ফিচার

দ্য জিনিয়াস লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি

স্বদেশ খবর ডেস্ক
রেনেসাঁ যুগের অন্যতম পথিকৃৎ মানা হয় লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চিকে। পৃথিবীর চেহারা বদলে দেয়া প্রতিভাবানদের একজন তিনি। মূলত চিত্রশিল্পী হিসেবে পরিচিতি থাকলেও তার গুণের শেষ নেই। তিনি একাধারে একজন বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, চিত্রশিল্পী, নির্মাতা, দার্শনিক ও জ্যোতির্বিদ ছিলেন। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পচর্চায় বিশ্বকে দেখিয়েছেন নতুন দিগন্ত। তার আঁকা মোনালিসা চিত্রকর্মটি এখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত পেইন্টিং।
তার পুরো নাম লিওনার্দো ডি সার পিয়েরো দা ভিঞ্চি। ইতালীয় রেনেসাঁর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভা তিনি। লিওর জীবনকাহিনি নানা রোমাঞ্চে ভরপুর। ১৪৫২ সালে লিওনার্দো ফোরেন্সের ভিঞ্চি শহরের এক গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন জমিদার ও আইনজীবী মেসার পিয়েরো ফরুওসিনো ডি আন্তোনিও দা ভিঞ্চি এবং মা ছিলেন এক স্থানীয় দাসী ক্যাটেরিনা। লিও ছিলেন তাদের ভালোবাসার ফসল। ভিঞ্চির বাবা-মা কখনোই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হননি।
৫ বছর বয়সে বাবার কোলে চড়েই ইতালির ভিঞ্চি গ্রাম থেকে লিও এসেছিলেন ফোরেন্সে। ঘরোয়াভাবে লেখাপড়া করলেও কোনো রকমের আনুষ্ঠানিক শিা গ্রহণ করেননি ভিঞ্চি। লিও ছিলেন গ্রিক এবং ল্যাটিন শিায় বেশ দুর্বল। প্রকৃতির প্রতি ভীষণ আগ্রহ থাকায় বেশিরভাগ সময় তিনি বাইরেই কাটাতেন। তরুণ বয়সে তাকে আন্দ্রে ডেল ভেরোচ্চির কাছে শিানবিশ হিসেবে পাঠানো হয়। ভেরোচ্চির কাছে এসে লিও শুধু ছবিই আঁকেননি, সঙ্গে রঙ মেশানো, ঘর মোছা এসব কাজও করেছিলেন।
তবে আর্টিস্ট লিও ২০ বছর বয়সে এসে ভেরোচ্চির চোখ ধাঁধিয়ে দেন বিখ্যাত দ্য ব্যাপটিজম অব ক্রাইস্ট ছবিটি আঁকায় সাহায্য করে। সেই শুরু। পরবর্তীতে লিওনার্দো তার লাস্ট সাপার, ভার্জিন অব দ্য রকস, আর মোনালিসা এঁকে পুরো চিত্রশিল্পের জগতেই বিস্ময় জাগিয়েছেন।
ফোরেন্সে শিানবিশি শেষে মিলানে এসে নতুন করে জীবন শুরু করতে চেয়েছিলেন লিও। এখানে তিনি মিলানের ডিউক, লুডোভিকো মিলানের অধীনে কাজ শুরু করেন। প্রথমে একটি অতিকায় ঘোড়ার মূর্তি দিয়ে শুরু করলেও পরে বিভিন্ন ওয়ার মেশিন তৈরির পরিকল্পনা করেন। তিনি কামান, স্মোক মেশিন, পোর্ট্রেবল ব্রিজ এমনকি বর্মে ঢাকা বিভিন্ন যানবাহনের নকশা করেন। তবে এর কোনোটি আসলে তৈরি করা হয়েছিল কি না তার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তিনি উড়োজাহাজ ছাড়াও প্রথম অস্ত্রসজ্জিত গাড়ি, কামান, মেশিনগান, কৃষিক্ষেতে পানি সেচ কার্যক্রম ও প্যারাসুটেরও মডেল এঁকেছেন।
তবে ভিঞ্চির রহস্যের শিকড় বলা হয় মোনালিসাকে। বলা হয়, মোনালিসার ঠোঁট আঁকতেই ১০ বছর সময় নিয়েছিলেন ভিঞ্চি। মোনালিসা ছবিটি আঁকার সময় কাকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন ভিঞ্চি সেটি কে জানে! বোদ্ধাদের মতে, মডেল হিসেবে হয় লিওনার্দোর মা অথবা ফোরেন্সের জনৈকা ঘেরারদিনি কাজ করেছেন। তবে এখনো এটি প্রমাণিত নয়। এ কথাও বলা হয়, লিও নিজেকে নারীরূপে এঁকে আত্মতৃপ্তি পেতেন। তিনি নিজে বলেছেন, মোনালিসা ভিঞ্চির প্রতিকৃতি।
তার মোনালিসা শিল্পকর্মটি এতটাই সুনিপুণ হয়েছিল যে, মোনালিসাকে কখনো লাজুক, কখনো বেদনা-আক্রান্ত আবার কখনো হাস্যোজ্জ্বল এক সম্ভ্রান্ত নারী মনে হয়।
শত শত বছর ধরে ইতালির বিখ্যাত এই চিত্রকরের আঁকা প্রতিটি চিত্রকর্ম রহস্য হয়েই ছিল। বিজ্ঞানীরা না এর মানে বের করতে পেরেছিলেন, না এর পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্যের অর্থ বের করতে পেরেছিলেন। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু বিজ্ঞানী স্বীকার করেছেন দুর্বোধ্য হলেও ভিঞ্চির নোটবুক থেকে পাওয়া কিছু তথ্য তারা বুঝতে পেরেছেন।
৬৭ বয়সের জীবনে ভিঞ্চি বিশ্ববাসীকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য সব সৃষ্টি। ১৪৭৮ সালে চ্যাপেল অব সেন্ট বার্নার্ড ও অ্যাডোরেশন অব দি ম্যাগি এবং ১৪৮১ সালে মঙ্ক অব সান ডোনাটো এ স্কাপিটো আঁকেন। ১৪৮২ থেকে ১৪৯৯ সালে তিনি ভার্জিন অব দ্য রকস এবং দ্য লাস্ট সাপার চিত্রকর্ম করেন।
তার আঁকা আরও অসংখ্য শিল্পকর্মের মধ্যে দ্য ব্যাপটিজম অব ক্রাইস্ট (১৪৭২), গিনেভ দে বেনসি (১৪৭৪-৭৬), ম্যাডোনা অব দ্য কারন্যাশন (১৪৭৮-৮০), লেডি উইথ এন এরমাইন (১৪৮৯-৯০), দ্য ভার্জিন অ্যান্ড চাইল্ড (১৫১০) অন্যতম। আর এসবের মধ্যে ১৫০৩ থেকে ১৫১৭ সাল পর্যন্ত চলা রহস্যময়ী মোনালিসা সবচেয়ে বেশি আলোচিত। লিও তার লাস্ট সাপার, ভার্জিন অব দ্য রক, আর মোনালিসা এঁকে চিত্রশিল্পের জগতে বিস্ময় জাগিয়েছেন।
রহস্যের আষ্টেপৃষ্ঠে বাধা লিওর জীবন। সৃষ্টিতে নানা রহস্য লুকানো ছাড়াও লিওর মৃত্যু ও সমাধি রহস্য অমীমাংসিত রয়ে গেছে। তার নোটবুকে তিনি লিখেছিলেন, যেমন একটি সুন্দর দিন নিয়ে আসে শান্তির ঘুম, তেমনি সুন্দর জীবন নিয়ে আসে শান্তির মৃত্যু।
১৫১৯ সালের ২ মে ৬৭ বছর বয়সে মারা যান লিও। কিন্তু মৃত্যু কিভাবে তাকে আঁকড়ে ধরেছিল তা নিয়ে রয়েছে নানা মতবিরোধ। কারও মতে যক্ষ্মা, কেউ বা দাবি করেছেন যৌনব্যাধি। সব কিছুকে ছাড়িয়ে বিজ্ঞানীরা আরও বড় ধাঁধা তৈরি করেছেন। তাদের ভাষ্যমতে, ভিঞ্চিকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
তবে প্রশ্ন যতই উঠুক, উত্তর কিন্তু অজানাই। ফ্রান্সের প্রাসাদ গির্জা স্যাঁ ফোরত্যায় সমাধিস্থ করা হয় লিওকে।
ফ্রান্সের ল্যুভর মিউজিয়ামে সংরতি লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসার পোর্ট্রেটটি এখনো জনপ্রিয়তায় শীর্ষে। মোনালিসাকে বিশ্বের সর্বকালের বিখ্যাত চিত্রকর্ম বলে বিবেচনা করা হয়। মূলত মোনালিসার মুখের আশ্চর্য এক্সপ্রেশনের জন্যই চিত্রকর্মটি এত বিখ্যাত।
৩০দ্ধ২১ ইঞ্চির বিখ্যাত এই পোর্ট্রেটটি ১৫০৩ থেকে ১৫০৭ সালে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি পপলার কাঠের তৈরি সাদা প্যানেলের ওপরে তেলরঙ দিয়ে এঁকেছিলেন।
মোনালিসাকে দেখার জন্য প্রতি বছর ৮.৫ মিলিয়ন দর্শনার্থী ল্যুভ মিউজিয়ামে যান। মোনালিসাকে দেখার জনপ্রতি টিকিটের মূল্য ২২.৪৮ মার্কিন ডলার।
উল্লেখ্য, ইতিহাসের সেরা চিত্রশিল্পীদের একজন হওয়া সত্ত্বেও লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মাত্র ১৫টি শিল্পকর্মের অস্তিত্বই এখন পৃথিবীতে বিদ্যমান।