প্রতিবেদন

সফল রাষ্ট্রনায়ক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে সারাদেশে একযোগে প্রতিষ্ঠিত হলো ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা

নিজস্ব প্রতিবেদক : জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক অভিপ্রায় ও সদয় নির্দেশনায় মানবতাবাদী, আধ্যাত্মিক, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তিযুদ্ধ ও প্রকৃত ইসলামি চেতনার মর্মালোকে আরবি ধারার একটি দ্বীনি শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশন কর্তৃক ২০১৮ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশে একযোগে ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে কোনো সরকারপ্রধান কর্তৃক একসাথে ১ হাজার ১০টি দীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার ঘটনা ইতিহাসে বিরল।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন পরিচালিত মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় যেখানে প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সেখানে দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে একদিকে যেমন ৫ হাজারের বেশি উচ্চশিক্ষিত আলেম-ওলামার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে তেমনি লক্ষাধিক শিশু আরবি ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে।
মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর থেকেই ওহিভিত্তিক শিক্ষা বিস্তারকল্পে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ইসলামের প্রাথমিক স্তরে মক্কার নবদীক্ষিত মুসলমানদের হাতে-কলমে মহান আল্লাহর একত্ববাদের শিক্ষা প্রদানের জন্য মক্কার নিকটবর্তী সাফা পাহাড়ের পাদদেশে সাহাবী হযরত আরকাম (রা)-এর ঘরকে নির্বাচন করেন। ইসলামের ইতিহাসে প্রথম মাদ্রাসা হিসেবে যা ‘দারুল আরকাম’ নামে পরিচিত। দারুল আরকাম নামের এ শিক্ষালয়ে রাসূলুল্লাহ (সা.) স্বয়ং শিক্ষকতা করেন। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ আসার পূর্ব পর্যন্ত ‘দারুল আরকাম’ নামের এ শিক্ষানিকেতনে নবদীক্ষিত মুসলমানদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা.) দাওয়াতভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। এ শিক্ষা কেন্দ্র থেকেই নবী করীম (সা.) কুরাইশদেরকে ইসলামের দাওয়াত দিতেন। ‘দারুল আরকাম’ নামের বরকত লাভের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দারুল আরকাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন।
ইসলামের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে ১৯৭৫ সালের ২২ মার্চ এক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। গত ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে সারা বাংলাদেশে ইসলামিক ফাউন্ডেশন তার কার্যক্রম ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন অ্যাক্ট’ অনুযায়ী বাস্তবায়ন করছে। মসজিদভিত্তিক শিশুশিক্ষা ও গণশিক্ষা কার্যক্রম, ইমামদের প্রশিক্ষণ প্রদান, দুস্থ ও অসহায় মানুষদের বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা প্রদান, ইসলামি পুস্তক প্রকাশ, ইসলামের মৌলিক বিষয়ে গবেষণা পরিচালনা, ইসলামের সাম্য ও সম্প্রীতি প্রচার ও প্রসার, নৈতিক শিক্ষা ও মূল্যবোধ উন্নয়নের জন্য ইসলামিক ফাউন্ডেশন মাঠপর্যায়ে বহুমুখী কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে।
‘সবার জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সরকার বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন প্রবর্তন করে। জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোলস’ (এসডিজি) বা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই অংশ হিসেবে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’ প্রকল্প শুরু করা হয়। প্রকল্পটি ৬ষ্ঠ পর্যায় জানুয়ারি ২০১৫ থেকে বাস্তবায়িত হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একনেক সভায় মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্প অনুমোদনকালে এ মর্মে নির্দেশনা প্রদান করেন যে, ‘বাংলাদেশের যে সকল এলাকায় স্কুল নেই সেখানে এ প্রকল্পের মসজিদভিত্তিক শিক্ষায় অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।’ পরে প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মর্মে মতামত ব্যক্ত করেন যে, ‘শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের শিক্ষা কারিকুলামে প্রতিটি শিশুর জন্য প্রযোজ্য ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়টি স্টাডি করা যেতে পারে।’
‘মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম’-এর আওতায় আরবি ভাষা শিক্ষা কোর্স চালুকরণ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন যে, ‘শিশুদের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানে মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু আছে। এখানে কুরআন শিক্ষার পাশাপাশি আরবি ভাষা শিখলে ভবিষ্যৎ কর্মজীবনে কাজে লাগবে। মসজিদভিত্তিক শিক্ষায় আরবি ভাষা শিক্ষা প্রদানের ব্যবস্থা করতে হবে।’
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঐকান্তিক ইচ্ছায় বিগত ৩ বছর যাবৎ গবেষণা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে বঙ্গবন্ধু প্রতিষ্ঠিত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের আওতায় প্রতিটি উপজেলায় ২টি করে মোট ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার জন্য মসজিদ ভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পটি ১ম সংশোধন প্রকল্প হিসেবে অনুমোদিত হয়, যার প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২২৭২০৪.০০ লক্ষ টাকা।
গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা জেলা বাদে বাংলাদেশের ৬৩ জেলায় মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, হাওড়-বাওড়, দ্বীপ ও চরাঞ্চল এবং নদীভাঙন এলাকাসমূহের মধ্যে যেখানে ১.৫ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই সেসব অঞ্চল/এলাকায় উপজেলাভিত্তিক ইতোমধ্যে ২টি করে মোট ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা (১ম শ্রেণি হতে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত) প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স-এর সমমর্যাদা প্রদানের জন্য ভারতবর্ষের আলেম-ওলামাগণ দীর্ঘ প্রায় ২০০ বছর যাবৎ দাবি করে আসছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৬ সালে আলেম-ওলামাদের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি কওমি মাদ্রাসার ‘দাওরায়ে হাদিস’ সনদকে মাস্টার্স-এর সমমর্যাদায় স্বীকৃতি প্রদান করেন।
দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় ‘দাওরায়ে হাদিস’কে মাস্টার্স-এর সমমর্যাদা প্রদান করে কওমি সনদধারী আলেমদের শিক্ষক হিসেবে চাকরি প্রদানের সুব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ইতোমধ্যেই কওমি নেসাবের ১ হাজার ১০ জন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং আরো ১ হাজার ১০ জন কওমি আলেমের নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
দ্বীনি শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য হলো ইসলামের মর্মবাণী ও শিক্ষার প্রচার ও প্রসার, উপযুক্ত আলেম-ওলামা তৈরি, কুরআন-হাদিস সহীহ শুদ্ধভাবে বোঝা, সাধারণ মানুষের সামনে কুরআন-হাদিসের শিক্ষা তুলে ধরা, নৈতিকতা ও মূল্যবোধের প্রচার, ধর্মীয় বিভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ তৈরি, আরবি ভাষা বোঝা ও বলার মতো যোগ্যতা অর্জন এবং মানুষকে প্রকৃত মানুষ বানানোর উদ্যোগ গ্রহণ করা।
কওমি ও আলীয়া ধারার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কাক্সিক্ষত মানের পর্যাপ্ত সংখ্যক আলেম ও বিশেষজ্ঞ তৈরি হচ্ছে না। এ কারণে আরবি ভাষায় কুরআন মজীদ ও সিহাহ সিত্তাহর কিতাব অর্থাৎ কুরআন ও হাদিস শরিফ আরবিতে বোঝা ও উপস্থাপন করা যাচ্ছে না। দেশে প্রচলিত মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে পর্যাপ্ত হাক্কানী দ্বীনদার আলেম তৈরি হচ্ছে না। মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী ও শিক্ষা সম্পর্কে প্রত্যাশা অনুযায়ী ধারণা দিতে পারছেন না। ফলে অনেকে ইসলাম সম্পর্কে অপব্যাখ্যা দ্বারা নানাভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। সাধারণ শিক্ষাগ্রহণকারী শিক্ষার্থীদের অনেকে ইংরেজি ভাষা লেখা, বলা ও বোঝার মতো যোগ্যতা অর্জন করে। কিন্তু মাদ্রাসা শিক্ষায় শিক্ষিতদের মধ্যে সে তুলনায় কাক্সিক্ষত মানের আরবি ভাষায় কথা বলা ও বোঝার মতো যোগ্যতাসম্পন্ন পর্যাপ্ত আলেম পাওয়া যাচ্ছে না।
মাদ্রাসা শিক্ষাক্রমের মাধ্যমে ইসলামের মর্মবাণী, প্রকৃত শিক্ষা, আধ্যাত্মিক চেতনা, নৈতিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, অসাম্প্রদায়িক ও মানবতাবাদী দর্শন যাতে বিকশিত হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। ইলম ও আমলওয়ালা আলেম তথা নায়েবে রাসূল তৈরিতে আলিয়া মাদ্রাসার শিক্ষা পাঠ্যক্রম উপযুক্ত রূপে তৈরি করতে হবে। আলিয়া মাদ্রাসা থেকে শিক্ষার্থীরা যদি পবিত্র কুরআন-হাদিস অনুধাবন ও ব্যাখ্যা করার মতো যোগ্যতা অর্জন এবং আরবি ভাষা শিক্ষা লাভ করতে না পারে, সে ক্ষেত্রে আলিয়া মাদ্রাসার সিলেবাস প্রয়োজনীয় সংস্কারের দাবি রাখে। এমতাবস্থায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অভিপ্রায় অনুযায়ী আরবি ভাষার মাধ্যমে ধর্মীয় শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্যে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে সারাদেশে ১ হাজার ১০টি দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো গত ৫ মার্চ একযোগে ১ হাজার ১০ জন কওমি আলেম দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতির পর একসাথে এত কওমি আলেমের সরকারি চাকরিতে যোগদানের ঘটনা এটাই প্রথম।
মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত ওইসব মাদ্রাসায় সদ্য যোগদানকারী কওমি আলেমগণ শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। এরপর ১৯ মার্চ একসাথে ১ হাজার ১০ জন আলিয়া নেসাবের আলেম সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। একসঙ্গে এতজন আলেমের দ্বীনি দাওয়াতভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা।
মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম (৬ষ্ঠ পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় বাস্তবায়নাধীন ওইসব মাদ্রাসায় সদ্য যোগদানকারী আলেমগণ শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
দারুল আরকাম ইবতেদায়ী মাদ্রাসায় শিগগিরই আরো ৩ হাজার ৩০ জন শিক্ষক নিয়োগ করা হবে। এর মধ্যে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত ১ হাজার ১০ জন। এছাড়া ১ হাজার ১০ জন কওমি নেসাব ও ১ হাজার ১০ জন আলিয়া নেসাবের শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়েছে।