রাজনীতি

উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ ইস্যুতে দ্বিধাদ্বন্দ্বে বিএনপি

ইয়াসির আরাফত
এবার উপজেলা পরিষদের নির্বাচন হবে পাঁচ ধাপে। মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিভাগওয়ারি ধাপে ধাপে নির্বাচন হবে। ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে তফসিল ঘোষণা এবং জেলা সদরে অবস্থিত উপজেলাগুলোতে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোট নেয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। ১৯ জানুয়ারি আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে নির্বাচন কমিশনের সভায় এসব সিদ্ধান্ত হয়।
ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে ইসি প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিভাগওয়ারি ৪টি ধাপে এবং যেসব উপজেলার মেয়াদ পরে পূর্ণ হবে সেগুলো নিয়ে আরেকটি ধাপ, মোট পাঁচটি ধাপে এবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন করা হবে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই ইসির এই ঘোষণার পর শুরু হয়েছে উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি। দেশজুড়ে বইছে নির্বাচনি হাওয়া।
এবার প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় প্রতীকে হবে উপজেলা নির্বাচন। ফলে এবার ভোট নিয়ে মতাসীন দলে আছে বাড়তি আগ্রহ। তবে জাতীয় নির্বাচনে হেরে যাওয়া বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে আগ্রহে ভাটা পড়েছে। অনানুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির তরফ থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে না। উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে না Ñ এ ধরনের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও দেখা যাচ্ছে, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিএনপির তৃণমূলে আগ্রহের কমতি নেই। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো শেষ মুহূর্তে এসে বিএনপি উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে Ñ এটা ধরেই তৃণমূলের নেতাকর্মীরা উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছেন।
উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রশ্নে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্ব থাকলেও তৃণমূলের নেতাদের মধ্যে কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব নেই। তারা নির্বাচনে অংশ নেয়ার জোর প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন। বিশেষ করে গত টার্মে বিএনপির টিকিটে নির্বাচনে অংশ নিয়ে যারা উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান হয়েছিলেন, তাদের আগ্রহটাই বেশি। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত যেটাই হোক, তারা কিছুতেই মাঠ ছেড়ে দিতে চাচ্ছেন না। তাদের কথা হলো উপজেলা নির্বাচনে অংশ না নিলে বিএনপি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া দলে পরিণত হবে। তাই স্থানীয় পর্যায়ের বিএনপির অনেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্বদেশ খবর প্রতিবেদকে বলেছেন, চূড়ান্ত পর্যায়ে দলের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না থাকলেও বিএনপির অনেক স্থানীয় নেতা স্বতন্ত্রভাবে হলেও উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়া প্রশ্নে বিএনপিতে যখন এই দ্বিধাদ্বন্দ্বমূলক অবস্থা তখন আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা ও স্থানীয় নবনির্বাচিত এমপিদের কাছাকাছি ভিড়তে শুরু করেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নবঞ্চিত অনেকে এখন চাচ্ছেন উপজেলায় প্রার্থী হতে। মনোনয়নের দৌড়ে থাকা নেতারা এরই মধ্যে এলাকায় ব্যানার-ফেস্টুন টাঙিয়ে সবার কাছে দোয়া চাইছেন। পুরনো প্রার্থীদের সঙ্গে এবার চারদিকে নতুন মুখের ছড়াছড়ি। জেলা পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতাদের পুত্র, ভাতিজা, ভাগিনারা Ñ যাদের বয়স ২০-২১, তারাও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে ব্যানার-ফেস্টুনে এলাকা ছেয়ে ফেলেছেন।
প্রতিটি উপজেলায় আওয়ামী লীগের ৪-৬ জন করে সম্ভাব্য প্রার্থী সরব রয়েছেন। বিএনপির কোনো প্রার্থী এখনও মাঠে নেই। তৃণমূলের বিএনপি নেতারা বলছেন, এখন পর্যন্ত কেন্দ্র থেকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে কোনো নির্দেশনা আসেনি। তবে প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য ঠিকই তাদের প্রস্তুতি চালিয়ে যাচ্ছেন।
আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেছেন, সংশ্লিষ্ট উপজেলা ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাদের স্বারসহ সম্ভাব্য তিনজন প্রার্থীর নাম কেন্দ্রে পাঠাবেন। সেখান থেকে উপজেলা নির্বাচন মনোনয়ন বোর্ড একজন প্রার্থীকে মনোনয়ন দেবেন। এছাড়া আওয়ামী লীগ জরিপ চালিয়েছে, সেই জরিপে যারা এগিয়ে ও যোগ্য, তাদের মনোনয়ন দেয়া হবে।
এদিকে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেছে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত বৈঠকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো অনিয়মের আশঙ্কায় ধানের শীষ প্রতীকে আসন্ন উপজেলা নির্বাচন না করার পে মতামত দেন স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ সদস্য। তবে দলের কেউ স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে চাইলে বিএনপি আপত্তি করবে না। পরে সিদ্ধান্ত হয়, উপজেলা নির্বাচন নিয়ে ২০ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের মতামত গ্রহণ করা হবে।
দলের সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, বিগত এক দশক ধরে মতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাতীয় নির্বাচনসহ একাধিক স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছে বিএনপি। কখনও দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে সেখানে মতাসীনরা কিভাবে অনিয়ম করে তা দেশের নতুন প্রজন্ম ও বিদেশিদের সামনে প্রমাণ করতে এবং আন্দোলনের অংশ হিসেবে এসব নির্বাচনে অংশ নেয়া হয়েছে। বারবার মতাসীনদের অনিয়মের চিত্র প্রকাশ পেয়েছে, প্রমাণ হয়েছে। নতুন করে সেই চিত্র আর প্রকাশ করার দরকার নেই বলেই বিএনপি এবার উপজেলা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
বিএনপি নেতাদের এসব বক্তব্য সত্ত্বেও দলটির তৃণমূল কিন্তু উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেয়ার জন্য একাট্টা। অপরদিকে কেন্দ্রীয় নেতারা এই নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছেন না। বিশেষ করে দলীয় প্রতীকে উপজেলা নির্বাচন করতে কেন্দ্রীয় নেতাদের মোটেও আগ্রহ নেই। তারা মনে করেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের জন্য তারা যে সিমপ্যাথেটিক ভোট আশা করেছিলেন, তাতে জনগণের কাছ থেকে মোটেও সাড়া পাননি। উপজেলা নির্বাচনে সে সাড়া আরো কমে যাবে। তাছাড়া উপজেলা নির্বাচনে মানুষ ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীকেই বিজয়ী করতে চায় এজন্য যে, তাতে এলাকার সুষম উন্নয়ন হবে।
বিএনপির উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে তৃণমূলের ইতিবাচক মনোভাবের বিপরীতে কেন্দ্রীয় নেতাদের নেতিবাচক মনোভাব নিয়ে এগিয়ে চলছে দিগভ্রান্ত বিএনপির রাজনীতি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এতে তৃণমূলেরই জয় হবে। তারা ধানের শীষ বাদ দিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভিন্ন প্রতীকে উপজেলা নির্বাচনে অংশ নেবে। আর এভাবেই বাংলাদেশের নির্বাচনি মাঠ থেকে ধানের শীষ প্রতীকটির শৌর্য-বীর্য ম্রিয়মান হতে থাকবে।