অর্থনীতি

বৈশ্বিক অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক
টেকসই প্রবৃদ্ধি, তরুণ এবং উদ্যমী কর্মশক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন বাংলাদেশকে শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলতে সহায়তা করছে। এ অবস্থা আগামী ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে দেশটিকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির একটি বড় অংশ হিসেবে গড়ে তুলবে।
আন্তর্জাতিক অ্যাডভাইজারি ফার্ম ডিলোটি এক পর্যবেক্ষণে এ কথা বলেছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গত এক দশকে লিঙ্গ বৈষম্য, শিশু মৃত্যুহার ও গড় আয়ু বৃদ্ধির মতো সকল সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
ডিলোটি বাংলাদেশ লিমিটেডের বোর্ড সদস্য জয়দীপ দত্ত গুপ্ত এ বিষয়ে বলেন, বাংলাদেশ সকল আর্থসামাজিক সূচকে খুবই ভালো করেছে। দেশটি ৭.৫ ভাগেরও বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে এবং সামাজিক সূচকগুলোর উন্নতি হয়েছে।
তিনি বলেন, আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক গ্রাহক বাংলাদেশে ব্যবসা করছে। বাংলাদেশি গ্রাহকদের ব্যবসাও বেড়েছে। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো এবং আর্থিক ও সামাজিক সূচকসহ নির্দিষ্ট কিছু খাতে সরকারি সংস্থা এবং দাতা সংস্থা থেকে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য বেড়েছে।
জয়দীপ দত্ত গুপ্ত বলেন, ডিলোটির গ্রাহকদের চাহিদার আলোকে অ্যাডভাইজারি ফার্মটি বাংলাদেশে অফিস করেছে। আমাদের বাংলাদেশি গ্রাহকদের মান বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেড়ে উঠছে। আমাদের অনেক গ্রাহক আরো উন্নত মানের সেবা পেতে বাংলাদেশে অফিস খুলতে আমাদের অনুরোধ জানিয়েছে। ডিলোটি তাদের গ্রাহকদের সেবা প্রদানে সম্প্রতি বাংলাদেশে তাদের অফিস উদ্বোধন করেছে।
গুপ্ত বলেন, তাদের ফার্ম বেসরকারি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানকে অডিট, ট্যাক্স,আইন, আর্থিক পরামর্শ, ঝুঁকি পরামর্শসহ বিভিন্ন ধরনের সেবা প্রদান করবে। তারা ওষুধ, চামড়া, বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি, ভোগ্যপণ্য ও কৃষি পণ্যসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়ে সেবা প্রদান করবে। এছাড়া শতাধিক পেশাদার এবং উঁচুমানের গ্রাহকের কেন্দ্রবিন্দু তৈরি এবং পরবর্তী কয়েক বছরে বিভিন্ন সেক্টরে কর্মশক্তি সৃষ্টি করবে বলেও আশা করছে।
গুপ্ত বলেন, বিশ্বের দেড় শতাধিক দেশে তাদের পদচারণা রয়েছে। তারা বহুজাতিক ফার্মগুলোকে একুইজেশন ও মার্জার জবসহ বাণিজ্য পরামর্শ দিয়ে আসছে।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশি ম্যানেজিং পার্টনার নূরুল হক বলেন, আমরা ডিলোটি নেটওয়ার্কে যোগ দিতে পেরে গর্বিত। এর আন্তর্জাতিক মানের সেবা ইনোভেশন ও নীতির জন্য আমরা শ্রদ্ধা জানাই। ডিলোটি বাংলাদেশের গ্রাহকদের যথাযথ মূল্যায়ন করবে এবং স্থানীয় মেধাসম্পন্ন উদ্যোক্তা বিকাশে ভূমিকা রাখবে বলেও তিনি আস্থা ব্যক্ত করেন।
শুধু ডিলোটিই নয়, অনেক পর্যবেক্ষক সংস্থাই বলছে, বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগের সুযোগ অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে অনেক বেশি। সাম্প্রতিককালে, সরকার বেসরকারি বিনিয়োগে একটি সহায়ক ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ সৃষ্টির লক্ষ্যে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নীতির ক্ষেত্রে বেশ কিছু পুরাতন ব্যবসার সংস্কার করেছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক নীতিসমূহের ক্ষেত্রে সরকার দ্রুত সুনির্দিষ্ট সংস্কার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে এবং সবার জন্য উন্মুক্ত বিনিয়োগ নীতি প্রণয়ন করেছে। এক্ষেত্রে সরকারের ভূমিকা অনুঘটকের, কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রকের নয়। নিয়ন্ত্রণ ও বিধিনিষেধকে ন্যূনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। সরকার সুষম গতিতে বাণিজ্য ক্ষেত্রে উদারীকরণ করেছে। শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা, যৌক্তিক শুল্ক নির্ধারণ এবং রপ্তানি সুবিধা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অর্জন সাধিত হয়েছে। শিল্পহার কাঠামো ও আমদানি নীতির বিভিন্ন দিক সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত শিল্প ও বাণিজ্য প্রতিষ্ঠানসমূহের অদক্ষতা, সম্পদের অপব্যবহার প্রবণতা এবং পরিবর্তনশীল বাজার ও ভোক্তা চাহিদা নির্ধারণে অক্ষমতা সরকারকে ব্যাপকভিত্তিক বেসরকারিকরণ কর্মপরিকল্পনা হাতে নিতে বাধ্য করেছে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সহায়ক ও আকর্ষণীয় প্রস্তাবসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে।
টেক্সটাইল, চামড়াজাত সামগ্রী, ইলেকট্রনিক্স দ্রব্য, রাসায়নিক ও পেট্রোকেমিক্যাল, কৃষি ভিত্তিক শিল্প, কাঁচা পাট, কাগজ, রেশম শিল্প, হিমায়িত খাদ্য (বিশেষত চিংড়ি), পর্যটন, কৃষি, ক্ষুদ্র শিল্প, সফটওয়্যার ও ডাটা প্রসেসিংয়ের মতো রপ্তানিমুখী শিল্পে বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। এছাড়াও ভারী ও তথ্যপ্রযুক্তির শিল্প প্রতিষ্ঠায়ও বিদেশি বিনিয়োগকে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে, যা দেশীয় আমদানি ব্যয় কমাতে সাহায্য করবে।
ডিলোটি তার পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের কিছু বিদেশি বিনিয়োগ সুবিধা উল্লেখ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেÑ ক. ১০০ ভাগ সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ (ডিএফআই) অথবা রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকাতে (ইপিজেড) যৌথ বিনিয়োগ অথবা এ এলাকার বাইরের বিনিয়োগ সুবিধা। খ. স্টক এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে পাবলিক কোম্পানির শেয়ার ক্রয়ের দ্বারা তালিকাভুক্ত বিনিয়োগ সুবিধা। গ.অবকাঠামোগত প্রকল্পে বিনিয়োগ যেমন বিদ্যুৎ খাত, তেল, গ্যাস ও খনিজ অনুসন্ধান, টেলিযোগাযোগ, বন্দর, সড়ক ও জনপথ সুবিধা। ঘ. সরাসরি বা প্রত্যক্ষ ক্রয় অথবা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার ক্রয় করার সুবিধা এবং ঙ. বেসরকারি ইপিজেডে বিনিয়োগ সুবিধা।
ডিলোটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, বেসরকারি উদ্যোগে রপ্তানিমুখী ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প প্রতিষ্ঠায় দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সব ধরনের সেবা প্রদানের জন্য বিনিয়োগ বোর্ড দায়িত্বপ্রাপ্ত। সব ধরনের বিনিয়োগকারীকে বিনিয়োগ ও ব্যবসা সহায়তা প্রদান করা এই বোর্ডের মূল লক্ষ্য। সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে পরিচালিত এ বোর্ডে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সচিবালয় এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিনিধিগণ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে এ বোর্ড ইতোমধ্যে বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। বিনিয়োগ বোর্ড বিভিন্ন সেবা দেয়ার সাথে সাথে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে দ্রুত গতিশীল করতে বিশেষত শিল্পায়নকে শক্তিশালী করতে সরকার বিদেশি বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করতে একটি উন্মুক্ত নীতি গ্রহণ করেছে। বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ কর্তৃপক্ষ (বেপজা) দেশের রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকায় বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা ও শিল্প স্থাপনে বিভিন্ন সহায়তা প্রদানে দায়িত্ব পালন করছে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছে এবং তাদের আস্থা অর্জনে সফল হয়েছে।