প্রতিবেদন

শিশু উন্নয়ন ও অটিজম বিষয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানালেন সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল

সাবিনা ইয়াছমিন : শিশু উন্নয়ন ও অটিজম বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন এশিয়া অঞ্চলে অটিজম বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার শুভেচ্ছাদূত সায়মা ওয়াজেদ হোসেন।
গত ২৪ ডিসেম্বর শিশু একাডেমিতে অনুষ্ঠিত এক মতবিনিময় সভায় সায়মা ওয়াজেদ হোসেন এ আহ্বান জানান।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব নাছিমা বেগমের সভাপতিত্বে সভায় আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ শিশু একাডেমির চেয়ারম্যান কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন ও শিশু একাডেমির পরিচালক শিশুসাহিত্যিক আনজীর লিটন।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়নাধীন শিশু উন্নয়ন ও শিশু সুরক্ষামূলক প্রকল্প এবং কর্মসূচিসমূহের মধ্যে সমন্বয় ও একটি সমন্বিত গাইড লাইন প্রণয়নের লক্ষ্যে এই সভার আয়োজন করা হয়।
মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ও সূচনা ফাউন্ডেশনের যৌথ আয়োজনে এই মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সূচনা ফাউন্ডেশন, অটিজম এবং নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডারস বিষয়ক জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন এবং এশিয়া অঞ্চলে অটিজম বিষয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার শুভেচ্ছাদূত সায়মা ওয়াজেদ হোসেন।
সায়মা ওয়াজেদ তাঁর বক্তব্যে বলেন, মহিলা শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় মহিলা ও শিশুদের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজ করছে। এ কার্যক্রম আরো গতিশীল করার জন্য মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন দপ্তরসমূহকে সমন্বিতভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
সচিব নাছিমা বেগম বলেন, সুষ্ঠু ও সুন্দর জাতি গঠনে নিরাপদ মাতৃত্ব অত্যন্ত জরুরি। নিরাপদ মাতৃত্ব অর্জনে শিশুদের ডিজঅ্যাবিলিটি কমিয়ে আনার লক্ষ্যে দেশের কমিউনিটি ক্লিনিকে অক্সিজেন সিলিন্ডার স্থাপনে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
এর আগে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সায়মা ওয়াজেদ বলেন, আমরা প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে যে দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখি তা বদলাতে হবে। টেকনোলজির মাধ্যমে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের সব বাধা দূর করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক। তিনি আইসিটি সেক্টরের সব প্রতিষ্ঠানের কাঠামো প্রতিবন্ধীবান্ধব হবে বলেও ঘোষণা দেন।
জুনায়েদ আহমেদ পলক বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আগামী ৩ বছরে সাড়ে ৩ হাজার প্রতিবন্ধী ভাই-বোনের চাকরি নিশ্চিত করা হবে এবং আইটি সেক্টর ২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে সারাদেশে ২৮টি সেন্টারে তাদের প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। দেড় কোটি প্রতিবন্ধী মানুষকে সঙ্গে নিয়েই ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের সুরক্ষা আমাদের সবার দায়িত্ব।
সায়মা ওয়াজেদ পুতুল একজন প্রখ্যাত অটিজম বিশেষজ্ঞ। তার পিতা বিশিষ্ট পরমাণু বিজ্ঞানী ড. ওয়াজেদ মিয়া ও মাতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সারাবিশ্বেই সায়মা ওয়াজেদ অটিস্টিক শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ প্যানেলের একজন সদস্য এবং একজন লাইসেন্সপ্রাপ্ত মনোবিজ্ঞানী।
সায়মা ওয়াজেদ যুক্তরাষ্ট্রের ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৯৭ সালে মনোবিজ্ঞান বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি, ২০০২ সালে ক্লিনিক্যাল সাইকোলজির ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি এবং ২০০৪ সালে স্কুল সাইকোলজির ওপর বিশেষজ্ঞ ডিগ্রি লাভ করেন। ব্যারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নের সময় তিনি বাংলাদেশের নারীদের উন্নয়নের ওপর গবেষণা করেন। তার এ গবেষণাকর্ম ফ্লোরিডার একাডেমি অব সায়েন্স কর্তৃক শ্রেষ্ঠ সায়েন্টিফিক উপস্থাপনা হিসেবে স্বীকৃত হয়।
সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুল ২০০৮ সাল থেকে শিশুদের অটিজম এবং স্নায়বিক জটিলতাসংক্রান্ত বিষয়ের ওপর কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই তার কাজ বিশ্বজুড়ে প্রশংসা পেয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পুতুলকে হু অ্যাক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে। মনস্তত্ববিদ সায়মা যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান অটিজম স্পিকস-এর পরামর্শক হিসেবেও কাজ করেন। তিনি ২০১৩ সালের জুন থেকে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশেষজ্ঞ পরামর্শক প্যানেলে অন্তর্ভুক্ত আছেন।
২০১৭ সালে সায়মা ওয়াজেদ হোসেন অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের কল্যাণে নিরবচ্ছিন্ন ও উদ্ভাবনীমূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ইন্টারন্যাশনাল চ্যাম্পিয়ন অ্যাওয়ার্ড পান। প্রিন্সটন ক্লাব অব নিউইয়র্ক আয়োজিত সিমা কলাইনু নামে নিউইয়র্কভিত্তিক একটি শিশু অটিজম কেন্দ্র ও স্কুল এবং এর আন্তর্জাতিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান আই কেয়ার ফর অটিজমের বার্ষিক অনুষ্ঠানে তাকে এ অ্যাওয়ার্ড প্রদান করা হয়। সায়মা ওয়াজেদ হোসেন পুতুলের পক্ষে অ্যাওয়ার্ডটি গ্রহণ করেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন।
সিমা কলাইনু নিউইয়র্কের প্রথম শিশু অটিজম কেন্দ্র ও স্কুল, যা ১৯৯৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নিউইয়র্কের ৫টি ব্যুরোর সকল সম্প্রদায়ের অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত সহস্রাধিক শিশুকে তাদের অটিজম সেন্টার, স্কুল ও হোম সার্ভিস দিয়ে আসছে।
অ্যাওয়ার্ড গ্রহণকালে রাষ্ট্রদূত মোমেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশ অটিজম ও অন্যান্য নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার আক্রান্ত মানুষের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণে কাক্সিক্ষত সফলতা অর্জন করে চলেছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা সায়মা ওয়াজেদ হোসেনকে অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারের ক্ষেত্রে গ্লোবাল রিনাউন্ড চ্যাম্পিয়ন হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। এছাড়া সংস্থাটির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় এ অঞ্চলের ১১টি দেশের জন্য তাঁকে অটিজম বিষয়ক শুভেচ্ছাদূত হিসেবে নিয়োগ দেয়।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভুটানে অনুষ্ঠিত অটিজম বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অটিজম ও অন্যান্য নিউরো ডেভেলপমেন্ট ডিজঅর্ডারের জন্য থিম্পু ডিক্লারেশন গ্রহণে পুতুলের অবদান অনস্বীকার্য।
বাংলাদেশে অটিজম বিষয়টি সামনের সারিতে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয় ২০১৪ সালে পুতুলকে এক্সিলেন্স ইন পাবলিক হেলথ অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত করে।
ঢাকা ঘোষণা এবং সাউথ এশিয়ান অটিজম নেটওয়ার্ক (ঝঅঅঘ) প্রতিষ্ঠায় তাঁর প্রচেষ্টা অটিজমকে এ অঞ্চল এবং অঞ্চলের বাইরে সামনের সারিতে এনে দিয়েছে।
অ্যাওয়ার্ড প্রদান অনুষ্ঠানে পুতুল বলেছিলেন, অটিজম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সিমা কলাইনুর এই স্বীকৃতির জন্য আমি সম্মানিত বোধ করছি। অটিজম সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান সিমা কলাইনুর মতোই বাংলাদেশ ও এশিয়া অঞ্চলে এ সংক্রান্ত পেশার মানুষের জন্য পরিকল্পিত এবং ব্যাপকভিত্তিক প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টিতে আমি কাজ করছি। অটিজম কোনো ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও আর্থসামাজিক সীমারেখার মধ্যে আবদ্ধ নয়। এ কারণেই এর জন্য বিশেষ ধরনের সেবা ও কর্মসূচির প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার একজন শুভেচ্ছাদূত হিসেবে অটিজম নেটওয়ার্ক নিয়ে আমি সকলের সাথে কাজ করতে চাই।