প্রতিবেদন

ঢাকার যানজট নিরসনে ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

হাফিজ আহমেদ
শহরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের কারণে যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী। সরকারও রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করে চলেছে। ঢাকার যানজটের অন্যতম কারণ হিসেবে পণ্যবাহী ট্রাক ও ট্যাংক লরিকে দায়ী করা হয়। চট্টগ্রাম থেকে আমদানিকৃত পণ্য উত্তরবঙ্গ পাঠাতে হলে রাজধানীর ওপর দিয়েই যেতে হয়। ভারী যানবাহন রাজধানী অতিক্রমের সময় যে চাপ সৃষ্টি করে তাতেই তৈরি হয় অনেক যানজট। এই যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হয় হাজার হাজার কর্মঘণ্টা। এতে চাপ পড়ে অর্থনীতির ওপর।
রাজধানীর যানজট নিরসনে এ পর্যন্ত অনেক কর্মপন্থাই নির্ধারণ করা হয়েছে। সেসবের কিছু বাস্তবায়ন হয়েছে, কিছু বাস্তবায়নের পথে। মেট্রোরেল, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিটের (বিআরটি) কাজ এগিয়ে চলছে দ্রুতগতিতে। পাশাপাশি রাজধানীর ফুটপাত অবমুক্তকরণ, ট্রাফিক আইন শক্তিশালীকরণ, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহনকে রাজধানী থেকে অপসারণসহ নানাবিধ সমস্যা সমাধানের পরও যানবাহনের চাপ কিছুতেই কমানো যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বাইরে থেকে যেসব যানবাহন প্রতিদিন রাজধানীতে ঢোকে ও বেরিয়ে যায়, তাদের যদি ভিন্নপথে রাজধানী অতিক্রম করানো যেত, তাহলে যানজট সমস্যার অনেকটাই সমাধান হয়ে যেত। নগর বিশেষজ্ঞদের এ পরামর্শ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে এবার জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এই বাইপাস সড়ক নির্মিত হলে পণ্য নিয়ে ট্রাক এবং ট্যাংক-লরির মতো ভারী যানবাহন আর ঢাকায় ঢুকবে না। রাজধানীর পাশ দিয়ে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে চলে যাবে এসব পণ্যবাহী যান।
জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণ এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে গৃহীত। আশার কথা হলো এ প্রকল্পটিতে এবার যুক্ত হলো এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্পে আর্থিক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করবে এই উন্নয়ন সংস্থাটি। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বে (পিপিপি) সম্পন্ন হবে প্রকল্পটি।
সমন্বিতভাবে এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়নার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিচুয়ান রোড অ্যান্ড ব্রিজ গ্র“প করপোরেশন, শামীম এন্টারপ্রাইজ ও ইউডিই কনস্ট্রাকশন লিমিটেড। গত ৯ জানুয়ারি এ তিন প্রতিষ্ঠানের কনসোর্টিয়ামের সঙ্গে এ বিষয়ে সরকারের একটি চুক্তি স্বারিত হয়েছে।
প্রকল্পসূত্রে জানা যায়, এশিয়ান হাইওয়ের দুটি আন্তর্জাতিক (এএইচ-১, এএইচ-২) ও একটি আঞ্চলিক (এএইচ-৪১) রুট বাংলাদেশের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করেছে। রুট ৩টির অন্তর্ভুক্ত ১৭৪১ কিলোমিটার সড়ক উন্নয়ন করা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে এশিয়ান হাইওয়ে রুটে অন্তর্ভুক্তির জন্য জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর পর্যন্ত ৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ চার লেনবিশিষ্ট ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে।
এশিয়ান হাইওয়ে মানের সড়ক মূলত ‘প্রাইমারি বা ধমনি সড়ক’ নামে পরিচিত। এগুলোয় প্রবেশ সংরতি থাকে, যাতে অযান্ত্রিক ও ধীরগতির যানবাহন প্রবেশ করতে না পারে। স্থানীয় ধীরগতির ও অযান্ত্রিক (স্কুটার, সিএনজি, অটোরিকশা, ভ্যান, বাইসাইকেল) যানগুলোর জন্য পৃথক সড়ক (সার্ভিস রোড) থাকবে। আর প্রাইমারি সড়কের দুই পাশে নিরাপত্তামূলক বেষ্টনী বা সীমানাপ্রাচীর থাকবে যাতে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলতে পারে। ন্যূনতম চার লেনের এসব সড়কে কোনো মোড় থাকবে না। এ ছাড়া সড়কের দুই পাশে কমপে ৫০ মিটারের মধ্যে কোনো জনবসতি বা স্থাপনা রাখা যাবে না। প্রতি কিলোমিটার পরপর উল্লেখ থাকবে পরবর্তী জেলার নাম ও দূরত্ব। এসব সড়কের পাশ দিয়ে পথচারী চলাচল বা আড়াআড়ি সড়ক পারাপারও নিষিদ্ধ থাকবে বলে জানা গেছে।
৪৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা বাইপাস সড়কটি শুরু হবে জয়দেবপুর থেকে। এরপর দেবগ্রাম, ভুলতা হয়ে নারায়ণগঞ্জের মদনপুর পর্যন্ত যাবে। বর্তমানে একই অ্যালাইনমেন্টে দুই লেনের বাইপাস সড়ক রয়েছে। এটিতে চার লেনের এক্সপ্রেসওয়ে ও দুই পাশে ধীরগতির যান চলাচলের জন্য পৃথক লেন নির্মাণ করা হবে। সড়কটি উত্তরে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক ও দেিণ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ককে সংযুক্ত করবে। এর বাইরে ভুলতায় ঢাকা-সিলেট ও ভোগরায় সংযোগ ঘটাবে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের।
প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে রাজধানী ঢাকার ভেতরে প্রবেশ ছাড়াই পূর্বাঞ্চল থেকে উত্তরাঞ্চলে যানবাহন চলাচল করবে। সড়কটিতে নির্বিঘেœ যানবাহন চলাচলের জন্য চারটি ইন্টারচেঞ্জ, ৫টি টোলপ্লাজা, ২টি রেলওয়ে ওভারপাস ও ৪টি ওভারপাস নির্মাণ করা হবে। এর বাইরে ৬টি সেতু প্রশস্ত করা এবং পথচারী ও ধীরগতির যানবাহনের জন্য একাধিক আন্ডারপাস নির্মাণ করা হবে।
পিপিপির ভিত্তিতে সড়কটি নির্মাণে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২২৩ কোটি টাকা দেবে বাংলাদেশ সরকার। অবশিষ্ট টাকা বিনিয়োগ করবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান, যা সরবরাহ করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। চুক্তি অনুযায়ী, এ বছরের সেপ্টেম্বরে প্রকল্পের কাজ শুরু করবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো। শেষ করতে হবে ২০২২ সালের মধ্যে। ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানগুলো পরবর্তী ২৫ বছর টোল আদায়ের মাধ্যমে বিনিয়োগকৃত টাকা তুলে নেবে। এ সময়ে সড়কটির রণাবেণ ও পরিচালনার দায়িত্বেও থাকবে তারা। বাইপাস সড়কটির ধীরগতি লেন দিয়ে টোলমুক্তভাবে চলাচল করা যাবে।
চুক্তি স্বার অনুষ্ঠানে পিপিপি কর্তৃপরে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ আফসার এইচ উদ্দিন বলেন, এ প্রকল্প বাংলাদেশে জনসেবার েেত্র একটি নতুন মাত্রা এনে দেবে। এটি দেশের প্রথম প্রবেশ নিয়ন্ত্রিত এক্সপ্রেসওয়ে।