কলাম

কেমন যাবে ২০১৯ সালের অর্থনীতি

ড. আর এম দেবনাথ
২০১৮ সাল শেষ হলো, খুবই বড় ঘটনা দিয়ে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে ৩০ ডিসেম্বর। আর্থিক সাল দিয়ে বিচার করলে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের প্রথম ৬ মাস শেষ। শুরু হয়ে গেছে দ্বিতীয়ার্ধ। শুরুটা হলো শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো অর্থনীতি ও ব্যবসাবাণিজ্য কেমন যাবে? কেমন যাবে ২০১৯ সালের অর্থনীতি?
অবস্থা যা দৃশ্যমান তাতে ব্যবসাবাণিজ্য ও অর্থনীতি ভালো যাওয়ার কথা। এখন ভরা শীতকাল, ধান-চালের বাজার নিম্নমুখী। কিছুদিন আগেই নতুন ফসল উঠেছে। আমন ফসল ভালো হয়েছে। মূল্যস্ফীতি (ইনফেশন) সর্বনিম্ন পর্যায়ে। নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ৫ দশমিক ৩৪ শতাংশ। খুবই সহনশীল বৃদ্ধি। মূল্যস্তর সহনশীল পর্যায়ে। দেশের কোথাও খাদ্যাভাব নেই। গ্রামবাংলা এখন ক্যাশে ভরপুর। রেমিট্যান্স নভেম্বর মাসে ভালো এসেছে Ñ এক দশমিক ১৭ বিলিয়ন ডলার। বছর শেষে তা ১৪-১৫ বিলিয়ন ডলার হবে। রেমিট্যান্সের টাকা (ক্যাশ), তার সঙ্গে নির্বাচনি ব্যয়, সরকারের ব্যয় এবং প্রার্থীদের ব্যয়। প্রার্থীদের সিংহভাগ ধনাঢ্য ব্যবসায়ী, শিল্পপতি, মিডিয়ার মালিক, রাজনীতিবিদ-কাম-ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তারা হাত খুলে খরচ করেছেন। এর প্রভাব বাজারে আছে। নগদ ঘুরছে হাতে হাতে। মানুষ আনন্দ করেছে। চা-বিস্কুট খেয়েছে। নাস্তা-পরোটা খেয়েছে, লাঞ্চ করেছে। এই প্রবণতা আগামী দিনেও থাকবে।
আরেকটি লণ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। মাঝখানে এতে একটু টান পড়েছিল। কিন্তু সর্বশেষ তথ্যে দেখা যাচ্ছে, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভের পরিমাণ বছর শেষে দাঁড়িয়েছে ৩২ বিলিয়ন ডলারের ওপর। তাহলে ২০১৯ সালটি শুরু হচ্ছে ভালো রিজার্ভ দিয়ে। এর ওপর যে চাপ শুরু হয়েছিল তা আপাতত শেষ।
আমদানি ও রফতানিতে বিরাট পার্থক্য ঘটে যাচ্ছিল। আমদানি ছিল বেশি, রফতানি কম। আমদানির পরিমাণ বাড়ছিল দুটো কারণে। প্রথমত ব্যবসায়ীদের কারণে, দ্বিতীয়ত সরকারের কারণে। সরকার তার অবকাঠামোর জন্য আমদানি করছিল। আপাতত ওই ধাক্কা শেষ। সেজন্য ব্যালেন্স অব পেমেন্টে (বিওপি) যে চাপ তৈরি হয়েছিল, সে চাপ রহিত হয়েছে।
২০১৮ সালের শেষ দিকে ডলারের দাম স্থিতিশীল হয়। ডলারের ওপর চাপ বহুলাংশে হ্রাস পেয়েছে। ২০১৯ সালের দিকে এ প্রবণতা অব্যাহত থাকবে বলে আমার ধারণা।
এই ধারণা করার কারণ আছে। আন্তর্জাতিক সকল খবরেই দেখা যাচ্ছে, বাজারে তেলের মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা নেই। মাঝখানে একটা ত্রাহি ত্রাহি অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। প্রতিবেশী ভারতে খুব বড় প্রভাব পড়েছিল। আমাদেরও বাজেট ঘাটতির পরিমাণ নিয়ে জল্পনাকল্পনা শুরু হয়। আশার কথা, তেলের দামের ঊর্ধ্বগতি রোধ হয়েছে। তেল উৎপাদন স্বাভাবিক পর্যায়ে এসেছে। তেলের দামও বেশ হ্রাস পেয়েছে। এটা যে কত বড় স্বস্তির ঘটনা হবে ২০১৯ সালে তা যারা বাজেট করেন তারাই জানেন। বস্তুত তেলের মূল্যের নিম্নগতি এবং স্থিতিশীলতা আমাদেরকে স্বস্তি দিয়ে যাচ্ছে অনেক দিন যাবৎ।
আবার অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে চালের মূল্যও স্বাভাবিক ও স্থিতিশীল রয়েছে। অনেক ভোগ্যপণ্যের দামও স্থিতিশীল। ভারতে এই মুহূর্তে পেঁয়াজের দাম খুবই নিচুতে। তাদের এতে অসুবিধা হলেও আমাদের তাতে লাভ। আমরা পেঁয়াজ আমদানি করি। ভারতের সঙ্গে আমাদের দ্বিপাকি বাণিজ্য প্রচুর।
ভারতীয় মুদ্রার অবমূল্যায়ন ঘটায় আমরা একই ডলারে বেশি ভারতীয় পণ্য আমদানি করতে পারব ২০১৯ সালে। এটাও স্বস্তির বিষয়। একই ঘটনা ঘটবে চীনাদের সঙ্গে। বাণিজ্য করার সময়ে। সেখানেও স্বস্তি মিলবে বলে আমার ধারণা।
এদিকে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে একটা সংশোধনমূলক প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। বিগত দিনে, অনেকের মতে, প্রয়োজনীয় ঋণ বৃদ্ধি ঘটেছে। এতে ব্যাংকগুলোর সমস্যা বৃদ্ধি পায়। আমানতের প্রবৃদ্ধি কম অথচ ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হচ্ছিল। এতে তারল্য সংকট দেখা দেয়। অনেক ব্যাংক এই সংকট মোকাবিলায় হিমসিম খাচ্ছিল। সেজন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে অনেক পদপে গ্রহণ করতে হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য স্ট্যাটুটরি লিক্যুইডিটি রেশিও পরিবর্তন করতে হয়। সরকারের আমানত গ্রহণের েেত্র ব্যাংকগুলোকে, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলোকে বিশেষ ছাড় দিতে হয়। এর ফলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে শুরু করে। এদিকে ঋণ সরবরাহ বৃদ্ধিতে কিছুটা ভাটা পড়ে। এটা খারাপ লণ নয়। ব্যাংকগুলো একটু দম ধরার সময় পেয়েছে। এর ফলে ২০১৯ সালে তাদের পে হাল ধরা সম্ভব হবে। নতুন বিনিয়োগে তারা প্রয়োজনীয় অর্থ সরবরাহ করতে পারবে।
২০১৮ সালে দেশীয় বিনিয়োগের েেত্র এতটা আশাপ্রদ ঘটনা ঘটেনি। অনেকেই বলেন, এর জন্য দায়ী নির্বাচন। ২০১৮ ছিল নির্বাচনি বছর। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই ওয়েট অ্যান্ড সি নীতি অনুসরণ করেন। তবু তথ্যে দেখা যায়, ২০১৭ সালের তুলনায় ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে ১৩টি নতুন কোম্পানি ২০১৮ সালে ৫৪০ কোটি টাকা আইপিওর মাধ্যমে বাজার থেকে উত্তোলন করে। অথচ ২০১৭ সালে পুঁজি উত্তোলনের পরিমাণ ছিল প্রায় অর্ধেক। এই মন্দার বাজারে এটা অবশ্যই ভালো খবর। আমার ধারণা, নতুন সরকার শপথ নেয়ার পর পরিস্থিতি, বিশেষ করে বিনিয়োগ পরিস্থিতির উন্নতি হবে।
ইতোমধ্যে অর্থনৈতিক জোনগুলোর কয়েকটি কার্যোপযোগী হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের সমস্যা ছিলÑ তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও জমি। জমি পাওয়াই যাচ্ছিল না। পেলেও দাম অনেক বেশি। জমির সমস্যা অনেকাংশে অর্থনৈতিক অঞ্চল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে সমাধান হবে বলে আশা করা যায়। বিদ্যুৎ উৎপাদনও বেশ বেড়েছে। এখন শিল্প উদ্যোক্তারা আগের চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ পাচ্ছেন।
তবে সমস্যা থেকে যাচ্ছে ঋণের সুদ, যা এখনো বেশি। সরকারের ৯-৬ নীতি এখনও ব্যাংকগুলো সর্বাংশে কার্যকর করতে পারেনি। এর কিছু সমস্যাও বিদ্যমান। আমানতকে বেশি সস্তা করলে সঞ্চয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। জনগণকে সঞ্চয়ে নিরুৎসাহিত না করে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কঠিন কাজ, তবে এর কোনো বিকল্প নেই।
রাজস্ব আহরণে শ্লথগতি দেখা দিয়েছে। এটা কি অতিরিক্ত টার্গেট করার কারণে, না ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দার কারণে তা খতিয়ে দেখতে হবে। তা না হলে রাজস্ব ঘাটতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। এসব দিকে ২০১৯ সালে নতুনভাবে নজর দিতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় বিনিয়োগ। এর জন্য প্রথম থেকেই উঠেপড়ে লাগতে হবে।
লেখক: অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকার