থাপত্যশৈলীর চমৎকার সমন্বয় ঘটেছে। পুরো কমপ্লেক্স নকশার মধ্যে দোকান, অফিস, লাইব্রেরি ও গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
১৯৬৩ সালে বায়তুল মোকাররম মসজিদের প্রথম পর্বের নির্মাণকাজ শেষ হয়। ১৯৬৩ সালের ২৫ জানুয়ারি শুক্রবার বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রথম জুমআর নামাজ আদায় করা হয় এবং পরদিন তারাবীহ নামাজের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। এটি বাংলাদেশের বৃহত্তম মসজিদ।
সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় এবং সৌদি সরকারের অর্থায়নে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের ১৭০ ফুট সুউচ্চ মিনার নির্মাণ, ২০ হাজার মুসল্লির জন্য দক্ষিণ পাশের সাহান সম্প্রসারণসহ মুসলিম স্থাপত্যশৈলী অনুযায়ী আর্চওয়ে স্থাপন ও প্রবেশ তোরণ নির্মাণ, ৫ সহস্রাধিক মহিলার নামাজ আদায়ের জন্য মহিলা নামাজকক্ষ সম্প্রসারণ, ৫০০ গাড়ির জন্য আন্ডারগ্রাউন্ড নির্মাণ ও অজুখানা সংস্কার ও সৌন্দর্যবৃদ্ধির কাজ করা হয়।
বায়তুল মোকাররম মসজিদ নির্মাণের লক্ষ্যে সরকার ৮.৩০ একর জমি বরাদ্দ দেয়। ৭ তলাবিশিষ্ট মসজিদের আয়তন ৬০ হাজার বর্গফুট। বর্তমানে মূল মসজিদ এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্ব সাহান মিলিয়ে ৩৫ হাজারের বেশি মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদের অভ্যন্তরে ওজুর ব্যবস্থাসহ মহিলাদের জন্য পৃথক নামাজকক্ষ রয়েছে। মসজিদের পূর্ব-দক্ষিণ কোণে ৪ তলাবিশিষ্ট দ্বীনি পুস্তকসমৃদ্ধ আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সমন্বিত একটি লাইব্রেরি রয়েছে। মসজিদের নিচতলায় রয়েছে একটি বৃহৎ ও অত্যাধুনিক সুসজ্জিত মার্কেট।
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামি মূল্যবোধের প্রচার ও প্রসারকল্পে ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট ১৯৭৫ বলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। একই সাথে বায়তুল মোকাররম সোসাইটি বিলুপ্ত করে এর সকল দায় পরিসম্পদ ও সম্পত্তি, ব্যাংক স্থিতি ইত্যাদি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। বর্তমানে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের একজন পরিচালক বায়তুল মোকাররম মসজিদ পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছেন।
জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ
চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক মানের মসজিদ ও ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ার প্রত্যয়ে ১৯৭৬ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের দামপাড়ায় গড়ে ওঠে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম সুন্দর আন্তর্জাতিক মানের মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ও ইসলামি কেন্দ্র। এটি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য হলো ইসলামের প্রচার ও প্রসার, ইসলামিক সেন্টার, ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার স্থাপন, লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা, ইসলামিক স্কুল, মসজিদ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করা।
সরকার কর্তৃক ১৯৭৬ সালে ১২ একর জমি জমিয়তুল ফালাহর নামে হস্তান্তর করা হয়। চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে পদাধিকার বলে সভাপতি করে ‘জমিয়তুল ফালাহ সোসাইটি’ গঠন করা হয়। ১৯৭৬ সাল হতে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত জমিয়তুল ফালাহ সোসাইটি ওই মসজিদ কমপ্লেক্স পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে আসছিল। কিন্তু মসজিদের আশানুরূপ উন্নয়ন সাধিত না হওয়ায় ১৯৮২ সালে জমিয়তুল ফালাহ সোসাইটির কার্যক্রম স্থগিত করে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ কমপ্লেক্সের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওপর ন্যস্ত করা হয়। তৎকালীন শিক্ষা ও ধর্মমন্ত্রীকে চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনারকে ভাইস-চেয়ারম্যান এবং জমিয়তুল ফালাহর প্রকল্প পরিচালককে এর সদস্য-সচিব করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালকে পদাধিকারবলে জমিয়তুল ফালাহ-এর প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ করা হয়। সেই থেকে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ও কমপ্লেক্স পরিচালনার জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য-সচিবের দায়িত্ব পালন করেন।
জমিয়তুল ফালাহ সোসাইটির উদ্দেশ্য ও কার্যাবলি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্য ও কার্যাবলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ায় ওংষধসরপ ঋড়ঁহফধঃরড়হ (অসবহফসবহঃ) অপঃ-২০১৩ মারফত জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ ও কমপ্লেক্স সকল সম্পদ ও সম্পত্তিসহ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। সেই থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন যথারীতি জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে আসছে।

জমিয়তুল ফালাহ্ মসজিদ
ও ইসলামি কেন্দ্র
জমিয়তুল ফালাহ মসজিদ অনেকগুলো খিলানসহ চমৎকার স্থাপত্যে নির্মিত। ৬তলা ভিতের ওপর বর্তমানে ৫তলাবিশিষ্ট এই মসজিদটিতে একত্রে প্রায় ২০ হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মূল ভবনের সামনে একটি সুবিশাল জায়গা রয়েছে যেখানে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহার সময় ঈদের নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। ঈদের সময় এখানে প্রায় ৫০ হাজার মুসল্লি সমবেত হন। বর্তমানে জমিয়তুল ফালাহকে এমন একটি আন্তর্জাতিক মানের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে, যেখান থেকে ইসলামের সাংস্কৃতিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক জ্যোতির রশ্মিচ্ছটা ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বের দিকে দিকে।

আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ বন্দরনগরী চট্টগ্রামে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এর সঙ্গে মোগলদের চট্টগ্রাম বিজয়ের কাহিনি জড়িত।
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্য ও গঠন মোগলরীতি অনুযায়ী তৈরি। মসজিদটি নির্মাণকৌশলগত দিক থেকে দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদের প্রায় প্রতিচ্ছবি হওয়ায় এটি চট্টগ্রাম অঞ্চলের মুসলিম স্থাপত্য বিকাশের ক্ষেত্রে নতুন মাত্রার জন্ম দেয়। এ মসজিদে প্রায় ১৫ হাজার মুসল্লি একত্রে নামাজ আদায় করতে পারেন।
১৬৬৬ সালে নবাব শায়েস্তা খাঁর ছেলে উমেদ খাঁ আরাকানী মগ ও পর্তুগীজ জলদস্যুদের হাত থেকে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার করেন এবং শত্রু সৈন্যকে পরাজিত ও বিতাড়িত করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের নির্দেশে চট্টগ্রাম বিজয়ের স্মৃতি ধরে রাখতে শায়েস্তা খাঁ ১৬৬৭ সালে এখানে নির্মাণ করেন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। নির্মাণের পর থেকেই এ মসজিদ চট্টগ্রামের ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের তীর্থস্থান হয়ে ওঠে।
১৭৬১ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ মসজিদটি গোলাবারুদ রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করে। ১৮৮৪ সালে সমাজসেবক ও কবি খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খাঁর আবেদনের প্রেক্ষিতে মসজিদটি আবারও উন্মুক্ত হয়। দীর্ঘ ৯৫ বছর পর পুনরায় শাহী মসজিদের আযান ধ্বনি চট্টগ্রামবাসীর প্রাণে নতুন করে সাড়া জাগায়।
১৮৫৭ সালে শাহী মসজিদের সকল সম্পত্তি খান বাহাদুর হামিদুল্লাহ খানের ওয়াকফ এস্টেটের অন্তর্ভুক্ত হয়। তিনি মসজিদের বেশকিছু নির্মাণ ও সংস্কার কাজ সম্পাদন করেন। ধীরে ধীরে মসজিদ পরিচালনায় জটিলতা সৃষ্টি হওয়ায় হাইকোর্টের একটি রায়ের ভিত্তিতে ১৯৬২ সালে শাহী মসজিদের ওয়াকফ এস্টেট পুনরায় পৃথক করা হয়। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে একটি কমিটির ওপর মসজিদের ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয়।
১৯৮৬ সালে ঞঐঊ ঈঐওঞঞঅএঙঘএ ঝঐঅঐও ঔঅগঊ গঅঝঔওউ ঙজউওঘঅঘঈঊ, ১৯৮৬ মারফত আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ সকল সম্পদ ও সম্পত্তিসহ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের অধীনে ন্যস্ত করা হয়। সেই থেকে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ পরিচালিত হয়ে আসছে।