প্রতিবেদন

যানজট নিরসনে ঢাকা সাবওয়ে নির্মাণ করছে সরকার

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পর এবার আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। মেট্রোরেলের মতো সাবওয়েতে রেল ছাড়াও বাস সংযোগ থাকছে। যানজট নিরসনে রাজধানীতে প্রথমবারের মতো মাটির নিচে তৈরি হবে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল এই প্রকল্প। তবে প্রকল্প ব্যয় কত হবে তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।
মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগ্রহেই সাবওয়ে নিয়ে চিন্তাভাবনা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে বিশ্বব্যাংকসহ বড় দাতা সংস্থাগুলোর সহায়তা পাওয়া যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সাবওয়ের ওপর একটি কনসেপ্ট পেপার নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে ৪টি রুটে এটি নির্মাণ করা হবে। উদ্যোগটি বাস্তবায়িত হলে ট্রেন ও বাসে ঘণ্টায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার যাত্রী রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে চলাচল করতে পারবে। এতে মেট্রোরেলের পর রাজধানীবাসীর আরও একটি স্বপ্ন পূরণ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে ঢাকা শহরে সাবওয়ে (আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রো) নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই শীর্ষক একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। এ বিষয়ে শিগগিরই বিশেষ প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (এসপিইসি) বৈঠক করতে যাচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন। এতে সভাপতিত্ব করবেন পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য খোরশেদ আলম চৌধুরী।
সেতু বিভাগ ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কেননা পৃথিবীর সব বড় শহরেই সাবওয়ে রয়েছে। এটি নির্মাণ করা গেলে জনগণকে দুই ভাগে ভাগ করে দেয়া যাবে। একটি অংশ ওপরে থাকবে আর অন্য অংশটি মাটির নিচে। ফলে যানজট কমে যাবে।
পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানে এ প্রকল্পের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনা করা হবে। এজন্য পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালা অনুসরণ করে পরামর্শক নিয়োগ করা হবে। সমীক্ষা চলাকালীন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক প্রতিবেদন, অগ্রগতি প্রতিবেদন, মধ্যবর্তী প্রতিবেদন, খসড়া চূড়ান্ত প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ চূড়ান্ত প্রতিবেদন প্রদান করবে।
জানা যায়, সাবওয়ে নির্মাণের জন্য প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত চারটি রুট হচ্ছেÑ রুট-১ : টঙ্গী-বিমানবন্দর-কাকলী-মহাখালী-মগবাজার-পল্টন-শাপলা চত্বর-সায়েদাবাদ-নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার। রুট-২: আমিনবাজার-গাবতলী-আসাদগেট-নিউমার্কেট-টিএসসি-ইত্তেফাক ও সায়েদাবাদ পর্যন্ত ১৬ কিলোমিটার। রুট-৩: গাবতলী-মিরপুর-১-মিরপুর-১০-কাকলী-গুলশান-২-নতুনবাজার-রামপুরা টিভি ভবন-খিলক্ষেত-শাপলা চত্বর-জগন্নাথ হল ও কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত এবং রুট-৪: রামপুরা টেলিভিশন ভবন-নিকেতন-তেজগাঁও- সোনারগাঁও-পান্থপথ-ধানম-ি-২৭, রায়েরবাজার জিগাতলা-আজিমপুর-লালবাগ ও সদরঘাট পর্যন্ত।
সাবওয়ে নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সেতু বিভাগ বলেছে, ঢাকা শহরে বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ। এখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় ৭ হাজার ৯৫০ জন। মোট সড়কের দৈর্ঘ্য রয়েছে ১ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার। সড়কের ঘনত্ব ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। অথচ আদর্শমান হচ্ছে ২০-২৫ শতাংশ সড়কের ঘনত্ব। ফাঁকা জায়গা রয়েছে ৩ দশমিক ০৯ শতাংশ, কিন্তু থাকার প্রয়োজন ১৫-২০ শতাংশ। সড়কের বর্তমান সক্ষমতা ৩ লাখ হলেও বিআরটিএর নিবন্ধিত গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ।
ঢাকা শহরে যানজটের কারণে প্রতি বছর প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়। এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছে, সড়কপথে যেখানে ১০০ বাসে ঘণ্টায় ১০ হাজার যাত্রী চলাচল করতে পারে, সেখানে একই পরিমাণ বাসে সাবওয়েতে ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী চলাচল সম্ভব। মাটির নিচে সাবওয়ে নির্মাণ হলে জনসংখ্যার একটি বড় অংশ মাটির নিচ দিয়ে চলাচল করতে পারবে। ফলে ভূমির ওপর জনসংখ্যার চাপ কমবে এবং যানজট হ্রাস পাবে।
সূত্র জানায়, এর আগে আন্ডারগ্রাউন্ড সাবওয়ে নির্মাণের লক্ষ্যে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে সম্প্রতি সেতু কর্তৃপক্ষের কনসেপ্ট পেপারের ওপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়, যাতে দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই করা যায়। সে জন্য সভায় বিদেশি অর্থের জন্য অপেক্ষা না করে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সুপারিশ করা হয়। এরপর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিবের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় সেতু বিভাগের প্রস্তাবনা অনুযায়ী সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রস্তাবিত সাবওয়ের অবস্থান, এলাইনমেন্ট ও দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হবে। এছাড়া প্রকল্পের বিভিন্ন উপ-অঙ্গে নির্মাণ পদ্ধতি, জিওটেকনিক্যাল ইনভেস্টিগেশন, সিসমিক স্টাডি ও সার্ভে এবং ট্রাফিক সার্ভে করা হবে। সেই সঙ্গে পরিবেশ ও পুনর্বাসন সংক্রান্ত সমীক্ষা পরিচালনা ও পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রাথমিক ডিজাইন প্রণয়ন ও এর ভিত্তিতে প্রাক্কলন প্রস্তুত, ভূমি অধিগ্রহণ পরিকলল্পনা প্রণয়ন, অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ এবং ক্রয়, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা হবে বলে জানা গেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ঢাকা সাবওয়ে নির্মাণ কাজের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রাথমিক নকশা করার জন্য স্পেনের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিপসা কর্তৃক উপস্থাপিত ইনসেপসন রিপোর্টের ওপর মতামত ও পরামর্শ গ্রহণের লক্ষ্যে ৩ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সম্মেলন কক্ষে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় এমআরটি লাইন ১, ২, ৫ ও ৬ এবং বিআরটি লাইন ৩ ও ৭কে ঠিক রেখে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর নতুন এলাইনমেন্টের প্রস্তাব উপস্থাপন করেন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টিপসার টিম লিডার মার্টিন থমাস।
এ সময় তিনি কিভাবে এলাইনমেন্টটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষার কাজটি সম্পন্ন করবেন সে ব্যাপারেও একটি ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন। আরএসটিপিতে পূর্ব-পশ্চিম বরাবর কোনো সাবওয়ে না থাকায় প্রস্তাবিত এলাইনমেন্ট বরাবর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা যায় মর্মে সভায় উপস্থিত সবাই মতপ্রকাশ করেন।
সভায় জাতীয় অধ্যাপক ড. জামিলুর রেজা চৌধুরীর সভাপতিত্বে অন্যান্যের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিয়ারিং ইন-চিফ মেজর জেনারেল মো. সিদ্দিকুর রহমান সরকার, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী কবির আহমেদ এবং সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌলশী ড. আবদুল আল মামুনসহ বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।