অর্থনীতি

করজাল সম্প্রসারণের যেসব উদ্যোগ নিয়েছে এনবিআর

নিজস্ব প্রতিবেদক : করজাল বিস্তৃতির মাধ্যমে কর রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর। এজন্য কর কমিশনারদের কর দেয়ার যোগ্য সব মানুষ ও প্রতিষ্ঠানকে করজালে আনার এবং করভীতি দূর করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একইসঙ্গে কর জরিপ কার্যক্রম জোরদার ও নিষ্ক্রিয় টিআইএন নম্বরগুলো সক্রিয় করা হচ্ছে।
গত ২৩ ডিসেম্বর রাজস্ব সংক্রান্ত এক পর্যালোচনা সভায় এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূইয়া কর কমিশনারদের এসব নির্দেশনা দেন। তিনি বলেন, আয়কর বিভাগকে রাজস্ব আহরণের প্রধান খাতে উন্নীত করতে চাই। এ লক্ষ্যে কর আদায় ব্যবস্থা সহজ করার পাশাপাশি করের আওতা বাড়ানো হচ্ছে।
আগামী বাজেটে করহার না বাড়িয়ে করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ থাকবে বলে জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভূইয়া।
এনবিআর চেয়ারম্যান স্বদেশ খবরকে বলেন, ব্যবসায়ীদের রাজস্ব প্রণোদনা দিলে সরকারের আয় কমে যায়। একদিকে প্রণোদনা, অপরদিকে সরকারের রাজস্ব আয় Ñ দুটি বৈপরীত্যমূলক বিষয়। এরপরও আমরা চিন্তা করছি, রাজস্ব প্রণোদনা দিলে বিনিয়োগ বাড়বে, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবে, রপ্তানি সম্প্রসারিত হবে, সামগ্রিক ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পায়ন গতিশীল হবে। এতে করজাল বৃদ্ধির পাশাপাশি রাজস্ব আয় বাড়বে।
মোশাররফ হোসেন বলেন, বাংলাদেশকে চূড়ান্ত পর্যায়ে উন্নয়নশীল দেশের স্বীকৃতি পেতে হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর বিকল্প নেই। শিল্পায়ন জোরদার করতে হবে। এ জন্য আমরা বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করছি। আগামী বাজেটে এসব বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ থাকবে বলে তিনি ইঙ্গিত করেন।
এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, করসংক্রান্ত কোনো বিষয়ে বাজেটে যা উল্লেখ থাকবে, সেটি পরিবর্তন করা যাবে নাÑ এমন নয়। ব্যবসাবাণিজ্য ও শিল্পায়নের স্বার্থে যদি কোথাও পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়, তাহলে বাজেটের পরও এসআরও জারি করে পরিবর্তনের সুযোগ রয়েছে।
মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ফাঁকি রোধে আগামী ১ বছরের মধ্যে ইলেকট্রনিক ক্যাশ রেজিস্ট্রার (ইসিআর) মেশিন সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক করা হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অনেক ব্যবসায়ী ক্রেতার কাছ থেকে মূসক আদায় করলেও সরকারের কোষাগারে জমা দেন না। তারা মূসককে ব্যবসার লভ্যাংশ মনে করেন। ব্যবসায়ীদের এ মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, আমরা এর আগেও ইসিআর মেশিন বাধ্যতামূলক করার চেষ্টা করেছি, কিন্তু বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ বিষয়ে আর ছাড় দেয়া হবে না। ইসিআর মেশিন সব প্রতিষ্ঠানে থাকতে হবে।
তিনি বলেন, রাজস্ব ব্যবস্থা পুরোপুরি অটোমেশন হয়ে যাচ্ছে। এর সঙ্গে ইসিআর মেশিন সংযুক্ত করা হবে, যাতে কেউ মূসক ফাঁকি দিতে না পারে।
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের শহরগুলোর বাড়িওয়ালাদের করের আওতায় আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের কথা জানিয়েছেন এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূইয়া।
ঢাকা ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশন সূত্রে জানা যায়, ফ্ল্যাট রেজিস্ট্রেশনে করহার বেশি। তাই অনেকে ফ্ল্যাট কিনেও রেজিস্ট্রেশন করছে না। এতে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে। এছাড়া সাইনিং মানির (জমির মালিকদের সঙ্গে ডেভেলপারদের চুক্তি) ওপর ১৫ শতাংশ উৎসে কর আরোপ করা হয়েছে। কিন্তু জমি বিক্রিতে এ করের হার ৪ শতাংশ। এতে একদিকে ট্যাক্স ফাঁকি হচ্ছে, অন্যদিকে কালো টাকা তৈরি হচ্ছে।
এনবিআর সদস্য (আয়কর) জিয়াউদ্দিন মাহমুদ স্বদেশ খবরকে বলেন, ‘করজাল সম্প্রসারণের মাধ্যমে কর রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এর প্রেক্ষিতে আমরা কর কমিশনারদের কর জরিপ কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং করযোগ্য সকলকে করের আওতায় আনার নির্দেশ দিয়েছি।’
তিনি জানান, রাজধানীতে বাড়ি ও ফ্ল্যাটের মালিকদের ওপর জরিপ চালানোর সিদ্ধান্ত আগেই ছিল। একই ধরনের জরিপ বিভাগীয় শহর, জেলা শহর ও উপজেলা শহরগুলোতে চালানোর প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে যেসব প্রতিষ্ঠান কর দেয়ার যোগ্য তাদেরও করের আওতায় আনতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এনবিআরের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, আমরা জনগণের করভীতি কমাতে চাই। কর যে একটি সহজ পদ্ধতিতে দেয়া যায় সেটাই এখন তুলে ধরছি, যাতে মানুষ কর দিতে উৎসাহিত হয়। পাশাপাশি কর ফাঁকিবাজদের চিহ্নিত করে তাদের করজালের আওতার আনার জন্য মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরো কঠোর হওয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।
সরকারের রাজস্ব আয়ের মধ্যে প্রায় ৬৪ শতাংশ আসে এনবিআর খাত থেকে। বাকি ৩৬ শতাংশ এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে। এনবিআর খাতের মধ্যে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয় মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট থেকে। দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে আয়কর খাত। তৃতীয় অবস্থানে সম্পূরক শুল্ক এবং চতুর্থ অবস্থানে আমদানি শুল্ক। আগে আমদানি শুল্ক থেকে সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায় হতো।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে আয়কর থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আয় হয়। বাংলাদেশেও এ খাত থেকে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নানাবিধ উদ্যোগ চলমান রয়েছে। সরকারের মধ্যমেয়াদি সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আওতায় ২০২০-২১ অর্থবছরে আয়কর খাত থেকেই সবচেয়ে বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরের বাজেটে আয়কর থেকে রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৪ শতাংশ, ভ্যাট থেকে ৩৭ দশমিক ৩০ শতাংশ।
বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে গত ১০ বছরে আয়কর খাতে রাজস্ব আহরণের প্রবৃদ্ধি সবচেয়ে বেশি হয়েছে। বিগত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ খাতে প্রবৃদ্ধির হার ছিল ২২ শতাংশ।