রাজনীতি

আওয়ামী লীগের সঙ্গে শরিকদের টানাপড়েনে হতাশ ১৪ দল

হাফিজ আহমেদ
সরকারের অংশ হয়ে থাকবে না সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকবে Ñ এ নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট ও ১৪ দলের শরিকদের টানাপড়েন শুরু হয়েছে। ১৪ দলের শরিক দলগুলোকে বিরোধী দলে যাওয়ার জন্য আওয়ামী লীগের অনানুষ্ঠানিক প্রস্তাবের পরই এ টানাপড়েন শুরু হয়।
এক দলের এক নেতা হয়েও ১৪ দলের ব্যানারে আওয়ামী লীগের প্রতীক নৌকা নিয়ে নির্বাচন করে এমপি হয়ে মন্ত্রীর চেয়ারে বসার জন্য উন্মুখ নেতারা সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসার কথা চিন্তাই করতে পারছেন না। নিজ এলাকা বাদ দিয়ে সুবিধাজনক এলাকা থেকে নৌকার জোয়ারে এমপি হয়ে তারা সরাসরি যেতে চাচ্ছেন ক্যাবিনেটে।
৪৭ সদস্যের মন্ত্রিসভায় ১৪ দলের কোনো নেতাকে অন্তর্ভুক্ত না করে যে ইঙ্গিত দেয়া হয়েছিল, তাতে গত টার্মে মন্ত্রী থাকা কিছু নেতা এই ভেবে আশ্বস্ত হচ্ছিলেন যে, মধ্যবর্তী কোনো সময়ে তারা হয়ত মন্ত্রিত্বের ডাক পাবেন। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি পড়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে বলায়।
টানা ১০ বছর ক্ষমতার কাছাকাছি থেকে ক্ষমতাসীন দলের টিকিটে নির্বাচন করে পাস করার পর এখন বিরোধী রাজনীতির চর্চা করতে বলায় ১৪ দলের নেতারা রীতিমতো হতাশ। বেশ কিছুদিন লুকিয়ে রাখতে পারলেও আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বিবৃতির পর নেতারা ইনিয়ে-বিনিয়ে তাদের হতাশা প্রকাশ করছেন।
উন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সংসদে বিরোধী দলগুলো সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করে যে ভূমিকা পালন করে থাকে, তেমন বিরোধীদলের ভূমিকায় শরিক দলগুলোকে দেখার মানসিকতা থেকেই ওবায়দুল কাদের যে বিবৃতি দেন, তাতে ১৪ দলের নেতারা তাদের ভবিষ্যৎ বুঝে ফেলেন। সরকারি দলে থাকার চেষ্টা চালাবে, না বিরোধী দলে গিয়ে বসবে Ñ এ নিয়ে তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দারুণ মতানৈক্য।
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ১৪ দল যদি সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসে এবং বিরোধীদল যত কনস্ট্রাকটিভ হয়ে পার্লামেন্টে থাকবে, ততই সরকারি দলের ভুল সংশোধন করতে পারবে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের শরিকরা বিরোধী দলে থাকলে তা তাদের জন্যও ভালো, সরকারের জন্যও ভালো। কেন্দ্রীয় ১৪ দলের শরিকরা অনেকে বিরোধীদলের ভূমিকা পালনের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, ১৪ দলীয় ঐক্যজোট একটি আদর্শিক রাজনৈতিক জোট। মহাজোট নামের যে বৃহত্তর জোট সেটা কিন্তু নির্বাচনি ঐক্যজোট। নির্বাচনি জোট আর রাজনৈতিক জোট ভিন্ন জিনিস। যেহেতু ১৪ দলের সাথে আমাদের সম্পর্ক রাজনৈতিক, কাজেই তাদের সাথে আমাদের সম্পর্ক থাকবেই। এটা মনে রাখা জরুরি, মহাজোট কিংবা ১৪ দলে কোনো প্রকার টানাপড়েন নেই। রাজনৈতিক জোটের প্রশ্ন যখন আসে তখন তো আমরা এক সাথেই আছি। আমাদের জোট তো আমরা ভাঙ্গিনি। আমাদের মধ্যে কোনো ব্যাপারে যদি ভুল বোঝাবুঝি থাকে সেটা আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করব।
জানা যায়, কয়েকটি দল বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকতে চাইলেও গত টার্মে যারা মন্ত্রী ছিলেন সেসব দলের নেতারা এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করছেন। ফলে আগামী ৩০ জানুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া একাদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের মধ্যে মহাজোট ও ১৪ দলের শরিকদলগুলো বিরোধীদলে থাকার সিদ্ধান্ত নিতে পারবে কি না, এ প্রশ্নও উঠেছে। যদিও দলগুলো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য দলীয় ও জোটগত বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানা গেছে।
ভিন্নমত পোষণকারী দলের নেতাদের দাবি Ñ বিরোধী জোটে নয়, ১৪ দল ও মহাজোটের শরিক হিসেবেই সংসদে থাকবে দলগুলো। একই প্রতীকে নির্বাচন করার পর এখন তাদের বিরোধী দলে পাঠানোর পরিকল্পনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা। একাদশ সংসদ নির্বাচনে অভাবনীয় বিজয়ের পর ১৪ দল ও মহাজোটের শরিক কয়েকটি দলের বিষয়ে আওয়ামী লীগের আর কোনো আগ্রহ নেই বলেও অভিযোগ তাদের।
সরকারের চাওয়ামতো বিরোধীদলে গেলে আদর্শিক এ জোটের ঐক্য অটুট থাকবে না বলেও তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন। তবে বিরোধীদলের আসনে না বসলেও সংসদ প্রাণবন্ত করতে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আনার পওে তারা কাজ করতে চান। নতুন সরকারে মন্ত্রিত্ব না পাওয়ায় কোনো ােভ নেই বলেও দাবি করেন কয়েক নেতা।
আবার যারা বিরোধী দলে থাকতে আগ্রহী, সেসব নেতার যুক্তি হলো, সরকার ও বিরোধী দলে মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তি রাখতেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে আওয়ামী লীগ। ১৪ দলের শরিকরা বিরোধীদলে থাকলে তা তাদের জন্যও ভালো, সরকারের জন্যও ভালো।
১৪ দলীয় সূত্র জানায়, আগামী ৩০ জানুয়ারি বসতে যাওয়া সংসদে জোট শরিক সব দলের নেতাকে বিরোধীদলের আসনে বসাতে চাওয়ার ইঙ্গিতও মিলেছে মতাসীন দলটির বিভিন্ন নেতার কথায়। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনা হয়নি দলগুলোর সঙ্গে।
নির্বাচনের পর গত ৩ জানুয়ারি বৈঠক হয়েছিল ১৪ দলের। বৈঠকে সংসদে সরকারি ও বিরোধী জোটে থাকার অবস্থান নিয়ে আলোচনা হলেও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
শরিক দলের নেতারা আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপোয় আছেন। দলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে শিগগিরই সরকারের সঙ্গে আলোচনায়ও আগ্রহী তারা। নিজেদের মধ্যে এ বিষয়ে আলোচনা করতে ২০ জানুয়ারি পলিটব্যুরোর সদস্যদের নিয়ে বৈঠকও করেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। বৈঠকে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে থাকার সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়। এ ছাড়া আগামী ২ ও ৩ ফেব্র“য়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল – জাসদ। জাসদের (আম্বিয়া) একাংশ ১ ও ২ ফেব্র“য়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে।
জানা যায়, মহাজোটের অন্যতম শরিক জাতীয় পার্টি একাদশ সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকছে। তবে মহাজোটের আরেক শরিক বিকল্পধারা বিরোধী দলে থাকতে আগ্রহী নয়। বিকল্পধারা সরকারে থাকার পে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে। ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদ, জেপি ও তরিকত ফেডারেশন বিরোধী দলে থাকতে তাদের আপত্তির বিষয়টি ইতোমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। তবে সাম্যবাদী দলসহ আরো কয়েকটি দল সংসদে বিরোধী দলে থাকতে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শরিকরা বিরোধী দলে গেলে ভালো হয়। তিনি যদি সেটা মনে করেন, তাহলে সেটা নিয়ে আলোচনা করা যাবে।
জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, ‘আমরা জোটের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই থাকব। এ মুহূর্তে আমরা জোটে আছি, এর ভিত্তিতেই দেশ পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অকুণ্ঠ সমর্থন দেব।’
বিকল্পধারার সভাপতি ও সাবেক রাষ্ট্রপতি বদরুদ্দোজা চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘সরকারের সহায়তা নিয়ে নির্বাচিত হয়ে সংসদে বিরোধী দলে যাওয়া ঠিক নয়। এটা নৈতিকভাবে ভুল।’
তবে সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক মন্ত্রী দিলীপ বড়–য়া মনে করেন, ‘শরিকদের বিরোধী দলে ঠেলে দেয়ার পেছনে শেখ হাসিনার সুদূরপ্রসারী চিন্তা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তিকে একটা নতুন দিকদর্শন দিয়েছেন। আমাদের ল্য মুক্তিযুদ্ধের পরে শক্তি মতায়ও থাকবে, বিরোধী দলেও থাকবে।’
জাতীয় পার্টির (জেপি-মঞ্জু) মহাসচিব শেখ শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা বিরোধী দলে যাবো না। অন্যদেরও বিরোধী দলে যাওয়ার সুযোগ নেই।’
আওয়ামী লীগ চাচ্ছে জাতীয় পার্টির মতো ১৪ দলের শরিকরাও সংসদে বিরোধী দলে যাক। কিন্তু শরিকরা একাট্টা, তাদের মন্ত্রী বানানো না হলেও তারা ক্ষমতাসীন দলেই থাকবে। কিন্তু গত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থেকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তাদেরকে ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাখতে চাচ্ছে না।
১৪ দলের কোনো নেতারই গত ১০ বছরের রেপুটেশন সন্তোষজনক নয়। মন্ত্রী হয়ে তারা নিজেকে এবং নিজের দলকেই প্রাধান্য দিয়েছেন। আওয়ামী লীগের কিসে সম্মান হবে, সে বিষয়টি তারা মোটেও না ভেবে আখের গোছানোতেই ব্যস্ত ছিলেন। নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতির রাশও তারা টানতে পারেননি।
জনসমর্থনহীন এসব নেতাকে গত ১০ বছর আওয়ামী লীগ অনেক দিয়েছে। কিন্তু এর বিনিময়ে তারা জনগণকে কিছুই দিতে পারেনি। তারা যাতে জনগণকে কিছু দিতে পারে সেজন্য বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা তাদের বিরোধী দলে যেতে বলেছেন। কারণ বিরোধীদলে থেকে তারা সরকারের যে গঠনমূলক সমালোচনা করতে পারবে, তাতে লাভ হবে জনগণেরই। সরকারের ভুল কাজকে আটকে দিতে পারে একমাত্র বিরোধীদলই। আর সে দৃষ্টিকোণ থেকেই আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ১৪ দলের শরিকদলগুলোকে বিরোধী দলে যেতে বলেছেন।
৩০ জানুয়ারির মধ্যেই জানা যাবে, ১৪ দলের নেতারা আসলে কী সিদ্ধান্ত নেন।