রাজনীতি

দল ও নেতাকর্মীদের চাঙা করতে বিএনপির নানামুখী উদ্যোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজনীতিতে বিএনপির অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরে-বাইরে নানান আলোচনা-সমালোচনা চলছে। বিশেষ করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল একেবারে ভেঙে গেছে। রাজনৈতিক অঙ্গনে এমনকি বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মীর মাঝেও এ নিয়ে ক্ষোভ, হতাশা ও সমালোচনা রয়েছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা, ঐক্যফ্রন্ট গঠন ও জামায়াত ইস্যুতে বিএনপিতে নানামুখী মত ও সিদ্ধান্ত ছিল। দলের একটি অংশ ঐক্যফ্রন্টের সাথে বিএনপির জোট গঠনের বিরোধী ছিল, একটি অংশ খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিরোধী ছিল। আবার জামায়াত ইস্যুতেও দলে বড় ধরনের বিভক্তি ছিল এবং এখনও রয়েছে।
এ ধরনের হাজারো সমস্যায় জর্জরিত বিএনপি। তাছাড়া বিএনপির নেতাকর্মীদের নিজেদের মধ্যে পরস্পরের প্রতি আস্থা-বিশ্বাসের অভাব রয়েছে। দলে কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। একজন শীর্ষ নেতা আরেকজন শীর্ষ নেতাকে নিজ দলবিরোধী ও সরকারের দালাল বলে মনে করে।
তাছাড়া চরম নেতৃত্বসংকটে রয়েছে দলটি। বিএনপির কেউ তারেক রহমানকে তাদের নেতা মনে করেন। আবার কেউ খালেদা জিয়াকে দলের নেতা মনে করেন। অনেকে আবার মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিএনপির কান্ডারি মনে করেন।
দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত খালেদা জিয়া বর্তমানে কারাবন্দি এবং তারেক রহমানও দুর্নীতি ও গ্রেনেড হামলা মামলার সাজাপ্রাপ্ত পলাতক আসামি হওয়ার কারণে বিএনপির এ রকম চরম দুরবস্থা। সর্বশেষ খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অনুপস্থিতিতে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে বিএনপি-জামায়াতের চরম পরাজয়ের পাশাপাশি খালেদা জিয়ার কারামুক্তি অনেকটা অনিশ্চিত হওয়ার কারণে বিএনপিতে এখন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংকট বিরাজমান।
এ অবস্থায় দলের নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করতে বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের অনেকে দলের সপ্তম জাতীয় কাউন্সিলের কথা ভাবছেন। তবে এ নিয়ে দ্বিমতও রয়েছে। নতুন করে কাউন্সিল হবে, নাকি ষষ্ঠ কাউন্সিলের শূন্য থাকা পদগুলো পূরণ করা হবে, তা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব রয়েছে কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে।
এই দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যেই বিএনপিতে পুনর্গঠনের হাওয়া বইছে। দলের কিছু শীর্ষ নেতা দাবি তুলেছেন পরিবর্তনের। একাদশ সংসদ নির্বাচনের পটভূমিতে নেতৃত্বের ব্যর্থতা-সফলতা নিয়েও আলোচনা-সমালোচনা চলছে দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। জাতীয় কাউন্সিল করে নেতৃত্ব ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব উঠেছে। নতুনরূপে বিএনপিকে দেখতে চান হতাশ ও বিপর্যস্ত তৃণমূল নেতারা। তবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারান্তরীণ থাকায় কোনো কোনো নেতা এখনই সপ্তম কাউন্সিল করতে চান না। এেেত্র খালেদা জিয়াসহ নেতাকর্মীদের মুক্ত করে একটি স্বাভাবিক পরিবেশে কাউন্সিল অনুষ্ঠানের পরে পাল্লাই ভারী।
লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে নির্বাচনের পর গত দুই সপ্তাহে দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সিরিজ বৈঠক ডেকে স্কাইপেতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনিও দলকে নতুন করে সাজাতে চান বলে জানা গেছে। তবে তড়িঘড়ি করে নয়। সারাদেশে সংগঠনের বর্তমান অবস্থার সার্বিক চিত্র সম্পর্কে খোঁজখবর নিয়ে সিদ্ধান্ত জানাবেন তিনি।
৩০ ডিসেম্বর-২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপির নীতিনির্ধারকরা দলের ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক করণীয় নির্ধারণে এ পর্যন্ত দুই দফা বৈঠক করেছেন। জানা গেছে, এসব বৈঠকে দল পুনর্গঠন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। কাউন্সিলের প্রস্তাবও এসেছে। গত ১৯ জানুয়ারি জিয়াউর রহমানের জন্মবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ দুই নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন ও ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অত্যন্ত জোরালোভাবে দল পুনর্গঠনের কথা বলেছেন। যদি ব্যর্থ হন, পদ ছেড়ে দিতেও রাজি আছেন বলে এ সময় তারা নেতাকর্মীদের আশ্বস্ত করেন।
দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের জামায়াতপন্থি অংশটি মনে করছে, তাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মুক্ত করা। পাশাপাশি এখনই আন্দোলনে না গিয়ে সারাদেশে গ্রেফতার হওয়া নেতাকর্মীদের জামিনে মুক্ত করে আনা। এই ফাঁকে দলের পুনর্গঠনের কাজটি সেরে ফেলা।
এ অংশের জোরালো বক্তব্য হচ্ছে খালেদা জিয়াকে মুক্ত না করে কোনোভাবেই কাউন্সিল আয়োজন করা ঠিক হবে না। বর্তমানে জাতীয় নির্বাহী কমিটির শূন্য থাকা পদগুলো আগে পূরণ করা হোক। পরে সঠিক ও সুবিধাজনক সময়ে কাউন্সিল আয়োজন করা যেতে পারে।
তবে জ্যেষ্ঠ নেতাদের উদারপন্থি অংশের মত হচ্ছে প্রথমেই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীদের সঙ্গে বসে তাদের মতামত শুনে একটি সারসংপে তৈরি করা। পরে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা আহ্বান করে নেতাদের মতামত নেয়া উচিত। এর পরপরই কাউন্সিলের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নেয়ার জন্য তৈরি হওয়া দরকার।
যদিও কাউন্সিল বিষয়ে খালেদা জিয়া এখনো কোনো মতামত দেননি, তবে জানা গেছে, লন্ডনে থাকা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এ বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। এরই মধ্যে তিনি বিভাগওয়ারি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গুলশানে চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এ বৈঠক হবে। স্কাইপেতে এতে যুক্ত হবেন তারেক রহমান। জানুয়ারির শেষ সপ্তাহ থেকে এ বৈঠক শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
জানা গেছে, দল পুনর্গঠনের দাবি উঠলেও তা কিভাবে শুরু হবে, সেটি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের ওপর ছেড়ে দেয়া হয়েছে। নেতাকর্মীদের চাহিদার আলোকে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে লন্ডনে তারেক রহমানের কাছে বার্তা দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা বা পরামর্শ আসার আগ পর্যন্ত নতুন সিদ্ধান্তগ্রহণ থেকে বিরত রয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকরা। অন্তত আগামী ৬ মাস তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত ও রাজনৈতিক নির্দেশনা পর্যবেণ করার কথা ভাবছেন দলটির কেন্দ্রীয় কয়েক নেতা।
সম্প্রতি গুলশানে দলের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলের কাউন্সিলের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে দলের জামায়াতপন্থি ও উদারপন্থি কোনো পই নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেনি, যদিও একপক্ষ আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জোর দিতে বলেছেন।
বিএনপির নির্বাহী কমিটির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ। সেটা ছিল ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিল। দলটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় নির্বাহী কমিটি ৩ বছরের জন্য নির্বাচিত হবে এবং পরবর্তী জাতীয় নির্বাহী কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ না করা পর্যন্ত এই কমিটিই দায়িত্ব পালন করবে।
জানা গেছে, সর্বশেষ কাউন্সিলে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির পরিধি বাড়িয়ে ১৯-এ উন্নীত করা হয়েছিল। কিন্তু কাউন্সিলের পর পুনর্গঠিত কমিটিতে দুটি পদ ছিল শূন্য। ১৭ সদস্যবিশিষ্ট কমিটির দুজন তারেক রহমান ও সালাহউদ্দিন আহমেদ আইনি জটিলতার কারণে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন দেশের বাইরে। মূলত ১৫ সদস্যবিশিষ্ট কমিটিই ছিল বিএনপি নীতিনির্ধারক ফোরাম। আবার এই ১৫ জনের মধ্যে বিগত পৌণে তিন বছরে তরিকুল ইসলাম, আ স ম হান্নান শাহ ও এম কে আনোয়ার মারা গেছেন। আসছে ৮ ফেব্র“য়ারি কারাগারে ১ বছর পূর্ণ হবে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার। তাছাড়া শারীরিক অসুস্থতার কারণে লেফটেন্যান্ট জেনারেল মাহবুবুর রহমান (অব.) ও ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া বেশিরভাগ সভায় অংশ নিতে পারেন না। ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলের পর পুনর্গঠিত কমিটির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে হারুন অর রশিদ খান মুন্নু, ফজলুর রহমান পটল, আকতার হামিদ সিদ্দিকী, সৈয়দ ওয়াহিদুল আলম, সঞ্জীব চৌধুরী, গবেষণা সম্পাদক আবু সাঈদ খান খোকন, ধর্ম সম্পাদক বদরুজ্জামান খসরু, জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যদের মধ্যে মোজাহার হোসেন, এম এ মজিদ, সরওয়ার আজম খান, আবুল কাশেম চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন মারা গেছেন। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির অন্তত অর্ধশতাধিক নেতা বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে এখন সাংগঠনিক কর্মকা-ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন।
জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকা-কে সক্রিয় করতে ষষ্ঠ কাউন্সিলে পদ পাওয়া যেসব নেতা মারা গেছেন এবং যে পদগুলো শূন্য ছিল Ñ সেগুলোই আগে পূরণের চেষ্টা করছে বিএনপি। এরপর তারা সপ্তম কাউন্সিলের দিকে এগুবে। তবে তার আগে দলটি খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির বিষয়ে আলোচনা ও আন্দোলন একসাথে চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তবে বিএনপির রাজনীতিতে সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে খালেদা জিয়ার প্যারোলে মুক্তির ইস্যুটি। এ নিয়েও দলে নানা মত, নানা যুক্তি ও ব্যাখ্যা রয়েছে। এ বিষয়ক আলোচনায় অনেক নেতাই বলছেন, দেশের পরিবেশ-পরিস্থিতি ও অতীত অভিজ্ঞতা দেখে মনে হচ্ছে আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার কারামুক্তির সম্ভাবনা আপাতত নেই। সেক্ষেত্রে খালেদা জিয়া চাইলে এবং সরকারের সাথে পর্দার অন্তরালে আলোচনা ও সমঝোতা ছাড়া অর্থাৎ সরকারের সমর্থন ও সিদ্ধান্ত ছাড়া খালেদা জিয়ার প্যারোলে কারামুক্তি সম্ভব নয়। তাছাড়া প্যারোলে মুক্তির কারণ ও শর্ত হতে পারে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়ার বিদেশযাত্রা। আর ঘটনাটি যদি এমন হয়, তাহলে পরবর্তীতে খালেদা জিয়ার দেশে ফেরার বিষয়টিও তারেক রহমানের মতো ঝুলেও যেতে পারে। যদি ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে এমনটি ঘটে, তাহলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপির অস্তিত্বও এক সময় ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। এ ধরনের সিরিয়াস বিষয় নিয়েও দলের বিভিন্ন পর্যায়ে এখন নেতাকর্মীদের মাঝে আলোচনা হচ্ছে। তাই বিএনপির পুনর্গঠন বা কাউন্সিল নয়, বরং দলের অস্তিত্ব নিয়ে ভাবছেন দলের অনেক নেতাকর্মী।