প্রতিবেদন

স্বাগতম ২০১৯: পেছন ফিরে দেখা ২০১৮

স্বদেশ খবর ডেস্ক
মহাকালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেল আরেকটি বছর ২০১৮। নতুন আলোয় শুরু হলো নতুন আরেকটি বছর ২০১৯। শুভ ইংরেজি নববর্ষ। অসীমের দিকে মহাকালের যে যাত্রা, সেখানে সূচিত হলো আরেকটি মাইলফলক।
মহাকালের যাত্রায় একটি বছর আসে নতুন উদ্দীপনা ও প্রেরণা নিয়ে। মানুষ মুছে ফেলে গত হয়ে যাওয়া বছরের গ্লানি, উৎসাহ খুঁজে পায় সুখকর ঘটনা থেকে, তারপর এগিয়ে যায় অগ্রগতির পথে সামনের দিকে।
নতুন বছরের আগমন উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দশম সংসদের বিরোধী দলের নেতা রওশন এরশাদ। তারা ইংরেজি নববর্ষে দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
পুরনো বছর বিদায় নিলেও কিছু ঘটনা মানুষের মনে স্মৃতি হয়ে থাকবে। সে স্মৃতি কখনো আনন্দের, কখনো বেদনার। আগের বছরের মতো ২০১৮ সালটিও শুরু হয়েছিল স্বস্তি ও শান্তির আবহে। বছরজুড়ে ছিল না কোনো রাজনৈতিক সহিংসতা। ২০১৮ সালে নানা ইতিবাচক ঘটনার কারণে বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি আরো উজ্জ্বল হয়েছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ছিল অনেক উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। না জানি কী হয়? ২০১৮ সালের শেষার্ধে এসে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর সংলাপ ছিল আলোচনার বিষয়বস্তু। নির্বাচনকেন্দ্রিক ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন নতুন রাজনৈতিক জোট হিসেবে আবির্ভূত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপির নির্বাচনি সংলাপের আহ্বানের প্রতি সাড়া দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট আলোচনায় বসে। দেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘ রাজনৈতিক সংলাপের ফলশ্রুতিতে এবার নির্বাচিত সরকারের অধীনে সকল রাজনৈতিক দল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। এটি ছিল রাজনৈতিক অঙ্গনে শেখ হাসিনা সরকারের সফল একটি পদক্ষেপ; যার ফলে দেশের সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার আশঙ্কা দূর হয়েছে। সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে দেশে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কারেশম্যাটিক নেতৃত্ব ও সময়োপযোগী সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ফলে ৩০ ডিসেম্বর-২০১৮ এর অংশগ্রহণমূলক একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দেশি-বিদেশি সকল মহলের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পায় এবং ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
আর এই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল ভোট ও আসনের ব্যবধানে জয়লাভ করে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নতুন বছরের শুরুতে আবারও সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। ২০১৯ সালের শুরুতে নতুন সরকার গঠনের মধ্য দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেকর্ডসংখ্যক চতুর্থবারের মতো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সৌভাগ্যবান হিসেবে ইতিহাস গড়লেন। ফলে প্রকৃত অর্থেই বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা একজন সফল ও সার্থক রাষ্ট্রনায়ক। এদেশের জনগণ উদারভাবে তাঁকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাঁর সরকারের উন্নয়ন কর্মকা-ের প্রতি অব্যাহত সমর্থনের এ বিশাল জনরায়ই প্রমাণ করে শেখ হাসিনার প্রতি এদেশের মানুষের বিশাল প্রত্যাশার কথা। এতে করে এদেশের জনমানুষের প্রতি শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকারের দায়বদ্ধতা অনেক বেড়ে গেল।
বিগত ১০ বছরে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের বিশাল অবদান রয়েছে; যার স্বীকৃতিস্বরূপ জনগণ তাদের পূর্ণ সমর্থন এ সরকারের প্রতি পুনর্ব্যক্ত করেছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে। সদ্য সমাপ্ত ২০১৮ সালেও সরকারের অনেক অর্জন ও সফলতা রয়েছে। এর মধ্যে এখানে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বিষয়ে আলোকপাত করা যেতে পারে। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় দুই মামলার রায় হয়েছে ২০১৮ সালে। রায়ে ১৯ জনের মৃত্যুদ- ও ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদ-ের আদেশ দেয়া হয়।
২০১৭ সালের মতো ২০১৮ সালেও রোহিঙ্গা সংকট ভুগিয়েছে বাংলাদেশকে। মানবিক সংকট হিসেবে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে ভূরাজনৈতিক সংকটে রূপ নিচ্ছে রোহিঙ্গা ইস্যু। এ সংকটের মাত্রা এত ব্যাপক যে এখন আর এর দ্রুত সমাধানের পূর্বাভাস দিতে পারছেন না কোনো বিশ্লেষকই। বিশ্বের বড় ক্ষমতাধর দেশগুলো যখন সীমান্ত বন্ধ করে রেখেছে, তখন ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার মতো মহানুভবতা দেখিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৭ সালে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে রোহিঙ্গা নিধন ও বিতাড়ন শুরু হলে প্রায় সাড়ে ৬ লাখ রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। নিপীড়িত এই জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়ে ২০১৮ সালেও বাংলাদেশ বিশ্ববাসীর ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।
বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণ ঘটেছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন নীতি সংক্রান্ত কমিটি (সিডিপি) ২০১৮ সালের ১৫ মার্চ এলডিসি থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের যোগ্যতা অর্জনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়। এলডিসি ক্যাটাগরি থেকে উত্তরণের জন্য মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ সূচক এবং অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক এ তিনটি সূচকের যেকোনো দুটি অর্জনের শর্ত থাকলেও বাংলাদেশ তিনটি সূচকের মানদ-েই উন্নীত হয়েছে। জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিলের (ইকোসক) মানদ- অনুযায়ী এক্ষেত্রে একটি দেশের মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১ হাজার ২৩০ মার্কিন ডলার, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় তারচেয়েও অনেক বেশি অর্থাৎ ১ হাজার ৭১০ মার্কিন ডলার। মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশ অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯ পয়েন্ট। অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচক হতে হবে ৩২ ভাগ বা এর কম যেখানে বাংলাদেশের রয়েছে ২৪ দশমিক ৮ ভাগ। এছাড়া ১১ মে মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রেরণ, জিডিপির ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি, গড় আয়ু বৃদ্ধি, স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ, বৈদেশিক মুদ্রার রেকর্ড রিজার্ভ, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতুর নির্মাণ কাজের অগ্রগতি, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ কাজ শুরু ছিল বড় ঘটনা। দৃশ্যমান হয়েছে রাজধানীর প্রথম মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ কাজ। শুরু হয়েছে দেশের প্রথম সুড়ঙ্গপথ কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ কাজ। সারাদেশের সড়ক যোগাযোগ ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। ব্যাপক অগ্রগতি সাধিত হয়েছে সারাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতেও। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সেক্টরের সংকট অনেকটা দূর করতে সক্ষম হয়েছে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার।
ক্রীড়াক্ষেত্রে ২০১৮ সালে অর্জিত হয়েছে অনেক সাফল্য। প্রমীলা ক্রিকেটে টানা ৬ বারের চ্যাম্পিয়ন ভারতকে হারিয়ে এশিয়া কাপ জয় করেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। সাফ অনূর্ধ্ব-১৮ ফুটবলেও শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশের মেয়েরা। ক্রিকেটে দেশের অভ্যন্তরে আন্তর্জাতিক ম্যাচে সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল।
২০১৮ সালে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেক গুণীজনকে হারিয়েছি আমরা। আমাদের ছেড়ে গেছেন সাংবাদিক গোলাম সারওয়ার, সাহিত্যিক শওকত আলী, শিক্ষাবিদ মুস্তাফা নূর উল ইসলাম, কবি বেলাল চৌধুরী, সংগীতশিল্পী আইয়ুব বাচ্চু, বরেণ্য চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেনসহ অনেকে।
২০১৯ নতুন বছরে বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এগিয়ে যাবে, এটাই সব শ্রেণি-পেশার মানুষ প্রত্যাশা করে। এখন সাধারণ মানুষ কর্মমুখর থাকতে চায়। সাধারণ মানুষ নিজের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চায়, উন্নতি করতে চায়। প্রত্যেকটা মানুষের মধ্যে যে স্বপ্ন আছে সেই স্বপ্নটাকে জাগিয়ে তুলতে চায়। নতুন বছরে মানুষ আশা করে যে রাজনৈতিক শঙ্কা, সামাজিক বিভেদ, অনাচার এসবের বাইরে গিয়ে একটি কর্মমূখী জনস্রোত। যেই জনস্রোত বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। ব্যক্তির যেমন উন্নতি হবে তেমনি একটি সাম্যের, শান্তির বাংলাদেশ আমরা অর্জন করতে পারব, নতুন বছরে এটাই সবার প্রত্যাশা।
২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছে, ২০১৯ সালের শুরুতে সরকার গঠনের পর এখন সেই ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে মনোনিবেশ করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নির্বাচনি ইশতেহারে তাঁর দেয়া প্রতিশ্রুতির ওপর আস্থা রেখে জনগণ বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোটে নির্বাচিত করেছে। মানুষের বিশ্বাস ২০১৯ সালের শুরু থেকেই সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আত্মনিয়োগ করবে এবং বাংলাদেশ সুখী-সমৃদ্ধিশালী দেশের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। একাদশ জাতীয় নির্বাচন-পরবর্তী বিভিন্ন ফোরামে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও অন্যান্য শীর্ষ পর্যায়ের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যেও উন্নয়নের ধারাবাহিকতার ওপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। সুতরাং উন্নয়নের অগ্রযাত্রার গতির মাত্রা যে শুরু থেকেই বেশ বেগবান হবে তা অতি সহজেই অনুমান করা যাচ্ছে।
নতুন বছরে সারাদেশের মানুষ সমবেত আনন্দ আয়োজনে উৎফুল্লÑ নানা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্বাগত জানায় নববর্ষকে। প্রার্থনা করে সব বাধাবিঘœ কেটে গিয়ে পৃথিবীতে উদিত হয়েছে যে নতুন সূর্য, তারই আলোয় রেঙে উঠুক দেশের সবকিছু। বাংলাদেশ নতুন আশায় বুক বাঁধুক। এগিয়ে যাক সমৃদ্ধি ও উন্নতির পথে। আর এই আশাতেই শুরু হোক ২০১৯ সালের পথপরিক্রমা। শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য আর দেশের প্রতি অগাধ ভালোবাসায় নতুন এক বাংলাদেশ গড়ে তোলা হোক নতুন বছরের অঙ্গীকার। সুস্বাগত ২০১৯। সবাইকে নতুন বছরের শুভেচ্ছাÑ হ্যাপি নিউ ইয়ার-২০১৯।