প্রতিবেদন

ভারতীয় গবেষকদের মন্তব্য: শেখ হাসিনা সরকারের উন্নয়নের সঙ্গে কোনো তুলনাই চলে না

স্বদেশ খবর ডেস্ক
বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারতের তিনজন নামকরা গবেষক ও পর্যবেক্ষক বলেছেন, বিএনপি সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের অর্থনৈতিক অর্জন কেনো তুলনাতেই আসবে না। প্রবৃদ্ধি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা যদি উন্নয়নের প্রধান মাপকাঠি হয় তাহলে আসন্ন নির্বাচনে বাংলাদেশের ভোটারদের আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প বেছে নেয়ার অবকাশ নেই।
ভারতের তিন গবেষক বলেছেন, বিগত এক দশকে বাংলাদেশের যে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তথা সার্বিকভাবে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটেছে তা নিয়ে দ্বিমত করার কোনো সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক অতীতে বহুবার শেখ হাসিনা সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’। গত নভেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই ইকোনমিস্টই লিখেছে, ‘আওয়ামী লীগের শাসনে অর্থনীতির অভূতপূর্ব প্রবৃদ্ধি হয়েছে। গত বছর বাংলাদেশের জিডিপি সম্প্রসারিত হয়েছে ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে, যা ভারত বা পাকিস্তানের চেয়েও অনেক বেশি।’
দ্য ইকোনমিস্ট আরও লেখে, জনমত জরিপগুলোও বলছে মানুষ সার্বিকভাবে সরকারের কাজকর্মে সন্তুষ্ট। সামরিক অভ্যুত্থানের কোনো আশঙ্কা নেই বললেই চলে। এবং তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবেশী ভারতও প্রচ্ছন্নভাবে আওয়ামী লীগকেই সমর্থন করছে।
দ্য ইকোনমিস্টের এই পর্যবেক্ষণ থেকে বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, ব্যাপক ও বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকা-ই নির্বাচনে শেখ হাসিনা সরকারকে প্রতিপক্ষের চেয়ে অনেক এগিয়ে রেখেছে। কিন্তু বিএনপি জামানার চেয়ে সেই কাজের ধারা কোথায় আর কিভাবে আলাদা এমন প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন দিল্লির বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও থিংকট্যাঙ্কে যুক্ত তিনজন নারী পর্যবেক্ষক।
বিবেকানন্দ ইন্টারন্যাশনাল ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো ড. শ্রীরাধা দত্ত বলেন, বহু বছর ধরে আমার বাংলাদেশে যাতায়াত, এখন যেন দেখছি অনেক অনেক দিন পর সে দেশে এক বিপুল কর্মযজ্ঞ শুরু হয়েছে। গত দশ বছর ধরে প্রবৃদ্ধির হার সেখানে ৭ শতাংশের ওপর, এটা তো এক সাংঘাতিক অর্জন!
তিনি বলেন, বিএনপি আমলে একটা বিরাট সমস্যা ছিল বিদ্যুতের সংকট। সাধারণ মানুষ তো নাকাল ছিলেনই, বিদ্যুতের অভাবে ধুঁকছিল দেশের শিল্প, বিশেষত তৈরি পোশাক খাত। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই সেদিকে নজর দিয়েছিলেন, ভারত থেকে বিদ্যুৎ আনার চুক্তি করে এবং আরও নানা পদক্ষেপ নিয়ে সেই পরিস্থিতির অনেক উন্নতি ঘটিয়েছেন তিনি।
ড. শ্রীরাধা দত্ত বলেন, আর দারুণ সব কাজকর্ম হচ্ছে সে দেশের অবকাঠামো খাতেও। শুধু পদ্মাসেতুই নয়, রাস্তাঘাট রেল অবকাঠামো থেকে শুরু করে আরও নানা দিকে যেভাবে বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে, কিংবা ঢাকার মতো শহরে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে, তাতে যেমন কর্মসংস্থান হবে, তেমনি তার সুফল পাবে সাধারণ মানুষও।
এই গবেষক আরও বলেন, বিএনপি আমলে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোনগুলোতে (ইপিজেড) নানা সমস্যা লেগেই ছিল। এখন কিন্তু শিল্প পরিস্থিতি অনেক ভালো, অনেক নিয়ন্ত্রণে। শেখ হাসিনা সরকার চীন ও ভারতের জন্য আলাদা জায়গা নির্দিষ্ট করে ইপিজেড তৈরির কাজও শুরু করে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে শ্রীরাধা বিশ্বাস করেন, গত এক দশকে বাংলাদেশ একটা কৃষিনির্ভর অর্থনীতির দেশ থেকে অনেক আপগ্রেডেড হয়েছে, আর সেই কৃতিত্ব শেখ হাসিনার সরকারকে না দিয়ে কোনো উপায় নেই।
ইন্ডিয়ান কাউন্সিল ফর রিসার্চ অন ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক রিলেশন্সের (ইকরিয়ের) অধ্যাপক ড. অর্পিতা মুখার্জী বলেন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা যে একটা দেশের অর্থনীতির উন্নয়নকে কতটা সাহায্য করে আমি বলব, বাংলাদেশে গত দশ বছরের আওয়ামী লীগ শাসন তার একটা ক্লাসিক দৃষ্টান্ত। মাত্র এক দশক আগেও যে দেশটা হরতাল-বন্ধ-রাজনৈতিক সংঘাতের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, সেখানে এখন অর্থনীতির চাকা এগোচ্ছে জোর কদমে।
তিনি বলেন, আমি সে দেশের তৈরী পোশাক খাতকে খুব কাছ থেকে দেখি এবং আমার বলতে কোনো দ্বিধা নেই, তারা সেখানে ভারতের চেয়েও অনেক ভালো করছে। বহু বছর ধরে একটা জায়গায় আটকে থাকার পর তারা এখন জোর দিয়েছে গুণগত মান বৃদ্ধির ওপর, আর সেখানে সরকার ওই শিল্পকে ভীষণভাবে সাহায্য করছে।
ড. অর্পিতা মুখার্জী বলেন, বিশ্বাস করবেন কি না জানি না, ডিএফআইডি-র মতো দাতা সংস্থার প্রতিনিধিরা যখন বাংলাদেশ ঘুরে ভারতে আসেন, তারা আমাদের জিজ্ঞেস করেন বাংলাদেশ অনুদানের টাকা এত ভালোভাবে খরচ করতে পারলে বা ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ে (সামর্থ্য নির্মাণ) কাজে লাগাতে পারলে ভারত কেন সেটা পারছে না? তখন সত্যিই কী উত্তর দেব আমরা বুঝে পাই না!
তিনি আরও বলেন, আর একটা জিনিস না বললেই নয়, বর্তমান বাংলাদেশ সরকার যেভাবে সেখানে জঙ্গিবাদের মূলোৎপাটন করতে শুরু করেছে সেটাও কিন্তু অর্থনীতির গতিকে অনেক আশ্বস্ত করেছে।
এই অধ্যাপক বলেন, হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার আগে-পরে তারা যেভাবে মৌলবাদের মোকাবিলা করেছে, সেটা সত্যিই শেখার মতো। অথচ এই বাংলাদেশেই আমরা এক যুগ আগে দেখেছিলাম বাংলাভাই বা জেএমবি কিভাবে প্রচ্ছন্ন সরকারি মদদে অবাধে তাদের তৎপরতা চালিয়েছিল।
ড. মুখার্জী বলেন, গত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতির একটা গুণগত উত্তরণ হয়েছে, তারা অনেক অ্যাকাডেমিক হয়ে উঠেছে। যেমন ধরুন, বাংলাদেশ এখন আর শুধু দুবাই-কুয়েতে লো-স্কিলড লেবার পাঠানোর কথাই ভাবে না; দলে দলে পেশাদারদেরও তারা বিদেশে কাজ করতে পাঠাচ্ছে, যেটা সার্বিক উন্নতির একটা বড় লক্ষণ।
ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালিসিসের গবেষক ও ফেলো ড. পুষ্পিতা দাস বলেন, প্রথমেই মনে করিয়ে দেবো, শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই কিন্তু বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার থেকে মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হয়েছে। মাত্র বছর ১৫ আগেও যে দেশটি বৈদেশিক সাহায্যের ওপর অনেকটা নির্ভরশীল ছিল কিংবা প্যারিসের দাতা সম্মেলনের ভরসায় যাদের তাকিয়ে থাকতে হতো, তাদের জন্য এটা কত বড় অর্জন, বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। আর এটার জন্য সে দেশের সরকারকে কৃতিত্ব তো দিতেই হবে। শেখ হাসিনা সরকার প্রমাণ করে দিয়েছে অর্থনীতির ক্ষেত্রে তারা একটি সঠিক ফোকাস নিয়ে এগোচ্ছে।
পুষ্পিতা দাসও বিশ্বাস করেন, অর্থনীতিই যে একটা দেশের চেহারা বদলে দিতে পারে, সেই দূরদৃষ্টি শেখ হাসিনার মধ্যে বরাবরই ছিল বলেই এই অর্জনটা সম্ভব হয়েছে। আগামী ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বাংলাদেশের ভোটাররা এই অর্থনৈতিক জয়যাত্রাকে কতটা গুরুত্ব দেন, এখন সেটাই দেখার বিষয়।