প্রতিবেদন

মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির পাশে থাকার প্রত্যয়ের মধ্য দিয়ে ৪৮তম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত

নিজস্ব প্রতিবেদক : সাম্প্রদায়িক শক্তির ধারক ও বাহকদের প্রত্যাখ্যান করে আগামী নির্বাচনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করার প্রত্যয়ে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে ১৪ ডিসেম্বর ৪৮তম শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস পালিত হয়েছে। একই সাথে বিদেশে পালিয়ে থাকা বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের রায় দ্রুত কার্যকর করার দাবি জানানো হয়েছে।
দিবসটি উপলক্ষে কালো পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় পতাকা অর্ধনমিতকরণ, শহীদদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ, আলোচনাসভা, মোমবাতি প্রজ্বলন, শোক র‌্যালি, শ্রদ্ধা নিবেদন, মিলাদ ও দোয়া মাহফিলসহ বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়।
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ নগরীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এ সময় রাষ্ট্রপতি যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্য, তিন বাহিনীর প্রধান, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) মেয়র এবং উচ্চ পর্যায়ের সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে আরেকটি পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের খোঁজ-খবর নেন।
এরপর প্রধানমন্ত্রী রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে স্থাপিত জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
১৯৭১ সালের এ দিনে বিজয়ের চূড়ান্ত পর্যায়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে তাদের দোসর রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামসের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জাতির বীর সন্তানদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে।
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে মিরপুর শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে সর্বস্তরের মানুষের ঢল নেমেছিল। ভোরের সূর্য ওঠার আগেই হাজারো মানুষ ভিড় করেন মিরপুরের শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের সামনে। শ্রদ্ধা নিবেদনের সময়ে সবার দাবি ছিল বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী দ-প্রাপ্ত পলাতক আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে শাস্তি কার্যকর করা।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হকের নেতৃত্বে শহীদ পরিবারের সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধারা সকালে বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন। পরে শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধা জানায় কেন্দ্রীয় ১৪ দল, শহীদ পরিবারের সন্তান ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা।
জাতীয় পার্টি, জাসদ, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, কমিউনিস্ট পার্টি, বাসদ, গণফোরামসহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন রায়েরবাজার বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে।
বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র মিলনায়তনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। এতে সভাপতির বক্তব্য রাখেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। তিনি আসন্ন নির্বাচনে স্বাধীনতাবিরোধী অপশক্তিকে পরাজিত করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তিকে বিজয়ী করার জন্য সবার প্রতি আহ্বান জানান।
শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে কুরআনখানি, মিলাদ ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। এ সময় দেশের জন্য আত্মদানকারী শহীদ বুদ্ধিজীবীদের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করা হয়।
রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে আওয়ামী লীগ আয়োজিত শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুদ্ধাপরাধী ও তাদের পরিবারের সদস্য, জঙ্গিবাদে জড়িত ব্যক্তি এবং হত্যা ও দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্তদের মনোনয়ন দেয়ায় বিএনপির কঠোর সমালোচনা করে দেশবাসীর উদ্দেশে বলেন, এই অপরাধীদের ভোট দেবেন না।
জামায়াত নেতা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মতিউর রহমান নিজামীসহ মানবতাবিরোধী অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত অন্যদের স্বজনদের সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করার কথা তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, যারা বিএনপির সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, কামাল হোসেনরা এ লজ্জা কোথায় রাখবেন? আমার একটাই প্রশ্ন, তারা লজ্জা পায়, নাকি পায় না?
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা আজকে দেশের রাজনীতিকে অপরাধজগতে নিয়ে গেছে। আজকে বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য, একটি রাজনৈতিক দল যত রকমের অপরাধ আছে, তার সবগুলোর সঙ্গেই যুক্ত। কেউ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর, কেউ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে বা তাদের পরিবারের সদস্য, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার আসামিÑ তাদেরকে মনোনয়ন দিয়েছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমার প্রশ্ন হচ্ছে যারা এ ধরনের মানবতাবিরোধী কাজ করেছে তাদের নির্বাচিত করলে তারা দেশকে কোথায় নিয়ে যাবে?
শেখ হাসিনা বলেন, আমেরিকার কংগ্রেস থেকে একটি তালিকা পাঠিয়েছে, সেখানেও জঙ্গিবাদী হিসেবে এদের নাম রয়েছে এবং ইতোমধ্যে কানাডার আদালত বিএনপিকে একটি জঙ্গিবাদী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এরা যদি নির্বাচিত হয়ে দেশের ক্ষমতায় আসে তাহলে সেই দেশের অবস্থা কোথায় দাঁড়াবে, মানুষের জানমালের নিরাপত্তা কিভাবে থাকবে, এ দেশে শান্তি কিভাবে থাকবে, অগ্রগতি কিভাবে হবে? কোনো দিনও হবে না।
আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বলেন, আমি দেশবাসীকে বলব, অপরাধীদেরকে ভোট দেবেন না। এই অপরাধীরা বাংলাদেশে যেন আর কখনো নির্বাচনে প্রতিনিধি হয়ে আসতে না পারে। যেসব এলাকায় তারা দাঁড়িয়েছে (নির্বাচনে) তাদেরকে চিহ্নিত করুন এবং তাদেরকে একেবারে বয়কট করে দিন। কারণ এরা ক্ষমতায় এলে এ দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট হবে, এ দেশের অগ্রগতি ব্যাহত হবে, এ দেশের ভাগ্য গড়ার জন্য আজকে যে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, সেটাও থেমে যাবে।