অর্থনীতি

নির্বাচনের পরে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হওয়ার আশাবাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক
সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনকে ঘিরে ‘দেখি কী হয়’ নীতিতে ধীরে চলা নীতি গ্রহণ করেছিল পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকারীরা। শেয়ার বিক্রি করে বাজার ও দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেছে তারা। চাহিদার চেয়ে জোগান বেশি থাকায় শেয়ারের দাম ছিল নিম্নমুখী। ক্রমেই নিচের দিকে নেমে চলেছে পুঁজিবাজার। যদিও নির্বাচনের সময় বাজারকে সাপোর্ট দিতে সরকারের পক্ষ থেকে উদ্যোগও নেয়া হয়েছে, কিন্তু কার্যত কোনো ফল আসেনি। তবে শেয়ারবাজার বিশ্লেষকরা নির্বাচনের পরে বাজার চাঙ্গা হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। দুটি চীনা স্টক এক্সচেঞ্জকে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পাওয়ায় তারা এমন আশা করছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনকে ঘিরে পুঁজিবাজারে শেয়ার লেনদেন ও বিক্রি কমেছে। কিনছেন কমই কিন্তু বিক্রি করছেন বেশি। মূলত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করেই বিক্রি করছেন বেশি। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অস্থিরতা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাবের পাশাপাশি পুঁজিবাজারেও প্রভাব ফেলে। এ জন্য পুঁজিবাজারের পরিস্থিতি এবার কিছুটা ভিন্ন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। পুঁজিবাজারে দীর্ঘ সময় ব্যবসা করছেন এমন কয়েকজন স্বদেশ খবরকে জানান, অন্যান্য নির্বাচনের সময় পুঁজিবাজারে প্রভাব পড়লেও এবার কিছুটা ভিন্ন। একটানা পতন কিংবা অস্থিরতা একটু বেশিই। তবে কী কারণে এমন হচ্ছে সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছুই বলতে পারেননি তারা।
সূত্র জানায়, নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসায় ২০১৮ সালের মাঝামাঝি থেকেই পুঁজিবাজারে নিম্নমুখিতা দেখা দেয়। সময় ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে ক্রমেই এই নিম্নমুখিতা বড় হতে থাকে। ২৪ ডিসেম্বর দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) গত ৮ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন লেনদেন হয়।
তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১১ কার্যদিবস লেনদেন হয়েছে, যার মধ্যে ৭ কার্যদিবসেই বড় পতন হয়েছে আর চারদিন মূল্যসূচক বেড়েছে। আর লেনদেনও রয়েছে ৪০০ কোটি টাকার ঘরেই। এই সময়ে মূলধন কমেছে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
২০১৭ সালে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে গড়ে লেনদেন হয়েছিল প্রায় ৯০০ কোটি টাকা। কিন্তু বছর ব্যবধানে লেনদেন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে। সার্বিক লেনদেন প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা বা ৩৮.৪৩ শতাংশ কমার সঙ্গে পুঁজিবাজারের মূল্যসূচক, বাজার মূলধন ও বিদেশি বিনিয়োগকারীদের লেনদেনেও ভাটা পড়েছে।
জানা যায়, বছরের শুরুতে লেনদেনে গতি থাকলেও ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে চাওয়া-পাওয়া ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সতর্কতা ও নিষ্ক্রিয়তায় বছরজুড়েই নির্জীব থাকে পুঁজিবাজার। চীনা দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে স্টক এক্সচেঞ্জের কৌশলগত অংশীদার হিসেবে পেলেও গতিশীল হয়ে ওঠেনি বাজার। যদিও বাজার গতিশীল হবে ও বিদেশি বিনিয়োগও পুঁজিবাজারে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানালেও আশানুরূপ প্রতিফলন হয়নি। বরং নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির চাপ ছিল বেশি।
পুঁজিবাজারের ২০১৮ সালের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ১ বছরে ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫৯১ কোটি ৩৩ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে, যা গড়ে বা ২৪২ কার্যদিবসের প্রতিদিনই লেনদেন হয়েছে ৫২২ কোটি টাকা। ২০১৭ সালে ১ বছরে বা ২৪৮ কার্যদিবসে লেনদেন হয়েছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৯৫৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। ওই বছর গড়ে লেনদেন হয়েছিল ৮৭৪ কোটি ৮৩ লাখ
টাকা। সেই হিসাবে গত বছরের চেয়ে এ বছর প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা কম লেনদেন হয়েছে।
ডিএসই সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালে শিল্প উদ্যোক্তারা ১টি মিউচুয়াল ফান্ড ও ১৩ কোম্পানি প্রাথমিক গণপ্রস্তাব বা আইপিওর মাধ্যমে ৬০১ কোটি টাকা মূলধন সংগ্রহ করেছে। যার মধ্যে দুটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ২৩৩ কোটি ১২ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে। অপরদিকে ২০১৭ সালে দুটি মিউচুয়াল ফান্ড ও ৬টি কোম্পানি মিলে ২৪৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা মূলধন সংগ্রহ করে। এর মধ্যে একটি কোম্পানি প্রিমিয়াম বাবদ ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা মূলধন উত্তোলন করে। এদিকে ব্যাংকিং খাতের ২০টি, আর্থিক খাতের ১২টি, প্রকৌশল খাতের ২৩টি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের ৬টি, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ৭টি, টেক্সটাইল খাতের ২৯টি, ঔষধ ও রসায়ন খাতের ১৪টি, সার্ভিস অ্যান্ড রিয়েল এস্টেট খাতের ১টি, সিমেন্ট খাতের ২টি, আইটি খাতের ৪টি, ট্যানারি খাতের ২টি, সিরামিক খাতের ৩টি, ইনস্যুরেন্স খাতের ২৪টি এবং বিবিধ খাতের ৭টিসহ ১৫৪ কোম্পানি ৩৫৫ কোটি ৭৬ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করেছে। ২০১৭ সালে ১৪২ কোম্পানি ২৭৭ কোটি ৬৮ লাখ বোনাস শেয়ার ইস্যুর মাধ্যমে ২ হাজার ৭৯১ কোটি ৬০ লাখ টাকা মূলধন বৃদ্ধি করে।
২০১৮ সালে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়ায় ৯ হাজার ৫৮৫ কোটি ৬১ লাখ টাকা, যা ডিএসইর মোট লেনদেনের ৬.৩২ শতাংশ। এ বছর বিদেশিরা ৪ হাজার ৪৯৬ কোটি ২৪ লাখ টাকার শেয়ার ক্রয় করেছে কিন্তু বিক্রি করেছে ৫ হাজার ৮৯ কোটি ৭১ লাখ টাকার।
অপরদিকে ২০১৭ সালে বৈদেশিক লেনদেনের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৪৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। যার মধ্যে ক্রয় করে সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ৬ হাজার ৫৭৬ কোটি ২৯ লাখ আর বিক্রয় করে ৪ হাজার ৮৭১ কোটি ৩৪ লাখ টাকা।
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ব্যবস্থাপনা পরিচালক কে এ এম মাজেদুর রহমান এ বিষয়ে স্বদেশ খবরকে বলেন, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দুই স্টক এক্সচেঞ্জকে যুক্ত করা বাজারের জন্য ইতিবাচক দিক। তাদের অন্তর্ভুক্তি বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে পরিচিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, নির্বাচনি বছরে বাজার কিছুটা গতি মন্থর দেখা গেছে। তারপরও আশানুরূপ যে গতি অর্জন করার কথা ছিল তা অর্জন করতে না পারলেও দেশের পুঁজিবাজার এমন একটি মাত্রায় অবস্থান করতে পেরেছে, যার ফলে বাজারে তেমন কোনো সংকট দেখা দেয়নি।
২০১৯ সালের শুরু থেকে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন কে এ এম মাজেদুর রহমান।